চট্টগ্রাম বন্দর কনসেশন চুক্তির বিরুদ্ধে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি

fec-image

স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর, বিশেষ করে নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) হচ্ছে বাংলাদেশের সোনার হরিণ বা স্বর্ণের ডিম পাড়া বুনো হাঁস। ২০২০ সালের দিকে সালমান এফ রহমান সিন্ডিকেট এবং ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের ইকোনোমিক হিটম্যানদের সিন্ডিকেট এটিকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগের মাধ্যমে স্বর্ণের ডিম পাড়া বুনো হাঁস জবাই করে একসাথে সব ডিম খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু “স্বর্ণের হাঁস জবাই” বা অতিরিক্ত লোভের কারণে মহামূল্যবান সম্পদ হারানোর পরিণতি শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্মে আমরা দেখতে পাই।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ইকোনমিক হিটম্যানদের চাপ ও পরামর্শে দেশের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরের স্বর্ণের ডিম পাড়া বুনো হাঁসখ্যাত নিউমুরিং টার্মিনালের ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে না পারা সরকারি কর্মকর্তারা যদি বিদেশী প্রতিষ্ঠান বা ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে টার্মিনালটি ইজারা দেন, তাহলে শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্মের মতো একই করুণ পরিণতি হতে পারে। বন্দর বিদেশীদের দেওয়ার কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করতে হবে। দেশ কী দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কী পাবে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ইকোনমিক হিটম্যানরা দেয় না কেন?

জিয়াউল হক বলেন, আমাদের যে স্বপ্ন ২-৫ বছরের মধ্যে দেশের ফরেন রিজার্ভ ১০০ বিলিয়ন এবং দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা—সেটি অধরা রয়ে যাবে যদি এনসিটি বিদেশীদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এর পূর্বে আওয়ামী লীগ একটি এবং অন্তর্বর্তী সরকার দুইটি টার্মিনালসহ চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশীদের দেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ টেনে আনা সহ বাংলাদেশকে সোমালিয়া-সোমালিল্যান্ড ও সুদান-ইয়েমেনের মতো সংকটময় পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছে। আরব আমিরাত তথা ডিপি ওয়ার্ল্ডের দেশে দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী অতীত-বর্তমান কর্মকাণ্ড আমাদের এমন বার্তাই দেয়। আমরা মনে করি—বন্দর বা এনসিটির বিষয়ে নির্বাচিত সরকার আওয়ামী লীগ কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুসরণ করবে না।

জিয়াউল হক বলেন, ইজারা বা কনসেশন চুক্তি এবং অপারেটর নিয়োগ এক কথা নয়। এই দুটির মধ্যে অনেক পার্থক্য। বন্দর বিষয়ে কনসেশন চুক্তি হচ্ছে একটি পরনির্ভরশীল বা আফ্রিকান মডেল। সাধারণত বন্দর পরিচালনায় যারা অনভিজ্ঞ অথবা মনিব-গোলাম সম্পর্ক কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র—সাধারণত এই তিন ধরনের রাষ্ট্র বন্দর পরিচালনায় বিদেশীদের সাথে কনসেশন চুক্তিতে যায়। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের পাশাপাশি বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় তথ্য পাচার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। এজন্য আমরা সরকারকে আহ্বান করবো—বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর বা এনসিটি যাতে কনসেশনে দেওয়া না হয়।

তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর পোর্টের মতো চট্টগ্রাম বন্দরকে আমরা একটি রিজিওনাল হাব বানাতে চাই। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপিএম টার্মিনালস, মেডলগ—এরা কখনই চায় না বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর রিজিওনাল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যক্তিগত স্বার্থে ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে রিজিওনাল হাব হতে বাধা দিতেই দেশী-বিদেশী লবিস্টরা চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশী সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের বন্দরও বিদেশিরা চালায়’ মর্মে অসত্য ও অর্ধসত্য তথ্য অন্তর্বর্তী সরকারের ভাড়াটে বট বাহিনী ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল। অথচ বাস্তবে সিঙ্গাপুরের একটি কনটেইনার টার্মিনালও বিদেশি অপারেটররা চালায় না। এমনকি ভিয়েতনামে কোনো টার্মিনাল এককভাবে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি।

জিয়াউল হক বলেন, বন্দর বা টার্মিনাল বিদেশীদের হাতে না দিয়ে সরকার যদি দ্রুত ৫টি উদ্যোগ গ্রহণ করে—অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের রিজার্ভ ১০০ বিলিয়নে এবং অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে—
(১) বন্দর বিকেন্দ্রীকরণ করা (তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক ট্রেডিং ব্যবস্থা),
(২) শিপিং লাইন চালু,
(৩) রেমিট্যান্স বাড়াতে আরবি ভাষাকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো,
(৪) নদী-খাল খনন এবং
(৫) খাদ্য নিরাপত্তার জন্য থানায় থানায় প্রয়োজনমতো হিমাগার তৈরির উদ্যোগ নিলে ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের চেহারা ও সক্ষমতা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। ইনশাআল্লাহ! এই ব্যাপারে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির গবেষণা টিম কাজ করছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহিউদ্দিন রাহাত, দপ্তর সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, জুবায়েদুল ইসলাম শিহাব, জাবির বিন মাহবুবসহ অন্যরা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন