টেকনাফে অপহরণ ও পাচার আতঙ্ক, চরম উৎকণ্ঠায় মানুষ

fec-image

টেকনাফ কক্সবাজারের টেকনাফ এখন এক আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেরা ও হ্নীলা ইউনিয়নের রোহিঙ্গা ক্যাম্প গ্রামগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই জনশূন্য হয়ে পড়ছে রাস্তাঘাট, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট।

অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, খুন এবং সাগরপথে মানব পাচারের এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট পুরো এলাকাকে জিম্মি করে ফেলেছে, যার ফলে পাহাড়ি, উপকূলীয় অঞ্চল ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার প্রায় ৩৫-৪০ হাজার মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। শুধু যে স্থানীয় বাংলাদেশীরা আতঙ্কে তাই নই; সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝেও এই আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বিশেষ করে ​স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক মুসল্লি ফজর ও এশার নামাজ জামাতে পড়তে মসজিদে যাওয়ার সাহস না পেয়ে বাড়িতেই নামাজ আদায় করছেন। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে অভিভাবকরা থাকছেন চরম উৎকঠায়, যতক্ষণ না তারা নিরাপদে ঘরে ফিরছে। বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতা জালাল আহমদ বলেন, অনেকেরই চোখেমুখে এখন ভয়ের ছাপ।

তারা বলছেন, সন্ধ্যা নামলে অনেকের সন্তানদের বাইরে যেতে দেওয়া এখন বড় ঝুঁকির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে অপহরণের ঘটনা।

​গত ২২ এপ্রিল শিলখালী এলাকায় ট্রিপল মার্ডারের পর নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান চললেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য দমানো সম্ভব হয়নি। অভিযানের ঠিক পরদিন ২৩ এপ্রিল নোয়াখালী পাড়া থেকে সিরাজ নামের এক শ্রমিককে সন্ত্রাসীরা জোরপূর্বক পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এলাকাবাসীর সাহসিকতা ও প্রতিরোধের কারণে সে যাত্রা তিনি রক্ষা পেলেও জনমনে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। সন্ত্রাসীরা এখন সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে হয় মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করছে, আর না হয় তাদের আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের হাতে বিক্রি করে দিচ্ছে। একজনকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিতে পারলে ২০-২৫ হাজার টাকা পেয়ে যে কেউ। ফলে অনেকে লোভের বশির্ভূত হয়ে এ কাজে নেমে পড়েছে।

পাহাড়ে গড়ে তুলেছে যতসব অপরাধের আস্তানা।
​পাহাড়ের গহীন অরণ্যে গড়ে ওঠা অপরাধীদের গোপন আস্তানাগুলো যেন এক একটি জ্যান্ত নরক। সেখান থেকে পালিয়ে আসা একজন হচ্ছে দমদমিয়া এালাকার বাদল নামের এক তরুণ তার লোমহর্ষক বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে সে স্বেচ্ছায় সাগর পথে মালয়েশিয়া যেতে আরো ৪-৫ জন তরুণ বন্ধুদের সাথে এক দালালের সাথে কথা বলে টেকনাফ পৌরসভার বাস স্টেশনে যান। সেখানে অপর এক দালালের মাধ্যমে টমটম গাড়ি যোগে বাহারছড়ার একটি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছতেই তাদের চোখ কাপড় দিয়ে এবং হাত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এ অবস্থায় আরো ৫-৭ জন লোক অস্ত্র ঠেকিয়ে গভীর পাহাড়ের একটি আস্তানায় নিয়ে গিয়ে চোখের কাপড় খুলে দেয়। এ অবস্থায় তারা ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সেখানে অন্ধকার আস্তানায় আরো অনেক মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এক পর্যায়ে প্রশ্রাবের কথা বলে পাহাড়ের খাদ থেকে লাফ দিয়ে সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে, তার অপর ৩ বন্ধু ইতিমধ্যে সাগর পথে মালয়েশিয়া পৌঁছে গেছে।

সে আরো জানায়, অসংখ্য মানুষকে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন চালায়। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচার করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় ৯ জন উদ্ধার এবং বহু নিখোঁজের ঘটনা এই পাচার চক্রের ভয়াবহতাকেই আবারও সামনে এনেছে।

​আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল দিয়ে পাচারকালে অন্তত তিন হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে ১১৭টি মামলায় এক হাজার ১০৭ জনকে আসামি করা হলেও অপরাধের মাত্রা কমেনি। গত এক বছরেই বাহারছড়া, জাহাজপুরা ও হ্নীলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।

বিশেষ করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাত্র তিন দিনেই ৩০ জনকে তুলে নেওয়ার ঘটনা পুরো এলাকায় শোরগোল ফেলে দিয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয়রা কেবল সাময়িক অভিযান নয়, বরং পাহাড়ি অঞ্চলে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: টেকনাফ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন