জাতিসংঘে মিথ্যাচার, সন্তু লারমার নাতনির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি

fec-image

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র কোনো ভাবেই থামছে না। বরং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিশ্ব দরবারে। গত কয়েক দশক ধরে এটি ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমার বক্তব্য পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২৩ এপ্রিল ২০২৬ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিবেশনের বক্তব্যে অগাস্টিনা চাকমার দাবি— “জুম্মা নারী ও শিশুরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে জেগে ওঠে যে তারা পরবর্তী হামলা থেকে বেঁচে থাকতে পারবে কি না।” তার এই বিভ্রান্তিমূলক ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য কেবল ‘মিথ্যাচার’ নয়, বরং সুপরিকল্পিত এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।

তার এই ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে ২৪ এপ্রিল শুক্রবার রাঙামাটিতে এবং ২৫ এপ্রিল শনিবার খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ ও ছাত্র পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এ বিষয়ে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। একইসাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও বাদানুবাদ চলছে। প্রশ্ন উঠেছে যে, বিদেশের মাটিতে বসে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার এই দুঃসাহস তারা কোথায় পায়?

আন্তর্জাতিক মহলে অগাস্টিনা চাকমার এই স্পর্ধার নেপথ্য শক্তি বুঝতে কোনো রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। অগাস্টিনা চাকমা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নাতনি এবং প্রীতিবিন্দু চাকমার কন্যা।

সন্তু লারমা নিজে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর থেকে গত ২৯ বছর ধরে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারটি আঁকড়ে ধরে আছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, সরকারি পাহারায় থেকে নিজের নাতনিকে দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন বিষোদগার করানো মূলত এক চরম দ্বিচারিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

মজার বিষয় হলো, অগাস্টিনা চাকমা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাহাড়ি নারীদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতির ঝান্ডা উড়িয়ে সিমপ্যাথি আদায়ের চেষ্টা করলেও তার ব্যক্তিগত জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানে তিনি কানাডার প্রবাসী এবং সেখানে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়। ২০২৩ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো সাক্ষ্য দেয়— পশ্চিমা উগ্র জীবনযাপন, খোলামেলা পোশাক এবং মদ্যপ অবস্থায় বিদেশি পুরুষদের সাথে সখ্যতা তার নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।

যে জুম্ম নারীরা পাহাড়ে কঠোর পরিশ্রম করে অত্যন্ত শালীন জীবন যাপন করেন, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে অগাস্টিনার মতো একজন বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারককে কোনোভাবেই গ্রহণ করা যায় না। এটি পাহাড়ের নিরীহ জুম্ম জনগণের সরলতাকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক মহলের করুণা আদায়ের একটি নোংরা কূটকৌশল মাত্র। প্রশ্ন জাগে, যিনি নিজে পাহাড়ের কৃষ্টি থেকে যোজন যোজন দূরে থাকেন, তিনি কোন অধিকারে পাহাড়ের নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশে নালিশ করেন?

অগাস্টিনা চাকমা তার বক্তব্যের একাংশে জুম্ম নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাতে একটি আংশিক সত্য লুকিয়ে আছে। পাহাড়ের নারীরা সত্যিই অনিরাপদ, তবে তার কারণ রাষ্ট্র বা নিরাপত্তা বাহিনী নয়; বরং তার দাদা সন্তু লারমার হাতে গড়া জেএসএস (মূল) এবং এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবর্ণনীয় অত্যাচার। পাহাড়ে আজ চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং খুনের প্রধান কারিগর এই জেএসএস।

এর একটি প্রমাণ ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারির ‘হিমাদ্রী পাড়া হত্যাকাণ্ড’। বান্দরবানের রুমা সীমান্তে জেএসএস সন্তু লারমার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন উমেং মারমা (৩৪), যিনি ১৮ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়াও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসা বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যকার ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় প্রতিদিন পাহাড়ে লাশ পড়ছে। অথচ অগাস্টিনাদের বক্তব্যে এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা একবারও উচ্চারিত হয় না।

