ফিলিস্তিনের প্রকৃত স্বাধীনতা কতদূর?


গত ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের স্বীকৃতির মাধ্যমে ফিলিস্তিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্যের মধ্যে ৪টি কর্তৃক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হলো। সার্বিকভাবে এই নিবন্ধ যখন লিখছি তখন জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৫১টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাকি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ইউরোপীয় কিছু কিছু রাষ্ট্র কয়েকদিনের মধ্যেই স্বীকৃতি দেবে বা দিতে বাধ্য হবে।
তবে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি না দিলে এই স্বীকৃতির কার্যকারিতা আসলেই কতটুকু এবং কী কী হতে পারে তার বিচার বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি! উদাহরণ স্বরূপ বিশ্ব মানবতা বিজ্ঞাপনের প্রথম সারির ঝান্ডাধারী জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশ এখনো স্বীকৃতি দিতে পারেনি মূলত মার্কিন কূটনৈতিক চাপের কারণে।
তাহলে কি অদৃশ্যভাবে পুরোপুরি ইহুদি লবীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো আমেরিকা ও ইসরাইলের ক্ষতি করে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে? না, মোটেই না! এই দেশগুলো মূলত ফিলিস্তিনকে নামকাওয়াস্তে কাগুজে স্বীকৃতি দিচ্ছে নিজেদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও কূটনৈতিক আধিপত্য সংরক্ষণ এবং ইসরাইলের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য।
গত ৮ অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া গাজা গণহত্যার চূড়ান্ত ধাপ শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের ওয়ারেন্টধারী আসামি বেনজামিন নেতানিয়াহু। দীর্ঘ দু’বছর ধরে চলা এই গণহত্যায় পশ্চিমা অংশগ্রহণ এবং দ্বিচারিতা পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থায় মারাত্মক আত্মগ্লানি ও অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবক-যুবতীরা তাদের সরকারকে প্রশ্ন করছে, আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেন গাজায় হাজার হাজার নারী ও শিশু নারকীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে?
স্মরণকালের বৃহৎ বৃহৎ সব বিক্ষোভ এবং অনবরত সর্বক্ষেত্রে সার্বিক প্রতিবাদ পশ্চিমা রাজনৈতিক শ্রেণীর ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে, যেমন যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সকে অনুসরণ না করায় ইতালিতে যে বিক্ষোভ হয়েছে, সেটা হয়তো কেউ কোনো দিন কল্পনাও করেনি। তাই পশ্চিমে কিছু কিছু দেশের সরকার গাজা গণহত্যা বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উল্টো প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বৈশ্বিক দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য তড়িঘড়ি করে এই স্বীকৃতির পথ বেছে নিয়েছে।
আপাতত তারা সফলও, তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াগুলো এই স্বীকৃতিকে এতোটা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করছে যে, প্রতিদিন গাজায় চলমান গড়ে কয়েকশ নারী ও শিশু হত্যা এখন যেন একটি গৌণ বিষয়, অন্তত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত এমনটাই চলবে।
ঐদিকে ঘৃণ্য ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ৬ লক্ষ বাসিন্দাকে বের করে মিশরের সিনাই উপত্যকায় ঠেলে দিতে চাচ্ছে, অগত্যা বাধ্য হয়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির বাইরে গিয়ে মিশর ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে, ইসরাইল বেশি বাড়াবাড়ি করলে গাজাবাসীর স্বার্থে না হলেও নিজের স্বার্থে মিশর সংঘর্ষে জড়াবে। কাতারে ইসরাইলি সন্ত্রাসী হামলার পর পাক-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তির পিঠেই এমন একটি সংঘর্ষ পশ্চিমাদের সামরিক ক্ষেত্রের চেয়েও কূটনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
