কালরাতের কালো কাহিনী


জানুয়ারি, ২০১৬। ঢাকা।
শীতের সকালের কুয়াশা তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ছাদ ছুঁয়ে নামেনি। চারদিকের পুরনো বই আর কাগজের একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। কর্নার টেবিলটায় বসে আছে ফাহিম। পেশায় সে একজন ফ্রিল্যান্স ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট এবং সামরিক ইতিহাসের গবেষক। গত তিন মাস ধরে সে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কাজ করছে- ‘আশির দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতি’।
ফাহিমের সামনে ছড়ানো একগাদা পুরনো খবরের কাগজ আর কিছু ডিক্লাসিফাইড বা খণ্ডিত বিদেশি সামরিক জার্নাল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ওয়াশিংটনের একটি থিংক- ট্যাংকের পুরনো আর্কাইভ থেকে প্রিন্ট করা চার পাতার একটা নথিতে। ফাইলটার ওপরে লাল কালিতে লেখা ‘Operation Lost Identity The Geopolitical Re-shaping of Chittagong Hill Tracts (1979-1981)”
নথিটার ভেতরে একটা মানচিত্র আঁকা। সেখানে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানকে একটা অদ্ভুত লাল বৃত্তে বন্দি করা হয়েছে। আর তার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ভারতের মিজোরাম ও মণিপুরের কিছু অংশ। রিপোর্টের নিচে টাইপ করা একটা লাইন দেখে ফাহিমের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল :
If President Zia’s demography-shift program succeeds, Tel Aviv’s long-term access to the Bay of Bengal will be permanently blocked.”
(যদি প্রেসিডেন্ট জিয়ার জনমিতি কর্মসূচি সফল হয়, তবে বঙ্গোপসাগরে তেল আবিবের দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশপথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।)
ফাহিম চশমাটা খুলে চোখ রগড়াল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনাবিদ্রোহে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন- এটাই এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস। কিন্তু এই ফাইলের সূত্র ধরে যদি এগোনো যায় তবে তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকহোল।
ফাহিম তার ল্যাপটপটা অন করল। ইতিহাসের সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢোকার সময় এসেছে।
দুই.
জুলাই, ১৯৭৯। ইসরায়েল।
তেল আবিবের কিং সলমন স্ট্রিটের একটা সাধারণ চেহারার বহুতল ভবন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো সাধারণ করপোরেট অফিস, কিন্তু ভূগর্ভস্থ তিন তলার নিচে যে ল্যাবরেটরি আর ওয়ার-রুম আছে, তা নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
কনফারেন্স রুমের প্রজেক্টরে একটা স্লাইড ভেসে উঠল। স্ক্রিনে একজন আদিবাসী মানুষের ছবি, যার চেহারার সাথে দূরপ্রাচ্যের মিল স্পষ্ট।
রুমের প্রধান কর্মকর্তা ডেভিড হাতের লেজার পয়েন্টার দিয়ে ছবিটা দেখিয়ে বললেন, “এরা হলো মণিপুর এবং মিজোরামের কুকি-চিন-মিজো জনগোষ্ঠীর একটা অংশ। আমাদের গবেষকরা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ পেয়েছেন, এরা “মেনাশে’ বা ইসরায়েলের হারিয়ে যাওয়া লস্ট ট্রাইবদের একটি। এরা আমাদেরই লোক। ”
টেবিলের চারপাশে বসা অন্য কর্মকর্তারা মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। সবাই নড়েচড়ে বসলেন। ডেভিড স্লাইড পরিবর্তন করলেন। এবার স্ক্রিনে ভেসে উঠল দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র।
‘আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট, ডেভিড বলতে লাগলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আমরা চারপাশ থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত। আমাদের একটা ‘সেকেন্ড হোম’ বা দ্বিতীয় ইহুদি রাষ্ট্র দরকার, যা হবে এই এশিয়ায়। ভারতের এই লস্ট ট্রাইবের অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে আমরা একটা নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করব। কিন্তু সমস্যা একটা আছে।’
