টেকনাফে ৩ যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার


কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে বেরিয়ে এলো এক বীভৎস ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালী এলাকার গহীন পাহাড় থেকে তিন যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
একই এলাকার তিন টগবগে যুবকের এমন মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া, স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে শীলখালীর আকাশ-বাতাস।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল পৌনে দশটার দিকে দুর্গম পাহাড়ের ঢাল থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন, বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী এলাকার রুহুল আমিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম রবি (১৯), মৃত নুরুল কবিরের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮) এবং মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে নুর বশর (২০)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক পাহাড়ে কাজ করতে গেলে তারা ঝোপঝাড়ের পাশে তিনজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। মুহূর্তেই এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ পাহাড়ে ভিড় জমায়। খবর পেয়ে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
নিহত আমিনুল ইসলাম রবির বাবা রুহুল আমিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “সোমবার এশার নামাজের পর রাতের খাবার শেষ করেছিল রবি। এরপর কে বা কারা তাকে ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। অনেক রাত হয়ে গেলেও সে বাসায় না ফেরায় আমরা চিন্তায় পড়ে যাই। বারবার ফোনে চেষ্টা করলেও তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সকালে পেলাম ছেলের নিথর দেহ।”
এদিকে, এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে তিন প্রতিবেশীর এমন রহস্যজনক ও নৃশংস মৃত্যুতে স্থানীয়দের মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এটি অত্যন্ত বর্বরোচিত ঘটনা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।”
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
এদিকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য শোনা যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহারছড়া ও উত্তর শীলখালী সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ইদানীং মানবপাচার ও অপহরণ বাণিজ্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুর্গম পাহাড়কে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর ধারণা, নিহত যুবকরা হয়তো দুর্ঘটনাবশত এই অপরাধী চক্রের কোনো গোপন আস্তানা বা মানবপাচার সংক্রান্ত কোনো সংবেদনশীল তথ্য জেনে ফেলেছিলেন। সেই গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই কি তাদের রাতের আঁধারে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে? এমন প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, “সম্প্রতি এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। হয়তো নিহতরা এসব দুর্বৃত্তের কোনো গোপন আস্তানা দেখে ফেলেছিল অথবা জেনে গিয়েছিল, যা তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।”
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সাধারণ কোনো শত্রুতার জেরে নাকি পাহাড়ে সক্রিয় থাকা এসব অপরাধী চক্রের মাধ্যমেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচারকারী ও অপহরণকারী চক্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
