২০ এপ্রিল জাতিসংঘের ২৫তম অধিবেশনে ‘এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্ট’ (এআইপিপি)-এর সাইড ইভেন্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে একপক্ষীয় ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। এই অধিবেশনে অংশ নেওয়া চক্রের সদস্যদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত পিসিজেএসএস-এর একটি ‘ফ্যামিলি বিজনেস’। নিউইয়র্কে অগাস্টিনা চাকমার সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন সন্তু লারমার পরিবারের সদস্য ছনছনা চাকমা ও প্রীতিবিন্দু চাকমা। এছাড়াও এই চক্রে যুক্ত রয়েছেন পল্লব চাকমা, জেনিফার টাউলি কর্পুজ, বিনোতা ময় ধামাই, অর্ণব দেওয়ান ও শোহেল।

এই অপপ্রচার নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালেও জাতিসংঘের এক বৈঠকে সন্তু লারমার জামাতা (মেয়ে জুলিয়ানা লারমার স্বামী) প্রীতিবিন্দু চাকমা অনলাইনে অংশ নিয়ে একই ধরনের মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা এবং তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীকে শান্তিরক্ষী মিশন থেকে প্রত্যাহারের দাবি তোলা একটি পরিকল্পিত দেশবিরোধী এজেন্ডা।

অগাস্টিনা চাকমা ও তার সহযোগীদের অভিযোগগুলোর সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এর প্রধান তিনটি দিক হলো-
১. নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা:
অগাস্টিনারা বারবার সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি তুললেও সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিরা মনে করে, সেনাবাহিনী না থাকলে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও চাঁদাবাজিতে পাহাড় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ত। মূলত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের পথ পরিষ্কার করার জন্যই সেনাবাহিনী সরানোর এই বায়না।

২. ৫১ শতাংশ বাঙালির অস্তিত্ব অস্বীকার:
অগাস্টিনা তার বক্তব্যে পাহাড়ের ৫১ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকারের বিষয়টি সুকৌশলে চেপে যান। বাঙালিদের ‘সেটলার’ আখ্যা দিয়ে তাদের উচ্ছেদের যে ডাক তিনি দিয়েছেন, তা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং সাম্প্রদায়িক উসকানি।

৩. উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা:
গত কয়েক বছরে পাহাড়ে যে অভূতপূর্ব অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সীমান্ত সড়ক ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ হয়েছে, তা অগাস্টিনারা কখনোই আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকার করেন না। তাদের উদ্দেশ্য পাহাড়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখা, যাতে তাদের অবৈধ সাম্রাজ্য রক্ষা পায়।

পাহাড়ের ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রের করণীয়:
সন্তু লারমা একদিকে রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় আসীন থেকে সকল সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন, অন্যদিকে তার আত্মীয় ও অনুসারীরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ করছেন—এই দ্বৈত নীতি আর কতদিন চলবে? স্থানীয়দের যৌক্তিক প্রশ্ন— যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের অর্থ ও পাহারায় বেঁচে আছেন, তিনি কীভাবে রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অপমান করার লাইসেন্স পান?

পার্বত্য চুক্তির আগে সন্তু লারমার সশস্ত্র ক্যাডাররা মানুষ মারতেন। চুক্তি পরবর্তী সময়ে অস্ত্র জমা দেওয়ার নাম করে তারা আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে। জেএসএস ও সমমনা সংগঠনগুলোর আধিপত্যের লড়াইয়ে কতো পাহাড়ি মায়ের বুক খালি হয়েছে, কতো ভাইয়ের রক্তে পাহাড় ভিজেছে, তা নিয়ে অগাস্টিনাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের লক্ষ্য কেবল ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলে আন্তর্জাতিক তহবিল আর সিম্প্যাথি আদায়।

পরিশেষে- সন্তু লারমার নাতনি অগাস্টিনা চাকমা কিংবা জামাতা প্রীতিবিন্দু চাকমা গংদের এই রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের দায় সন্তু লারমারই। এ অপপ্রচারের রুখতে কেবল সভা-সমাবেশ যথেষ্ট নয়। যারা বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিতর্কিত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় পদে থেকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালানোর এই অপকৌশল শক্ত হাতে দমন করা এখন সময়ের দাবি। পাহাড়ের শান্তি রক্ষায় সাম্প্রদায়িক উসকানি বন্ধ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং সকল জনগোষ্ঠীর (পাহাড়ি ও বাঙালি) সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। বাংলার আকাশ থেকে পাহাড়—সর্বত্রই দেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে অটুট।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তথ্যসূত্র: পার্বত্যনিউজ, হিল নিউজ বিডি, সিএইচটি নিউজ২৪.কম ও জাতিসংঘ অধিবেশন নথি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন