(প্রথম পর্ব)

বাণিজ্যচুক্তি : বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রকে ৬

fec-image

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে থাকছে শুল্ক, শ্রম, মেধাস্বত্ব, পরিবেশ, কেনাকাটাসহ বাংলাদেশের প্রধান বাধ্যবাধকতার বিশ্লেষণ। লিখেছেন শওকত হোসেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে হবে না। কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন।

এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি বাতিল চেয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার।

মূল চুক্তিতে যা যা আছে-
মূল চুক্তিতে ৬টি ধারা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার উল্লেখ রয়েছে পরিশিষ্টে। পরিশিষ্টে দেওয়া সব সংযুক্তি চুক্তিরই অংশ।

চুক্তির প্রথম ধারার বিষয় শুল্ক ও কোটা। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাবে।

অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মূল কথা হলো মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও এমন কোনো নিয়ম, কাগজপত্র, অনুমতি, পরীক্ষা, মান যাচাই বা লাইসেন্স আরোপের মতো নিয়ম করা যাবে না, যা বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি লাইসেন্স প্রয়োগ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে, সেসব পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে এবং সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদ দেওয়া থাকলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করবে না।

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আছে। তবে স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক হতে হবে, শুধু বাণিজ্য ঠেকানোর জন্য নিয়ম করা যাবে না। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড নেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। জিআই সুরক্ষা বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

চুক্তির পরের অংশে চিজ ও মাংসজাত পণ্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কেবল নাম ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাজারে প্রবেশে বাধা দেবে না। বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের শক্ত সুরক্ষা দেবে। মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন ঠেকাতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সীমান্ত পর্যায়ে ব্যবস্থা নেবে, অনলাইন ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

সেবা খাত নিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন নিয়ম করতে পারবে না, যাতে মার্কিন সেবাপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম সুবিধা পায়। বাণিজ্য-সংক্রান্ত নতুন নিয়ম করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং আলোচনা ছাড়া হঠাৎ কোনো বিধি চাপানো যাবে না।

এর পরের অনুচ্ছেদ শ্রম নিয়ে। এখানে বলা হয়েছে যে জোরপূর্বক বানানো কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ও বজায় রাখার কথা আছে এরপরেই। পরের অনুচ্ছেদটি সীমান্তব্যবস্থা ও কর বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট বসাবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যছাড়ের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি
চুক্তির এই ধারায় অনুচ্ছেদ রয়েছে চারটি। এতে প্রথমেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করবে। মার্কিন ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কোনো নীতি নেবে না। ব্যবসার প্রয়োজনে নিরাপদে সীমান্ত পেরোনো ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়।

বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করবে। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর না হয়, তাহলে তারা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার চালু করতে পারবে।

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকভাবে পাঠানো কনটেন্ট বা তথ্যের ওপর শুল্ক বসাবে না। অনলাইন লেনদেনে স্থায়ীভাবে শুল্ক না রাখার ডব্লিউটিও প্রস্তাবও সমর্থন করবে।

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাজারে প্রবেশের শর্ত। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সোর্স কোড বা গোপন ব্যবসায়িক তথ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। নির্দিষ্ট প্রযুক্তি কিনতে বা ব্যবহার করতেও বাধ্য করা যাবে না। তবে সরকারি কেনাকাটা, দুই পক্ষের বাণিজ্যিক চুক্তি, তদন্ত, আইন প্রয়োগ বা আদালতের প্রয়োজনে সোর্স কোড বা অ্যালগরিদম চাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা
চুক্তির ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে জানাবে। আলোচনার পর বাংলাদেশ নিজের আইন মেনে একই ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে।

পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। এ জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মানবে, নিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে এবং কোনো কোম্পানি যেন এসব নিয়ম ফাঁকি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করতে পারে—এমন লেনদেন ঠেকানো যায়। আবার বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, যাতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ যাচাই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিবেচনা করবে।

অন্যান্য ব্যবস্থাসংক্রান্ত পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ করতে কাজ করবে। বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চলাচল উৎসাহিত করবে। দুই দেশ শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে সহযোগিতা চুক্তিও করবে। বাংলাদেশ যদি কোনো অ-বাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি দুর্বল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করবে। তাতেও উদ্বেগ দূর না হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের পারস্পরিক শুল্ক আবার বসাতে পারবে।

