মারমা তরুণী গণধর্ষণ : পাহাড়ে ধর্ষণের ‘সিলেক্টিভ পলিটিক্স’ ও আঞ্চলিক দলগুলোর নগ্ন ভণ্ডামি


পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, উত্তুঙ্গ পাহাড় আর মেঘের মিতালির আড়ালে প্রতিনিয়ত এক ভয়ংকর ও কুৎসিত রাজনৈতিক খেলা মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই খেলার নাম ‘ধর্ষণের সাম্প্রদায়িকীকরণ’। সমতল ভূমির সাধারণ মানুষ যখন যেকোনো নারীর ওপর হওয়া নির্যাতনকে একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে দেখে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে, তখন পাহাড়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে নয়, বরং বিচার করা হয় অপরাধীর জাতিগত পরিচয় দিয়ে। ধর্ষক যদি বাঙালি হয়, তবে রাতারাতি সমগ্র বাঙালি জাতিকে ‘ধর্ষক’ তকমা দিয়ে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের আন্তর্জাতিক এজেন্ডা শুরু হয়। আর ধর্ষক যদি স্বজাতি বা উপজাতি হয়, তবে রহস্যময় এক নীরবতায় ছেয়ে যায় পুরো পাহাড়; প্রথাগত বিচারের নামে নামমাত্র জরিমানা করে ধামাচাপা দেওয়া হয় এক একটি নির্মম অধ্যায়।
অতি সম্প্রতি খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম কুকিছড়া এলাকার এক মারমা তরুণী (৩০) এক ভয়াবহ ও পৈশাচিক নির্মমতার শিকার হয়েছেন। আকিজ গ্রুপে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গত ১৩ জুন ২০২৬ খ্রি. তাকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে একই ইউনিয়নের বড়ইতলী এলাকার ম্রাসা মারমা (৩৮) ও তার সহযোগীরা তাকে নির্মমভাবে গণধর্ষণ করে।
এই ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ১৪ জুন ২০২৬ খ্রি. ভুক্তভোগীকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেয়েও সুস্থ হননি; বরং ঘটনার ভয়াবহতা ছিল মারাত্মক। একজন বিবাহিত ডিভোর্সী তথা ৩০ বছরের নারী ধর্ষণের ৫ দিন পরও সুস্থ হননি। কতটা নৃশংস ও পাশবিক ও নির্মম ছিল ধর্ষণ। এ সময় সামাজিক ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের চাপে ধর্ষণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে গোপন রাখতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা চললেও তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। অবশেষে গত ১৭ জুন ২০২৬ খ্রি. বুধবার) তাকে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও আজ অবধি এই বিবশ ও অসহায় নারী হাসপাতালের বেডে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। হাসপাতালে তার পাশে অবস্থান করছেন তার খালাসহ কয়েকজন স্বজন, যাদের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার।
পাহাড়ের এই ঘটনার সবচেয়ে জঘন্য দিকটি হলো, ভুক্তভোগী পরিবারটিকে দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় ও বিচার প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখতে চারপাশ থেকে তীব্র চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রভাবশালী আঞ্চলিক ও প্রথাগত সমাজপতিরা চাচ্ছেন না যে এই ঘটনাটি আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত পৌঁছাক।
এখানেই রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি এবং চরম উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পার্বত্যাঞ্চলে কোনো বাঙালির বিরুদ্ধে ধর্ষণের সামান্যতম অভিযোগ বা স্রেফ গুজব ছড়ালে যেখানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতি-তৎপরতা দেখায়, সেখানে একজন উপজাতি নারী স্বজাতি উগ্রবাদীদের দ্বারা দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ধুঁকলেও ঘটনার পাঁচ দিন পরও পুলিশ বা প্রশাসন তাকে কোনো আইনি সহযোগিতা দিতে এগিয়ে আসেনি। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের বা আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা যায়নি। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা না পেয়ে এই ঘটনায় স্থানীয় কিছু প্রতিবাদী মানুষ ধর্ষককে আটক করতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তারা পুরো এলাকাটি ঘিরে রেখেছে৷ এর মধ্যেই ধর্ষক একজন রয়েছে। এই প্রথম পাহাড়ি যুব সমাজ ধর্ষকের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে, এজন্যই তারা উপজাতি সমাজপতি এবং ইউপিডিএফ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