ডেভিড মানচিত্রের একটা জায়গায় জুম করলেন।
‘ভারতের এই অংশটা ল্যান্ডলকড। এর কোনো সমুদ্রসীমা নেই। চারপাশ থেকে চীন, ভারত আর মিয়ানমার একে চেপে ধরতে পারে। এই নতুন রাষ্ট্রকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে আমাদের একটা লাইফলাইন চাই। সমুদ্র এবং আকাশপথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অবাধ স্বাধীনতা চাই। আর সেই চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ঠিক এইখানটায়- বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম।’
সবাই মানচিত্রের দিকে তাকাল। পার্বত্য চট্টগ্রামের গাঢ় সবুজ পাহাড়গুলো সোজা নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির দিকে।
‘আমাদের প্ল্যান হলো বম সম্প্রদায়ের মাধ্যমে এগোতে হবে,’ ডেভিড ঠান্ডা গলায় বললেন। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বম এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাথে মিজোরামের এই লস্ট ট্রাইবের রক্তের যোগাযোগ আছে। আমরা যদি বমদের বাসস্থান আর পার্বত্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারি, তবে আমাদের নতুন দেশ সমুদ্রের সাথে সরাসরি জুড়ে যাবে। আকাশপথ আর সমুদ্রপথ- দুই-ই আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। এই অপারেশনের নাম “নিউ কানানা’।
“কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকার?’ একজন কর্মকর্তা প্রশ্ন করলেন।
ডেভিডের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সেখানেই আসল বাধা। ঢাকার মসনদে এখন যিনি আছেন, তিনি সাধারণ কোনো পলিটিশিয়ান নন। তিনি একজন আজীবন ক্যাডেট, ক্ষুরধার সামরিক মগজের মানুষ। ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিতে তার মেধা অসাধারণ। তার চোখ এড়িয়ে এই পাহাড় দখল করা অসম্ভব।’
তিন.
নভেম্বর, ১৯৮০। ঢাকা।
শীতের রাতে বঙ্গভবনের স্টাডি রুমে একা বসে ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার পরনে চিরচেনা সেই ধূসর সাফারি। টেবিলের ওপর এক কাপ লিকার চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। তার সামনে বসা ডিরেক্টরেট অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের (DMI) তৎকালীন প্রধান।
‘স্যার, রিপোর্টটা কিন্তু খুবই অ্যালার্মিং, ডিএমআই প্রধান বললেন। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বম পাড়াগুলোতে ইদানীং কিছু বিদেশি এনজিওর তৎপরতা সন্দেহজনক। তারা শুধু ধর্মপ্রচার বা সমাজসেবা করছে না। আমাদের বর্ডার ইন্টেলিজেন্স বলছে, মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে কিছু অস্ত্র আর গোপন ফান্ডিং ঢুকছে। লক্ষ্য- পাহাড়িদের মনে একটা আলাদা স্বাধীনতার স্বপ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া।’
প্রেসিডেন্ট জিয়া চশমাটা ঠিক করে মানচিত্রের দিকে তাকালেন। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানকে বেষ্টন করা পাহাড়ি অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি তার নখদর্পণে। তিনি নিজেই এই পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঘুরেছেন।
‘হুম,’ প্রেসিডেন্ট নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন। ‘ওরা ভাবছে আমি শুধু ফাইল সই করা প্রেসিডেন্ট। ওরা ভুলে গেছে আমি একজন সৈনিক। মিজোরামের ওদিকের মুভমেন্ট আর বমদের এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আমি বুঝি। ওরা যদি এই তিন জেলাকে ল্যান্ডলকড মিজোরামের সাথে জুড়ে দিয়ে কোনো
আন্তর্জাতিক শক্তির বাফার স্টেট বানাতে পারে, তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব শেষ। বঙ্গোপসাগরে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।’
ডিএমআই প্রধানের কৌতূহল- ‘তাহলে আমাদের করণীয় কী, স্যার? আর্মি অ্যাকশন?’