এই অনুচ্ছেদের সবশেষে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ে। তবে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে বা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে বিদ্যমান চুল্লির জন্য চুক্তি হয়ে থাকলে সেসব প্রযুক্তি বা উপকরণ কেনা যাবে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করতে পারে—এমন লেনদেন ঠেকানো যায়। আবার বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, যাতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ে।

বাণিজ্যিক বিবেচনা ও সুযোগ
এই ধারায় আছে চারটি অনুচ্ছেদ। বিনিয়োগ–সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ সহজ করবে। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের চেয়ে কম সুবিধা পাবেন না। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) ও ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) এসব খাতে অর্থায়ন করতে পারে। বাংলাদেশ এমন নতুন বিনিয়োগেও সহযোগিতা করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান তৈরি করে।

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাণিজ্যিক বিবেচনা। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা কেনাবেচায় বাজারভিত্তিক নিয়ম মেনে চলবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বা সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে অ-বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ছাড়া দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দিতে পারবে না এবং পণ্য উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে চাইলে বাংলাদেশ ভর্তুকির তথ্য দেবে। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কী বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, তা জানাতে হবে। তবে জনসেবার জন্য অ-বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর বাইরে থাকবে। এ ধরনের ভর্তুকি বা সহায়তায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অসাম্য তৈরি হলে বাংলাদেশ তা কমাতে পদক্ষেপ নেবে।

পরের অনুচ্ছেদ বস্ত্র ও পোশাক নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য বা কম শুল্কে মার্কিন বাজারে ঢুকতে পারে। তবে সুবিধাটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মিলবে। সেই পরিমাণ নির্ভর করবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটা তুলা, কৃত্রিম তন্তু বা বস্ত্র উপকরণ আমদানি করছে, তার ওপর।

বাস্তবায়ন, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান
এই ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, সংযুক্তি, পরিশিষ্ট ও ফুটনোট—সবই এই চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দুই পক্ষ লিখিতভাবে রাজি হলে চুক্তি বদলানো যাবে, তবে আগের সুবিধা নষ্ট করা যাবে না। এই চুক্তির সুবিধা মূলত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য। তৃতীয় কোনো দেশ বেশি সুবিধা পেলে দুই পক্ষ আলোচনা করে সুবিধাভোগীদের বিষয়ে আলাদা নিয়ম করতে পারবে।

চুক্তি থাকলেও অন্যায্য বাণিজ্য, হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে অতিরিক্ত শুল্ক বসানো যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি মানেনি, তাহলে আগে আলোচনা করবে। সমাধান না হলে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার বসাতে পারবে।

যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। নোটিশের ৬০ দিন পর বা দুই পক্ষের ঠিক করা তারিখে বাতিল কার্যকর হবে। দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা লিখিতভাবে জানালে ৬০ দিন পর চুক্তি চালু হবে। চাইলে তারা অন্য তারিখও ঠিক করতে পারবে।

প্রথমেই আছে বাংলাদেশের শুল্ক তালিকা। এই অংশে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যে কী হারে শুল্ক নেবে, তা বলা হয়েছে। এতে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাংলাদেশ নির্ধারিত নিয়মে শুল্ক কমাবে বা নেবে। এ জন্য পাঁচ ধরনের শ্রেণি রাখা হয়েছে। যেমন ইআইএফ শ্রেণিতে চুক্তি চালুর দিন থেকেই শুল্ক শূন্য হবে। বি-৫ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক শুল্ক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে পঞ্চম বছরে শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে দশম বছরে শূন্য হবে। এ শ্রেণিতে শুল্ক আগেই শূন্য, তাই তা শূন্যই থাকবে। এক্স শ্রেণিতে কোনো ছাড় নেই, আগের এমএফএন শুল্কহারই বহাল থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অনুযায়ী ঠিক হবে, কোন বাংলাদেশি পণ্য ছাড় পাবে। তালিকাভুক্ত কিছু পণ্যে অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক বসবে না। তালিকার বাইরে থাকা বাংলাদেশি পণ্যে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ এমএফএন শুল্ক আলাদাভাবে বহাল থাকবে।

নির্দিষ্ট অঙ্গীকার
এখানে মূলত চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশ কী কী অঙ্গীকার করছে এবং তা কীভাবে পালন করা হবে, তার উল্লেখ রয়েছে। এর প্রথমটি অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে।

চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ আমদানি: বাংলাদেশ চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর অনুমোদনকে গুরুত্ব দেবে। এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধকে বাজারজাতের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে।