পাহাড় ও সমতলের তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো, যারা কথায় কথায় নারীর অধিকার ও পাহাড়ি নারীদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাজপথ কাঁপায়, তারা এই মারমা তরুণীর পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছে। ধর্ষক স্বজাতি হওয়ায় তাদের এই অন্ধ ও বধির ভূমিকা প্রমাণ করে যে, পাহাড়ে উপজাতি নারীদের সম্ভ্রম ও জীবন কেবলই রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বাঙালি দমনের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অত্যন্ত পরিহাসের বিষয় হলো, পাহাড়ে সামান্য ঘটনার অজুহাতেও যারা সড়কে অবরোধ, ভাঙচুর ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে মরিয়া হয়ে ওঠে, সেই আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু লারমা), হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম এই ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। কোনো বিবৃতি নেই, কোনো প্রতিবাদী মিছিল নেই। কারণ একটাই, ধর্ষক এখানে কোনো বাঙালি বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নয়, ধর্ষক তাদের নিজেদের ‘স্বজাতি’।
প্রথাগত বিচারের প্রহসন এবং ‘ধর্ষণ প্রতিশব্দ’ বিতর্কের অসারতা:
তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং কিছু নৃবিজ্ঞানী প্রায়শই প্রচার করেন যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত সরল এবং তাদের ভাষায় নাকি ‘ধর্ষণ’ শব্দের কোনো প্রতিশব্দই নেই! এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হচ্ছে: ০১ নভেম্বর ২০২০ খ্রি. তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত রাজশাহী প্রতিনিধি আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ-এর একটি বিতর্কিত প্রতিবেদন। উক্ত সংবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি বখতিয়ার আহমেদ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক মো. ইলতেমাস-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছিল যে, চাকমা, মারমা, খুমি, মাহ্লেসহ ৩৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় ‘ধর্ষণ’ শব্দের প্রতিশব্দ নেই এবং প্রথাগত সমাজে বলপ্রয়োগ অনুপস্থিত থাকায় অতীতে এই অপরাধ ছিল না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভাষায় কৃত্রিমভাবে শব্দ না রাখলেও পাহাড়ে স্বজাতি দ্বারা উপজাতি নারীদের অবদমন ও ধর্ষণের হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা সুকৌশলে প্রথাগত আইনি কাঠামোর দোহাই দিয়ে আড়াল করা হয়। পাহাড়ি সমাজে ধর্ষণের বিচার যেন এক আদিম প্রহসন। কোনো উপজাতি নারী ধর্ষিত হলে, প্রথাগত নিয়মে হেডম্যান-কারবারীদের সালিশি বৈঠকে ধর্ষককে নামমাত্র ‘শূকর জরিমানা’ কিংবা মদ্যপানের খরচ প্রদানের মাধ্যমে বিষয়টি রফাদফা করা হয়।
কাপ্তাইয়ের অমানবিক সালিশ ও অন্তঃসত্ত্বা প্রতিবন্ধী নারী: ১৭ আগস্ট, ২০২৫ খ্রি. রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের চংড়াছড়ি মূখ এলাকায় এক মারমা প্রতিবন্ধী নারীকে স্বজাতির তিন পাহাড়ি যুবক অনুচিং মারমা (৫০), কালা মারমা (৫৫) ও মং উ মারমা (৩৫) ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ করে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা করে তোলে। গত ১৭ অক্টোবর বোমাং সার্কেল কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কার্বারী অংমা খৈ মারমা এবং প্যানেল চেয়ারম্যান সিং থোয়াই উ মারমাসহ স্থানীয় সমাজপতিরা প্রথাগত বিচারের নামে এক আদিম প্রহসনের জন্ম দেন। তারা তিন ধর্ষককে মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন, যার মধ্যে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় সমাজের জন্য ‘শুকর’ কিনতে। সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, ধর্ষিতা ওই প্রতিবন্ধী নারীমাকেও সমাজের প্রথানুযায়ী শুকর কেনার জন্য অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়! প্রভাবশালী আঞ্চলিক সশস্ত্র দলের প্রত্যক্ষ চাপ ও বাধার কারণে চন্দ্রঘোনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও অসহায় পরিবারটি শেষ পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এই পৈশাচিক ঘটনাতেও ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর মতো উপজাতি সংগঠনগুলো ধর্ষকদের পক্ষে ভূমিকা পালন করে, যা তাদের চরম দ্বিমুখী নীতি ও তথাকথিত মানবাধিকারের ভণ্ডামিকে আবারও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