‘না,’ প্রেসিডেন্ট জিয়া মাথা নাড়লেন। ‘শুধু বন্দুকের গুলি দিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ঠেকানো যায় না। পাহাড়ের ভৌগোলিক চরিত্র দুর্গম, সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। শত্রুরা এই শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে। আমাদের এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে।’
প্রেসিডেন্ট একটা লাল কলম নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ফাঁকা জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বললেন- “আগামী মাস থেকে আমরা একটা সুদূরপ্রসারী প্রজেক্ট শুরু করব। সমতলের নদীভাঙা, ভূমিহীন হাজার হাজার মানুষকে আমরা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় পাহাড়ে নিয়ে আসব। তাদেরকে সেখানে জমি দেওয়া হবে, নিরাপত্তা দেওয়া হবে। যখন পাহাড়ের আনাচে- আনাচে আমাদের নিজেদের জনসংখ্যার আধিক্য তৈরি হবে, তখন পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আর সহজে বাইরের উষ্কানিতে সাড়া দিতে পারবে না। জনমিতির এই ব্যালেন্সই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় ডিফেন্স ওয়াল।
পরের কয়েক মাসে প্রেসিডেন্টের এই একক ও মাস্টারস্ট্রোক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে শুরু করল। হাজার হাজার সেটেলার সমতল থেকে পাহাড়ে গিয়ে বসতি স্থাপন করল। মোসাদের তৈরি করা নিখুঁত ছকের দেয়ালে প্রথম বড় ধাক্কাটা দিলেন এই চৌকস সেনা অফিসার।
চার.
ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১। রুমা, বান্দরবান।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার গহিন অরণ্যে ঘেরা এক বম পাড়া। পাহাড়ি কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ। পাড়ার এক কোণে একটা কাঠের মাচাং ঘরে লণ্ঠনের আলোয় বসে ছিলেন। এক বিদেশি গবেষক। পাসপোর্টে তার নাম ডক্টর পিটার খোদাই করা হলেও তেল আবিবের রেকর্ডে তার আসল পরিচয় সে মোসাদের একজন তুখোড় মাঠপর্যায়ের সাইকোলজিক্যাল অপারেটর- মিস্টার আর্থার।
তার সামনে বসে আছেন বম সম্প্রদায়ের একজন স্থানীয় তরুণ নেতা। আর্থার টেবিলের ওপর চামড়ায় বাঁধানো একটা ডায়েরি আর কিছু প্রাচীন নথির অনুকরণ মেলে ধরলেন।
‘তোমাদের পূর্বপুরুষরা এই পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ছিলেন না’ আর্থার বেশ গুছিয়ে পাহাড়ি ভাষায় বললেন। “তোমরা ঈশ্বরের বেছে নেওয়া এক হারিয়ে যাওয়া পবিত্র বংশের রক্ত। ভারতের মিজোরাম ও মণিপুরের পাহাড়গুলোতে তোমাদের ভাইরা জেগে উঠেছে। তারা এক স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখছে। তোমরা কেন এই সমতলের বাঙালিদের শাসনে থাকবে?’
তরুণ বম নেতা ডায়েরির হিব্রু হরফ ও প্রাচীন নকশার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। আর্থার বুঝতে পারলেন, মনের ভেতরে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করা হয়ে গেছে। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘তোমাদের এই লড়াইয়ে অর্থের অভাব হবে না। আকাশ আর সমুদ্রের ওপার থেকে আমাদের জাহাজ আসবে তোমাদের সাহায্য করতে। শুধু এই পাহাড়ের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কর।’ কিন্তু ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় আর্থারের সেই গোপন ডায়েরি ও মিশনের নথির কিছু খসড়া পাতা হাওয়া হয়ে গেল।
