ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় টেকনাফ পাহাড়ি অপহরণকারী চক্র


পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কক্সবাজারের টেকনাফে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সশস্ত্র অপহরণকারী চক্র। গভীর রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা এবং মুক্তিপণ দাবির ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়সংলগ্ন বসতিগুলোতে নারী ও শিশুদের মধ্যে চরম ভীতি কাজ করছে।
একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কক্সবাজারের টেকনাফে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা জনপদগুলোর মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল শনিবার ভোররাতে বাহারছড়ার নোয়াখালী এলাকা থেকে হোছেন আলী (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করেছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা।
গতকাল দুপুরে নোয়াখালী পাহাড়িপাড়ার একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপহৃত হোছেন আলীর স্ত্রী রুজিনা বেগম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে এ প্রতিনিধিকে বলেন, “গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল। এত রাতে কারা এসেছে জানতে চাইলে বাইরে থেকে বলা হয়– ‘আমরা শামলাপুর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে এসেছি, দরজা খোলেন।’ পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় ভয় পেয়ে দরজা খুলে দিই। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রধারী ছয়জন ঘরে ঢুকে আমার স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যায়।”
রুজিনা বেগম বলেন, ‘আমি চিৎকার করতে চাইলে একজন আমার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ভয় দেখায়। পরে তিনজন মিলে আমার স্বামীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমি দৌড়ে সামনে গিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর আমার স্বামীকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যায়।’ ঘরে একমুঠ চালও নেই জানিয়ে অসহায় এই নারী বলেন, ‘আমার অসুস্থ স্বামীকে কেন ধরে নিয়ে গেল, তা বুঝতে পারছি না।’
নোয়াখালী এলাকার বাসিন্দা শাকের আহমদ (৭০) বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বিদেশফেরত কিংবা প্রবাসী পরিবারের লোকজনকে টার্গেট করছে অপহরণকারীরা।’
একই এলাকার মুদি দোকানি আবদুল নবী (৭০) বলেন, ‘রাতে দরজায় সামান্য শব্দ হলেই মানুষ ভয়ে কেঁপে ওঠে। এ অবস্থায় ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর কথা ভাবছি। অন্তত নিরাপদে থাকুক।’
তিন দিন আগে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরা ওমর ফারুক বলেন, ‘এসে দেখলাম পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রবাসীদের টার্গেট করায় সারাক্ষণ ভয় কাজ করছে। আবার দ্রুত বিদেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছি।’
তিন বছরে অপহৃত ২৯৫ জন বাহারছড়া এলাকায় অপরাধের গ্রাফ এখন ঊর্ধ্বমুখী। গত ৩ মে নোয়াখালীপাড়া ব্রিজ এলাকায় অপহরণের চেষ্টাকালে শহীদ উল্লাহ (১৯) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া এপ্রিল মাসে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সুমাইয়া নামে এক তরুণী নিহত হন। এ ছাড়া বস্তাবন্দি এক অজ্ঞাত মরদেহের টুকরা এবং পাহাড় থেকে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
জনপ্রতিনিধিদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ একটি সংঘবদ্ধ অপরাধে পরিণত হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে
টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৯৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই ৯৫টি ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন অপহৃত হন, যাদের মধ্যে ৮৬ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন।
স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বলেন, পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসী ও অপহরণকারী চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর অভিযান ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, সাম্প্রতিক অপহরণের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধীদের প্রধান আশ্রয়স্থল পাহাড়ি এলাকাগুলোয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অপহৃত হোসেন আলীকে উদ্ধারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। তবে শুধু পুলিশের একার পক্ষে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। অপহরণ, মাদক ও মানব পাচার রোধে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন ও সহযোগিতাপরায়ণ হতে হবে।