যেহেতু তারা এখনো ইউক্রেন যুদ্ধে ঝুলে আছে, এই রকম একটি অকল্পনীয় পরিস্থিতির ফলাফল কী হতে পারে ব্যবসায়ী ট্রাম্প বুঝতে সময় লাগলেও পেশাদার রাজনৈতিক স্টারমার-ম্যাক্রো ঠিকই বুঝেন। সে জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান সার্বভৌমত্ব ও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নিশ্চিত করার কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে এবং গাজা গণহত্যা বন্ধে নেতানিয়াহুকে কার্যকর চাপ দেওয়ার পরিবর্তে এরা এখন স্বীকৃতি নাটক নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।
ইসরাইল এখন এই সুযোগে আমেরিকার সাথে পরামর্শ করে পশ্চিম তীরের বিশাল ভূমি এনেক্সেশেন করার ঘোষণা দেবে এবং ট্রাম্প তাতে স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সুনিশ্চিত। পরবর্তীতে পশ্চিমা বাকি দেশগুলো মুখে অনেক বিরোধিতা করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ সময় গড়িয়ে যেতে যেতে বিষয়টিকে ওরা স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলবে।
বাকি রইল গাজা, গাজায় ট্রাম্পের স্বপ্ন হলো “ট্রাম্প রিভেরা” প্রতিষ্ঠিত করা এবং তিনি বন্ধু নেতানিয়াহুকে নিয়ে গাজায় গড়ে ওঠা বিলাসবহুল হোটেলের সুইমিংপুলে আনন্দ করার কৃত্রিম ভিডিও পোস্ট করেছেন সোস্যাল মিডিয়ায়। এরও পূর্বে ট্রাম্পের ইহুদি জামাতা জারেদ কুশনার বলেছিলেন, “গাজা সাগর পাড়ের মূল্যবান সম্পদ, ইসরাইলের উচিত যত দ্রুত সম্ভব কার্য সমাধা করা!”
ইউরেপীয়দের এই স্বীকৃতি নাটক এবং হামাস ব্যতিত গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনার সাথে ফিলিস্তিনি অথোরিটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একাত্ম হলেই ট্রাম্প স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরো কাছাকাছি চলে আসবেন এবং পুরো প্রক্রিয়া তারা সাহায্য দিয়ে করছেন বলে প্রথমে মিডিয়ায় প্রচার করে গাজা উপকূলের প্রায় ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের গ্যাস ও খনিজ লুট করে ইনভেস্টের কয়েক হাজার গুণ তুলে নেওয়াই হলো মূল পরিকল্পনা! নির্বাচন বিহীনভাবে ২০০৫ সাল থেকে মূলত ইসরাইলের সহায়তায় অদ্যাবধি ক্ষমতায় আছেন মাহমুদ আব্বাস।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মারওয়ান বারগুতিকে বন্দী করে রেখেছে ইসরাইল, মোহাম্মদ দাহলানকে করেছেন দেশত্যাগী। গত দুই দশক বিরুদ্ধ মতাবলম্বী হত্যা ও অন্তরীণ করেছেন অগণিত। গত ৮ অক্টোবর ২০২৩ তারিখ থেকে পশ্চিম তীরে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনী কর্তৃক হাজারের বেশি হামাস সমর্থককে হত্যা, হাজার হাজার মানুষ আহত ও ঘর বাড়ি ধ্বংসের অন্যতম সহযোগী হলো মাহমুদ আব্বাসের অধীনে থাকা ৪২ হাজারের অধিক সদস্যের হালকা অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনী।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক বলেছেন, “২০২৬ সালে নির্বাচন হবে কথা দিয়েছেন মাহমুদ আব্বাস।” বাস্তবতা বলছে, এটা হলো তার দুঃস্বপ্ন, তাই প্রথমে অনেক বিরোধিতার নাটক করলেও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমাদের বাসে ওঠার সম্ভাবনা খুবই বেশি। ইসরাইলে ফরাসি দূতাবাস হিব্রুতে টুইট করেছে, তারা “সংস্কার হওয়া প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটির অধীন সশস্ত্রবাহিনীবিহীন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে চায়!” যা আসলে প্রেসিডেন্ট ওবামার চাপে পড়ে ১৪ জুন ২০০৯ তারিখে বার ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রদত্ত ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র পরিকল্পনার হুবহু প্রতিচ্ছবি মাত্র।
কিন্তু ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকে নেতানিয়াহু সেটাতেও আর রাজি নন। এখন এই রক্ত পিপাসু দানবের পরিষ্কার ঘোষণা, কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র আমি থাকতে হতে পারবে না! কারণ, ওকে চাপ দেওয়ার মতো কেউ এখন নেই! এ বিষয়ে ২০২০ সালে সবচেয়ে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছিলেন বামপন্থী ইসরাইলি সাংবাদিক নেরি জিলবার, তিনি টুইট করেন, “এক সময় পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধের বিনিময়ে সৌদি আকাশ সীমা ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলো ইসরাইল, এখন সেটা এমনিতেই পাচ্ছে!”