পাহাড়ে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ততদিনে ইন্টেলিজেন্সের নজরদারি তীব্র করা হয়েছে। সাধারণ পোশাকে এক তরুণ সেনা অফিসার ছদ্মবেশে সেই পাড়ায় ঢুকে পড়েছিলেন এবং আর্থারের অসতর্কতার সুযোগে ডায়েরির কিছু জরুরি পাতা নিজের জ্যাকেটের ভেতর লুকিয়ে ফেলেন। সেই পাতায় পরিষ্কার ছক আঁকা ছিল কীভাবে মিজোরামের পাহাড় থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেটে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের আন্তর্জাতিক করিডোর’ তৈরি করা হবে।
সেই ডায়েরির ছেঁড়া পাতাগুলো যখন ঢাকায় সরাসরি রাষ্ট্রনায়কের টেবিলে পৌঁছল তখন তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, এই ষড়যন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলতে হলে শত্রুকে আর সময় দেওয়া যাবে না। পাহাড়ে সেটেলার পাঠানোর গতি তিনি আরও বাড়িয়ে দিলেন, যা মোসাদের ‘অপারেশন নিউ কানান’-এর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল। রুমা সীমান্ত থেকে আর্থারকে তাড়াহুড়ো করে মিশন গুটিয়ে পালিয়ে যেতে হলো।
পাঁচ
মার্চ, ১৯৮১। ব্যাংকক, থাইল্যান্ড।
ব্যাংককের একটি অভিজাত হোটেলের সুইটে বসে আছেন। মোসাদের এশিয়ান চিফ রাফায়েল এবং বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একজন উচ্চাভিলাষী ক্ষুব্ধ অফিসার মেজর জেনারেল মঞ্জুর। মঞ্জুর তখন চট্টগ্রামে জিওসি হিসেবে দায়িত্বরত, কিন্তু ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে থাকায় তার মনে তীব্র অসন্তোষ।
রাফায়েল মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘জেনারেল মঞ্জুর, আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, অথচ জিয়াউর রহমান আপনাকে ঢাকা থেকে দূরে সরিয়ে চট্টগ্রামে ফেলে রেখেছেন। আপনার মতো মেধাবী অফিসারের স্থান তো বঙ্গভবনে হওয়া উচিত।’
মঞ্জুরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ‘জিয়া কাউকেই বিশ্বাস করে না। সে পুরো আর্মিকে নিজের মতো করে চালাতে চায়।’
‘তাহলে তাকে থামানোই তো একমাত্র পথ,’ রাফায়েল ঝুঁকে এলেন। ‘সে পাহাড়ে যে সেটেলার পলিসি শুরু করেছে, তাতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। আমাদের ফিল্ড এজেন্ট আর্থারকে সেখান থেকে পিছু হটতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার এই ক্ষুরধার প্রতিরক্ষা মেধা থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠবে, যা আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী হবে।
“কিন্তু তাকে সরানো এত সহজ নয়। সে সেনাবাহিনীতে ভীষণ জনপ্রিয়, মঞ্জুর দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললেন।
“সব সেনাবাহিনীতেই ফাটল থাকে, জেনারেল, রাফায়েল মুচকি হাসি দিয়ে পকেট থেকে একটি এনক্রিপ্টেড ক্যাসেট আর কিছু নথিপত্র বের করলেন। ‘আপনার সাথে চট্টগ্রামের আরও কয়েকজন অফিসার আছেন, যারা জিয়ার ওপর অসন্তুষ্ট। আমরা আপনাদেরকে ব্যাকআপ দেব। লজিস্টিকস, ইন্টারন্যাশনাল রিকগনিশন- সব পাবেন।
শুধু একটা সেনাবিদ্রোহের নাটক সাজাতে হবে। এমনভাবে করতে হবে যেন মনে হয় এটা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই। জিয়ার চ্যাপ্টার ক্লোজ করতে হবে।’ ক্ষমতার লোভ আর সূক্ষ্ম উস্কানির বিষ ধীরে ধীরে মঞ্জুরের মগজে ঢুকে গেল। তিনি হাত মেলালেন রাফায়েলের সাথে। মোসাদের ঘৃণিত দুরভিসন্ধির বাস্তবায়ন এবার চাপল বিভীষণদের কাঁধে।
ছয়.