কম ঝুঁকির যন্ত্রে এফডিএর আলাদা অনুমোদন না লাগলে বাংলাদেশও নতুন অনুমোদন চাইবে না। এফডিএর ইলেকট্রনিক সনদ গ্রহণ করা হবে; কাগজের আসল, সত্যায়িত বা হাতে সই করা কপি চাওয়া হবে না।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চিকিৎসা যন্ত্র নিয়ন্ত্রক ফোরামের নির্দেশনা মেনে নিয়ম করবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অডিট ও সনদ গ্রহণ করবে। একবার অনুমোদিত ওষুধের জন্য বারবার নতুন অনুমোদন লাগবে না, বড় নিরাপত্তা বা মানগত সমস্যা না থাকলে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কারখানা এফডিএর সাম্প্রতিক পরিদর্শনে ঠিক থাকলে বাংলাদেশ সাধারণত সেই রিপোর্ট মেনে নেবে।

মোটরযান ও যন্ত্রাংশ:
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নির্গমন মান মেনে তৈরি গাড়ি ও যন্ত্রাংশ গ্রহণ করবে। এসব পণ্য আমদানিতে বাড়তি অনুমোদন বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়া চাইবে না। মার্কিন গাড়ি ও যন্ত্রাংশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক অন্য শর্তও তুলে দেওয়া হবে।

পুনর্নির্মিত পণ্য:
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্নির্মিত পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সের শর্ত তুলে দেবে।

কৃষিপণ্য:
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের স্বাস্থ্য, মান ও কারিগরি নিয়মকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেবে। মার্কিন সরকারি সনদও গ্রহণ করবে। সনদে শুধু দরকারি তথ্যই চাওয়া হবে। আর নতুন কোনো খাদ্য বা মান-সংক্রান্ত নিয়ম আনলে বাংলাদেশ আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওকে জানাবে এবং অন্য দেশের মতামতও বিবেচনা করবে।

কারখানা নিবন্ধন ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা: বাংলাদেশ মার্কিন দুগ্ধ, মাংস, পোলট্রি ও ডিমজাত পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার-ইউএসডিএ) অধীন সংস্থাগুলোর তদারকি ও সনদ গ্রহণ করবে। দুগ্ধপণ্যের ক্ষেত্রে অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিসের (এএমএস) ডেইরি স্যানিটারি সার্টিফিকেট থাকলে পণ্য আমদানি করা যাবে। আর মাংস, পোলট্রি ও ডিমজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের (এফএসআইএস) তদারকি যথেষ্ট বলে ধরা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ আলাদা করে কারখানা বা পণ্য নিবন্ধন চাইবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সরকারি তালিকাও বাংলাদেশ গ্রহণ করবে।

এখানে যেসব পণ্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো গরু, ভেড়া ও ছাগলের দুধ থেকে তৈরি দুগ্ধপণ্য; মাংস; পোলট্রি; ভুঁড়ি-কলিজাসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ; প্রক্রিয়াজাত মাংস ও পোলট্রি; সিলিউরিফর্মিস (ক্যাটফিস) ধরনের মাছ এবং ডিমজাত পণ্য।

কৃষি জৈব প্রযুক্তি:
বাংলাদেশ কৃষি জৈব প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে এমন নিয়ম চালু রাখবে, যা বিজ্ঞান ও ঝুঁকির ভিত্তিতে হবে। এর লক্ষ্য হলো, এসব পণ্যের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর রাখা, যাতে বাণিজ্য বাড়ে। এই চুক্তি চালু হওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ এমন নীতি করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া কিছু কৃষি জৈব প্রযুক্তিপণ্য বাংলাদেশেও আনা ও বিক্রি করা যায়। এ জন্য আলাদা করে নতুন বাজার-পূর্ব পরীক্ষা, ডিরেগুলেশন, বাড়তি লেবেলিং বা নতুন অনুমোদন চাইবে না। আর যদি আমদানি করা কৃষিপণ্যে খুব অল্প পরিমাণে এমন জৈবপ্রযুক্তি উপাদান পাওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ বিষয়টি দ্রুত দেখবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নও বিবেচনায় নেবে।