আরব একনায়কগণ বহু দশক পূর্ব থেকে আমেরিকা-ইসরাইল এর সাথে আঁতাত করে নিজেদের পারিবারিক শাসন টিকিয়ে রেখেছেন। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির (সংযুক্ত আরব-আমিরাত, মরক্কো, বাহরাইন ও সুদান ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে) পর থেকে সেটার ব্যপ্তি দেশভিত্তিক বর্ণনা আসলেই অনেক সময় সাপেক্ষ কার্য। তবে ইদানিং যেহেতু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বাকিদের চেয়ে অনেক বেশি হুংকার দেন তাই তুরস্কের উদাহরণ দিয়ে বুঝাবো, আরব শাসকদের ইসরাইলের স্বার্থে কর্মকাণ্ডের গভীরতা।
আগেই বলে রাখছি, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তুরস্কের সাথে কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক জোরদারে বাংলাদেশের লাভ ব্যতিত ক্ষতি কিছু নেই। বর্তমান মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থায় তুরস্ককে অবহেলা করা অসম্ভব, যেমন ভারত অফিশিয়ালি চুক্তি স্থগিত করেও আবার টার্কিশ এয়ারলাইন্সের সাথে কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। এখানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম নির্যাতিত ও গণহত্যার শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে বাধার গভীরতা বুঝানো হলো মূল উদ্দেশ্য!
তুরস্ক- ইসরাইল (ইহুদী লবী) সম্পর্কের কিছু বিশেষ ঘটনাবলী: ১) তুরস্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ইহুদিদের ব্যাপক সহায়তা করে। বিশেষ করে, ইউরোপ থেকে পালানোর জন্য এবং শেষ দিকে যুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে যোগদান করে, ২) তুরস্ক ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ১ বছরের মধ্যে ১৯৪৯ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়, ৩) তুরস্ক মূলত ১৯৪৭ সাল থেকে আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি প্রদানের কার্যক্রম শুরু করে,
যা আদতে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, ৪) তুরস্ক ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের সাথে দুটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা দুদেশের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ছোট আকাশ সীমার ইসরাইলি পাইলটগণ বিশাল তুর্কী আকাশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং ট্যাংক-সহ বিমানের আপগ্রেডেশনে ইসরাইলি সহায়তা নিয়ে তুরস্ক লাভবান হয় (গত কয়েক মাস ধরে আপাততঃ স্থগিত আছে)।
এছাড়াও দুদেশ অসংখ্য যৌথ নৌ-মহড়া পরিচালনা করেছে, ৫) তুরস্ক ও ইসরাইলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলারের উপরে। সমালোচকরা দাবি করেন, প্রকৃত পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার পর থেকে তুর্কী পণ্য মূলত তৃতীয় দেশ হয়ে ইসরাইলে যাচ্ছে। তুরস্ক ইসরাইলের চতুর্থ বৃহৎ পণ্য সরবরাহকারী, ৬) ইসরাইলের ৪০% জ্বালানি আসে আজারবাইজান থেকে।
এসব বিটিসি পাইপলাইন দিয়ে প্রথমে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় চেইহান মেরিটাইম টার্মিনালে আসে, তারপর সেখান থেকে ট্যাংকারে করে ইসরাইলে পৌঁছায়। ৭) তুর্কী ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রায় ৪ হাজার সদস্য ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে স্বপ্রণোদিত চাকুরি করেছে ও ফিলিস্তিনি হত্যায় অংশ নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ৮) ইসরাইলের সাথে হামাস-হিযবুল্লাহর প্রতিরোধ যুদ্ধের অত্যন্ত মোক্ষম সময়ে তুরস্ক সিরিয়ার পতন ত্বরান্বিত করে।