৩০ মে, ১৯৮১। চট্টগ্রাম।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। কালবৈশাখীর ঝড়ে চট্টগ্রামের চেনা আকাশটা যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। মেঘের ডাক আর বৃষ্টির শব্দে সার্কিট হাউসের চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে।
সার্কিট হাউসের দোতলার ঘরে খাটের ওপর ঘুমাচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার ঘরের বাইরে দু-তিনজন সেন্ট্রি ডিউটি করছিল। কিন্তু তারা জানত না, এই বৃষ্টির শব্দের আড়ালে ধেয়ে আসছে মৃত্যুর ভয়াবহ কাফেলা।
রাত ঠিক চারটে। হঠাৎ সার্কিট হাউসের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল সামরিক জিপ আর পিকআপ। গাড়ি থেকে নেমে এলো একদল সেনা সদস্য, যাদের চোখ ক্ষোভে আর উস্কানিতে অন্ধ। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মঞ্জুরের অনুগত কয়েকজন জুনিয়র অফিসার।
আচমকা গর্জে উঠল স্বয়ংক্রিয় সাব-মেশিনগান। বিশ্বস্ত সেন্ট্রিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়ল রক্তে।
গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল প্রেসিডেন্টের। তিনি বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন। ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসতেই তিনি দেখলেন করিডোর বেয়ে এগিয়ে আসছে তার নিজেরই সেনাবাহিনীর কিছু চেনা মুখ।
তিনি ভয় পেলেন না। একজন আজীবন ক্যাডেট আর বীর উত্তমের চোখে মৃত্যুর কোনো ভয় ছিল না। তিনি শক্ত গলায় প্রশ্ন করলেন, “তোমরা কী চাও? তোমরা এখানে কেন?”
ঘাতকদের পক্ষে কোনো যুক্তি ছিল না, তাদের পেছনে ছিল শুধু নিখুঁত স্ক্রিপ্ট। উত্তর এলো বুলেটের মাধ্যমে।
ঝাঁক ঝাঁক বুলেট এসে বিদ্ধ করল রাষ্ট্রনায়কের বুক। সার্কিট হাউসের ধবধবে সাদা মেঝে মুহূর্তের মধ্যে লাল রক্তে ভেসে গেল। নিথর হয়ে পড়ে রইল এদেশের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষুরধার প্রতিরক্ষা মেধার অধিকারী সেই মানুষটি।
সাত
জানুয়ারি, ২০১৬। ঢাকা
লাইব্রেরির ঘড়িতে তখন দুপুর বারোটা। ফাহিম ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। তার হাত দুটো কাঁপছে। ল্যাপটপের পাশে রাখা বান্দরবানের রুমা থেকে উদ্ধার হওয়া সেই ডায়েরির ফটোকপি করা পাতার ছবিগুলো জ্বলজ্বল করছে।
সে বুঝতে পারল, ১৯৮১ সালের ৩০ মে শুধুমাত্র একটা সাধারণ সেনাবিদ্রোহ বা এক রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকাণ্ড ছিল না। ওটা ছিল সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলার একটা চূড়ান্ত নষ্ট অঙ্ক। প্রেসিডেন্ট জিয়া পাহাড়ে সেটেলার বসিয়ে এবং রুমা সীমান্তে মোসাদের মনস্তাত্ত্বিক এজেন্টের ডায়েরি ধরে ফেলে তাদের ‘দ্বিতীয় ইহুদি রাষ্ট্র’ বা বম অঞ্চল দখলের যে ছক ভেঙে দিয়েছিলেন, তারই নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছিল এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।
ইতিহাসের পাতায় এটাকে কেবলই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সত্যের সূত্রগুলো আজ এত বছর পর এক এক করে জোড়া লাগছে। ফাহিম জানালার বাইরে তাকাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মোড়ে তখন তারুণ্যের কোলাহল। সে মনে মনে ভাবল, এই গল্পটা যখন দেশের মানুষ জানবে, তখন সত্যিই কি এই অমোঘ সত্যের কোনো প্রভাব কোথাও পড়বে? পর্দার ওপারের সত্য সব সময়ই চেনা ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর আর ভয়ংকর হয়। এত বছর পর মানুষ কি এই ভয়ংকর সত্য জেনে শিহরিত হবে? নাকি ব্যথিত?
[ লেখাটি কাল্পনিক কিংবা একটি ফিকশন গল্প হতে পারে। আবার এতে থাকতে পারে নির্মম বাস্তবতার কোনো সংশ্লেষ। সেটা বিবেচনার ভার পাঠকের ওপর ছেড়ে জিয়াউর রহমানের শাহাদতের মাসে লেখাটি প্রকাশ করা হলো। ]
উৎস : প্রতিদিনের বাংলাদেশ
