জীবিত নয় এমন পরিবর্তিত জীব:
কৃষি জৈব প্রযুক্তি থেকে তৈরি যেসব খাদ্য বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, সেগুলোতে আর জীবিত পরিবর্তিত জীব থাকে না, এসব পণ্যের জন্য আলাদা সরকারি অনুমোদন লাগবে না। এখানে প্রক্রিয়াজাত বলতে বোঝানো হয়েছে—তাপ দেওয়া, গুঁড়া করা বা এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে পণ্যটি আর অঙ্কুরিত হতে না পারে।

উচ্চমাত্রার প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা:
বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অঙ্গরাজ্য থেকে পোলট্রি, ডিম বা সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা শুধু আক্রান্ত এলাকার ১০ কিলোমিটার জোনে সীমিত রাখতে হবে।

বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ডব্লিউওএএইচ) মান মানতে হবে এবং ইউএসডিএ অ্যানিমেল অ্যান্ড প্ল্যান্ট হেলথ ইন্সপেকশন সার্ভিসকে (এপিএইচআইএস) সেই কর্তৃপক্ষ হিসেবে মানতে হবে, যারা বলবে কোনো এলাকা ইনফ্লুয়েঞ্জা মুক্ত কি না। এপিএইচআইএস কোনো ১০ কিলোমিটার এলাকাকে নিরাপদ বললে, সেখান থেকে পোলট্রি ও পোলট্রিজাত পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করা যাবে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সীমার বাইরে বাড়তি কড়াকড়ি করতে পারবে না।

হালাল সনদ:
বাংলাদেশ যদি হালাল সনদ বাধ্যতামূলক করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সনদদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শর্ত পূরণ করবে, তাদের হালাল সনদ বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে। এ জন্য বাড়তি কোনো আলাদা শর্ত দেওয়া যাবে না।

ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লেভেলস (এমআরএলস):
খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টের নিরাপদ সর্বোচ্চ সীমা বা এমআরএল বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও ঝুঁকি বিবেচনায় ঠিক করবে। নিজস্ব সীমা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সীমা, আর সেটিও না থাকলে কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াসের মান মানবে। কোনো পণ্য এমআরএল না মানলে বাড়তি নজরদারি শুধু দায়ী প্রতিষ্ঠানের ওপর করা যাবে। প্রতিষ্ঠানকে জবাব ও সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। একই সমস্যা বারবার হলে তবেই প্রতিষ্ঠান স্থগিত করা যাবে।

উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত পণ্য:
যুক্তরাষ্ট্র কোনো উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির অনুমতি চাইলে বাংলাদেশ ২৪ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করবে। এ জন্য আমদানির নিয়ম নিয়ে দুই দেশ একটি প্রটোকলে একমত হবে। কীটপতঙ্গের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি মেনে ২৪ মাসের মধ্যে প্রটোকল চূড়ান্ত করবে।

আমদানি লাইসেন্স:
বাংলাদেশকে আমদানি লাইসেন্স-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে ডব্লিউটিওতে জানাতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও কৃষিপণ্য আনার আগে বাংলাদেশ আমদানি অনুমতিপত্র বা এলসি বাধ্যতামূলক করবে না।

মেধাস্বত্ব:
জিআই সুরক্ষায় বাংলাদেশকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়ম রাখতে হবে। এতে আপত্তি, পরীক্ষা ও বাতিলের সুযোগ থাকবে। জিআই নামটি আগে থেকে কোনো ট্রেডমার্কের সঙ্গে মেলে কি না বা সেটি সাধারণ নাম কি না, তা দেখতে হবে। জিআইয়ের কোন অংশ সুরক্ষিত, তা স্পষ্ট করতে হবে। সাধারণ নাম হলে আলাদা সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। কোনো শব্দ সাধারণ নাম কি না, তা নির্ধারণে অভিধান, সংবাদপত্র, ওয়েবসাইট, বাজারে ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মান ও অন্য দেশের ব্যবহার বিবেচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক চুক্তি:
বাংলাদেশ যদি এখনো সদস্য না হয়ে থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিচের আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব চুক্তিগুলোতে যোগ দিতে হবে ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে বার্ন কনভেনশন, মারাকেশ ট্রিটি ও প্যারিস কনভেনশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অন্যদিকে বুদাপেস্ট ট্রিটি, হেগ অ্যাগ্রিমেন্ট (জেনেভা অ্যাক্ট), পেটেন্ট কো-অপারেশন ট্রিটি, পেটেন্ট ল ট্রিটি, সিঙ্গাপুর ট্রিটি, ইউপিওভি কনভেনশন, ডব্লিউআইপিও কপিরাইট ট্রিটি এবং ডব্লিউআইপিও পারফরম্যান্সেস অ্যান্ড ফোনোগ্রামস ট্রিটিতে ৫ বছরের মধ্যে যোগ দিতে হবে। আর মাদ্রিদ প্রটোকলে যোগ দেওয়ার সময়সীমা ৩ বছর।