রুমার ঘটনা: ১৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রি. বান্দরবানের রুমা উপজেলার পাইন্দু হেডম্যান পাড়ায় একটি পঞ্চম শ্রেণির মারমা শিশুকে তার স্বজাতির পাঁচজন যুবক মিলে গণধর্ষণ করে। স্থানীয় ২নং ওয়ার্ড মেম্বার গংবাসে মার্মা, হেডম্যান মংচউ মার্মা এবং কারবারী থোয়াইসা মার্মা মিলে ১৯ আগস্ট বেলা ১১টায় সালিশ ডেকে অপরাধীদের মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়, তাও আবার ‘বাকিতে পরিশোধের’ শর্তে! ভুক্তভোগীর পরিবারকে পাড়ায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল যাতে তারা প্রচলিত আইনে পুলিশের কাছে যেতে না পারে।
রোয়াংছড়ির ঘটনা ১১ মার্চ ২০২৫ খ্রি. বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে এক মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টার অপরাধে প্রথাগত সামাজিক বিচারে অভিযুক্তকে মাত্র ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। যে সমাজে একটি শিশুর সম্ভ্রমের মূল্য মাত্র কয়েক হাজার টাকা এবং তাও কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য, সেই সমাজের নেতারা যখন মানবাধিকারের বুলি আওড়ান, তখন তা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাঙালি দমন ও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কল্পিত ইতিহাস:
পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীতে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধর্ষণকে সেখানে মূলত বাঙালিদের উচ্ছেদ, ভূমি দখল এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে কোণঠাসা করার অন্যতম মোক্ষম রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
থানচির মব জাস্টিস ২৪ মে ২০২৬ খ্রি. থানচি সদর এলাকায় এক বাঙালি বৌদ্ধ কিশোরের বিরুদ্ধে ত্রিপুরা শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার সাথে সাথে জেএসএস ও পিসিপি সমর্থিত উগ্র উপজাতি যুবকেরা থানা ঘেরাও করে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। চূড়ান্ত মেডিকেল রিপোর্ট কিংবা ডিএনএ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্তকে পিটিয়ে মেরে ফেলবার মধ্যযুগীয় বর্বরতায় মেতে ওঠে তারা। এই ঘটনাকে পুঁজি করে পুরো পাহাড় জুড়ে ইসলাম ধর্ম এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার ও দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়।
খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালার দাঙ্গা গত ২৩ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রি. খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় অষ্টম শ্রেণীর এক মারমা ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে চয়ন শীল নামের এক হিন্দু যুবক কর্তৃক ধর্ষণের কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে ইউপিডিএফ-এর ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গাড়িতে হামলা চালায় এবং বাঙালিদের ঘরবাড়ি-দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করে। পরবর্তীতে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষায় সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ধর্ষণের কোনো আলামতই ছিল না। অথচ এই কাল্পনিক ঘটনার সহিংসতায় ৩ জন সাধারণ মানুষ নিহত, অর্ধশতাধিক আহত এবং বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ১৫-১৬ জন সদস্য গুরুতর আহত হন।
তিন্দুর মিথ্যা নাটক মে ২০২৫ খ্রি. বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে খেয়াং সম্প্রদায়ের এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মিথ্যা নাটক সাজানো হয়েছিল কেবল কৌশলগত সীমান্ত সড়ক নির্মাণকাজ বন্ধ করার জন্য। পরবর্তীতে মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি।
মানিকছড়ির চক্রান্ত ২৩ মার্চ ২০২৬ খ্রি. খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে মোঃ মিজান নামের এক নিরীহ বাঙালি চাষীকে জড়িয়ে যে ‘ধর্ষণ চেষ্টার’ সুপরিকল্পিত গল্প ছড়ানো হয়েছিল, তা মূলত ভূমি দখলের এক অভিনব চক্রান্ত। পাহাড়ের দুর্গম ঢালে বাঙালি কৃষকেরা যখন কঠোর পরিশ্রমে চাষাবাদ করে, তখন তাদের এলাকাছাড়া করতে এই ‘ধর্ষণ’ কার্ডটি ব্যবহার করা হয়। তবে মানিকছড়ির ক্ষেত্রে স্থানীয় মারমা ঐক্য পরিষদের নেতা মংমং মারমাসহ সচেতন নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উন্মোচিত হওয়ায় বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।