৯) তুরস্কের দূতিয়ালিতে ইরান সীমান্তের আর্মেনিয়ান ভূখণ্ড জাংগেজুর করিডোরের লিজ পেয়েছে আমেরিকা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা মূলত ইসরাইলি মোসাদ নিয়ন্ত্রণ করবে। ১০) তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক ও সিরিয়ায় পশ্চিমা-তুর্কী স্থাপিত শাসক জোলানি এখন মূলত কাজ করছে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা গোষ্ঠী হিযবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য।
১১) তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে সামরিক এবং গোয়েন্দা হট লাইন চালু আছে। ইদানিং সিরিয়ায় আধিপত্য প্রশ্নে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেকটা প্রকাশ্য। তবে এটা আসলে বড় ও ছোট ভাইয়ের দ্বন্দ্বের মতো। তুরস্ক মার্কিন এফ-৩৫ বিমান প্রজেক্টে আবার যুক্ত হতে চায়, যেটা আবার ইসরাইল সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যতিত কীভাবে সম্ভব হবে? অর্থাৎ তুরস্কের ফিলিস্তিন প্রীতি আদতে ফাঁকা রাজনৈতিক বুলি এবং ইসরাইলের সাথে দ্বন্দ্বের কারণ ও মর্মার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মুসলিম বিশ্বে সামরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের বাস্তবতা এমন হলে, বাকিদের নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। এরকম পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনের প্রকৃত স্বাধীনতা কীভাবে অর্জিত হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে ইসরাইলি বামপন্থী সাংবাদিক গিডন লেভী ব্রিটিশ স্কাই নিউজকে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।
এসব ফাঁকা বুলি এবং ঘোষণায় কোনো কাজ হবে না। ইসরাইলকে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধের মূল্য দিতে বাধ্য করা হয়নি।” অন্য অর্থে তিনি মাহমুদ আব্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী মারওয়ান বারগুতির গোত্রের ওমর বারগুতি কর্তৃক ২০০৫ সালে চালু করা Boycott, Divestment and Sanctions (BDS) আন্দোলনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে সেটা করা ইউরোপীয় বা আমেরিকানদের জন্য অতো সহজ না।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ৩৮টি রাজ্যে বিডিএস বিরোধী আইন আছে। কাতারে সন্ত্রাসী হামলার পর যখন পুরো মুসলিম বিশ্ব ইসরাইলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছিলো, তখন ‘পঞ্চাশ রাজ্য এক ইসরাইল” স্লোগানে হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩৫ জন কংগ্রেস সদস্যের মধ্যে ২৫০ জন ইসরাইলে ছুটে আসেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জরুরি সরকারি সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সবার আগে অবতরণ করেন ইসরাইলে।
অতএব, পশ্চিমাদের এরকম হাজার ঘোষণা বা স্বীকৃতিতেও কোনো কাজ হবে না, যদি আরব শাসকদের মনে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের শিকার ফিলিস্তিনিদের জন্য নিঃস্বার্থ দয়া না জন্মায়। অন্যথায় ফিলিস্তিনিদের ভিক্ষার চালের সমপরিমাণ প্রকৃত স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্যও অপেক্ষা করতে দ্বিতীয় আইজাক রবিনের আগমন পর্যন্ত, যিনি অসলো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে ফিলিস্তিনিদের ন্যূনতম অধিকার প্রদানে সম্মত হওয়ায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাবস্থায় এক উগ্রবাদী ইহুদির আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন।
লেখক : গবেষক
