সেবা খাত:
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিওর জয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ অন সার্ভিসেস ডোমেস্টিক রেগুলেশনসে যোগ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিমা খাতে বাধ্যতামূলক রিইনস্যুরেন্স সেশন তুলে দিতে হবে। ফলে মার্কিন বিমা কোম্পানিগুলোকে আর তাদের অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দিতে হবে না।

বিনিয়োগ:
বাংলাদেশ তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ওপর থাকা বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিল করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারীদের এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) দেবে।

বিনিয়োগের অর্থ আনা-নেওয়ার অনুমোদনপ্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। বিদেশি মুদ্রায় বাজারদরে টাকা পাঠানোর সুযোগও রাখতে হবে। এ ছাড়া মার্কিন কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে এবং এ–সংক্রান্ত আইএমএফ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিও মানতে হবে।

ভালো নিয়ন্ত্রক চর্চা ও স্বচ্ছতা:
বাংলাদেশকে আইন-বিধি ও সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। নতুন নিয়ম করার আগে সবাইকে জানিয়ে মতামত নিতে হবে। নিয়ম তৈরিতে তথ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান মেনে অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য বাধা কমাতে হবে এবং পুরোনো নিয়ম নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা:
বাংলাদেশকে দুর্নীতি ঠেকাতে শক্ত আইন করতে ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের শাস্তি, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রম আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থা:
বাংলাদেশকে শ্রম আইন সংশোধন করে সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে ইউনিয়ন নিবন্ধনের ২০ শতাংশ সদস্যের শর্ত কমানো, ইউনিয়ন বাতিলে শ্রম আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা এবং সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্যের চাহিদা সীমিত রাখার কথা আছে। ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য একটি সাধারণ সভা, গঠনতন্ত্র গ্রহণ ও কার্যবিবরণী জমা দিলেই চলবে। ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্য ও অন্যায্য শ্রমচর্চার জরিমানা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা অন্যায্য শ্রমচর্চা হিসেবে গণ্য হবে এবং শ্রমিক বা ইউনিয়ন সরাসরি শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবে।

ধর্মঘটের অধিকারের ওপর অযৌক্তিক বাধাও কমাতে হবে। যেমন প্রতিষ্ঠান চালুর পর নির্দিষ্ট সময় ধর্মঘট নিষিদ্ধ রাখার বিধান তুলে দেওয়া এবং অবৈধ ধর্মঘটের জন্য জেলসহ কঠোর শাস্তি কমানো।

ইপিজেডে শ্রমিকদের অধিকার:
বাংলাদেশকে ইপিজেডে কর্মীদের সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দুই বছরের মধ্যে ইপিজেডগুলোকে বাংলাদেশ শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও তাতে যোগ দিতে পারেন, অথবা ইপিজেড শ্রম আইন এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে স্বাধীন ইউনিয়ন গঠন সম্ভব হয়।

ইপিজেড শ্রম আইনকে বাংলাদেশ শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ধর্মঘটের অধিকারে অযৌক্তিক বাধা তুলে দিতে হবে এবং অবৈধ ধর্মঘটের জন্য জেলসহ কঠোর শাস্তি কমাতে হবে।

অন্যান্য ব্যবস্থা:
বৈধ ইউনিয়ন কার্যক্রম ও প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কারণে পোশাকশ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে থাকা বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার করতে হবে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনের মামলাও থাকবে। চুক্তির তিন বছরের মধ্যে নিয়মিত ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং এরপর প্রতিবছর তা পর্যালোচনা করতে হবে। শ্রমিক ইউনিয়নের আবেদন ৫৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি, অনলাইনে আবেদনের অবস্থা প্রকাশ এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

শ্রম আইন বাস্তবায়নে বাজেট, পরিদর্শক নিয়োগ ও পদোন্নতি বাড়াতে হবে। পরিদর্শকদের ইপিজেডসহ সব কর্মস্থলে আকস্মিক পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। শ্রম, অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা ভাঙলে শাস্তি বাড়াতে হবে এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে।

পরিবেশ:
বাংলাদেশের আইন ও নীতিতে উচ্চমানের পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