আলুটিলার হেনস্তা১৫ মার্চ ২০২৬ খ্রি. চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে আসা তিন পাহাড়ি তরুণী বাঙালি যুবকদের সঙ্গে নিছক সৌজন্যমূলক আলাপ করায় স্বজাতি উগ্রবাদীদের দ্বারা হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়। অথচ এই ইউপিডিএফ বা আঞ্চলিক দলগুলো স্বজাতির নারীদের এই প্রকাশ্য লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মৌনব্রত পালন করেছিল।
কাপ্তাইয়ের সাজানো গুজব: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রি. রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নে মিতিঙ্গাছড়ি সেনা ক্যাম্পের বিরুদ্ধে এক উপজাতি কিশোরীকে গণধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ তুলেছিল জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) এবং ইউপিডিএফ। জেএসএস-এর নিউজ পোর্টাল Hillvoice -এ প্রচার করা হয় যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রি. সকাল ৯টায় সাদা পোশাকধারী ৬ সেনা সদস্য এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে গণধর্ষণ করেছে। অথচ পরবর্তীতে ভুক্তভোগী কিশোরী নিজেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবানবন্দি দেয় যে, সে ধর্ষণের শিকার হওয়া তো দূরের কথা, সিভিল পোশাকে একজন লোক শুধু তার বাবার খোঁজ নিয়েছিল এবং ঘরের ভেতর তখন তার বন্ধুরাও উপস্থিত ছিল।
বিলাইছড়ির মিথ্যাচার জানুয়ারি ২০১৭ খ্রি. রাঙামাটির বিলাইছড়িতে দুই মারমা বোনকে সেনাবাহিনীর টহলে থাকা আনসার সদস্য কর্তৃক ধর্ষণের বানোয়াট অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মহলে জলঘোলা করার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েন। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড প্রমাণ করে যে পুরো ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো নাটক, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাহাড় থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করানো।
তথাকথিত সুশীল সমাজের দ্বিমুখী নীতি:
চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায় কিংবা তার মায়ানমার বংশোদ্ভূত স্ত্রী ইয়েন ইয়েন যখনই কোনো বাঙালির বিরুদ্ধে ক্ষুদ্রতম অভিযোগ পান, তখনই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও জাতিসংঘে কান্নাকাটি শুরু করেন। অথচ রোয়াংছড়ির ঘটনায় স্থানীয় সেনা ক্যাম্পের মেজরের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে মিথ্যা নালিশ করা সন্তু গ্রুপের প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমারা রুমা ও গুইমারায় স্বজাতি কর্তৃক শিশু গণধর্ষণ ও তরুণী নির্যাতনের ঘটনায় সম্পূর্ণ নির্বাক। তাদের এই ‘সিলেক্টিভ হিউম্যান রাইটস’ বা সুবিধাবাদী মানবাধিকার নীতি পাহাড়ের সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে এক স্থায়ী বৈরিতার প্রাচীর গড়ে তুলছে, যা দেশের জাতীয় সংহতির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ:
অপরাধের কোনো জাত-পাত বা ধর্ম থাকতে পারে না। ধর্ষকের একমাত্র পরিচয় সে একজন ধর্ম, সমাজবিরোধী ও ঘৃণ্য অপরাধী। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হলো এই প্রোপাগান্ডা এবং অপরাধের সাম্প্রদায়িকীকরণের সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটানো। পাহাড়ে যেকোনো ধর্ষণের ঘটনায় প্রথাগত সালিশি নামক প্রহসন বন্ধ করে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। পুলিশ ও বিচার বিভাগকে সব ধরনের regional ও রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মেডিকেল ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যারা নারীর সম্মানকে রাজনীতির পণ্য বানায় এবং মিথ্যা অভিযোগে নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে পাহাড়কে অশান্ত করতে চায়, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি। আমরা পাহাড়ে রক্তের হোলিখেলা কিংবা কোনো নিরীহ মানুষের লজ্জিত মুখ দেখতে চাই না; আমরা চাই সত্যের জয় এবং পাহাড় ও সমতলের সুদৃঢ় সহাবস্থান।
উৎসঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত। ( ১৯ জুন ২০২৬ )
