অবৈধ কাঠ কাটা ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য:
বাংলাদেশকে অবৈধ বনজ পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে হবে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। বন খাতে সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী আইন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও গাছ কাটার অনুমতি অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।

সম্পদ-দক্ষ অর্থনীতি:
বাংলাদেশকে সম্পদের অপচয় কমিয়ে দক্ষ অর্থনীতি গড়তে হবে। এ জন্য বাণিজ্য বাধা কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং ব্যবহৃত পণ্য আবার উৎপাদনচক্রে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

মৎস্য ভর্তুকি:
বাংলাদেশকে দ্রুত ডব্লিউটিওর মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অবৈধ মাছ ধরা, অঘোষিত মাছ ধরা এবং অতিরিক্ত শিকার হওয়া মাছের মজুতে ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে।

মৎস্য ভর্তুকি যেন অতিরিক্ত নৌযান, অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত মাছ ধরা না বাড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দরকার হলে ভর্তুকি ব্যবস্থাও সংস্কার করতে হবে।

টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশকে টেকসইভাবে মাছ ধরা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষা পায়। অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ঠেকাতে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, বন্দরে নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধ মাছ বা মাছজাত পণ্য জাহাজে স্থানান্তর বন্ধ করতে হবে।

অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য দমন:
বাংলাদেশকে অবৈধ বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ বাণিজ্য ঠেকাতে হবে। বন্দরে নজরদারি ও চালান পরীক্ষা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাচার বন্ধ করতে হবে এবং ইচ্ছাকৃত আন্তর্জাতিক পাচারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক সনদ (সাইটিস):
বাংলাদেশকে সাইটিস বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে, যাতে তালিকাভুক্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের বাণিজ্য আইনসম্মত ও টেকসই হয় এবং খসড়া জাতীয় আইন চূড়ান্ত করে সাইটিস সচিবালয়ে জমা দিতে হবে।

শুল্ক ও বাণিজ্য সহজীকরণ:
বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিংকে বৈধ দলিল হিসেবে মানবে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক তথ্য গোপন রাখবে এবং কম ঝুঁকির দ্রুত চালান দ্রুত ছাড় করবে। ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) সংশোধনের আবেদন কাস্টমস মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশকে বাণিজ্য ও শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে ডব্লিউটিওর নিয়ম মানতে হবে। শুল্ক মূল্যায়নের তথ্য ডব্লিউটিওতে দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাংস, পোলট্রি, মাছ ও ডিমজাত পণ্যের ইলেকট্রনিক সনদ সরাসরি গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি:
বাংলাদেশ ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখে সীমান্ত-পেরোনো ডেটা আদান-প্রদানের আন্তর্জাতিক সনদকে স্বীকৃতি দেবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন করার সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ব্যবসায়ীদের মতামত বিবেচনা করবে।

সাইবার সেফটি অধ্যাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা যুক্ত হবে, তবে সাইবার অপরাধের শাস্তি কঠোর করা হবে। ২০২১ সালের ডিজিটাল, সামাজিক মাধ্যম ও ওটিটি বিধিমালা বদলানো বা বাতিল হবে; এনক্রিপটেড সেবায় ব্যবহারকারী শনাক্ত ও এনক্রিপশন কি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হবে। এ ছাড়া ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি অংশ লাইসেন্স ছাড়া ওয়াই-ফাই ধরনের প্রযুক্তির জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং এ-সংক্রান্ত যন্ত্রের অনুমোদন দ্রুত চালু করা হবে।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা:
বাংলাদেশ বন্দর, পণ্য পরিবহন নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজে নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যাতে সাইবার ঝুঁকি, তথ্য ফাঁস ও বিদেশি সরকারের অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংবেদনশীল পণ্য অনুমতি ছাড়া রপ্তানি, পুনঃরপ্তানি বা দেশের ভেতরে হস্তান্তর করা যাবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কাস্টমস ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করবে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করবে।

বাংলাদেশ নিজস্ব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এতে তদন্ত, নিরীক্ষা এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাস্তির বিধান থাকবে। যেসব দেশকে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মনে করবে, সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা সীমিত রাখবে বাংলাদেশ। উৎস : প্রথম আলো অনলাইন, ৪ মে ২০২৬

লেখক : শওকত হোসেন, প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অন্তবর্তী সরকার, ক্ষতি, ট্রাম্প
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন