কক্সবাজারে ইউপি ও পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনা বাড়ছে
ওমর ফারুক হিরু:
কক্সবাজারে ইউপি ও পৌর নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, সহিংসতার মাত্রা ততই বাড়ছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকা গুলোতে। নির্বাচনী প্রচারকালে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে গোলাগুলি, সংঘর্ষ, ভাংচুরের ঘটনা। এসব ঘটনায় এখনো কেউ নিহত না হলেও আহতের সংখ্যা শতকের কাছাকাছি। তবে যে কোন সময় বড় ধরণের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভোটাররা। অপরদিকে একাধিক প্রার্থীর অভিযোগ নির্বাচনীয় এলাকা গুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ অবস্থায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েনের দাবি তাদের।
দ্বিতীয় ধাপে মহেশখালী ও চকরিয়া পৌরসভা (২০ মার্চ) ও টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার ১৯ ইউপিতে (২২ মার্চ) এবং পেকুয়া উপজেলার ৭ ইউপি’র (২৬ মার্চ) নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনীয় সহিংসতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
গত ১৪ মার্চ রাতে চকরিয়ায় পৌরসভায় ধানের শীষের সমর্থিত প্রার্থীর সভায় অতর্কিত হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এঘটনায় বিএনপির মনোনিত প্রার্থী নুরুল ইসলাম হায়দার ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এনামুল হকসহ অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। মেয়র প্রার্থীসহ আহতদের অনেকেই বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম. মোবারক আলী ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, সোমবার সন্ধ্যা ৭ টার দিকে গ্রামীণ সেন্টারের সামনে ধানের শীষের প্রার্থীর পথসভা চলছিল। ঠিক ওই সময় আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থীর সমর্থক ও দুর্বৃত্তরা অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় দুর্বৃত্তরা বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে।
চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খান বলেন, কোন ধরণের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। সামান্য ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। সহিংস ঘটনা এড়াতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তিনি।
টেকনাফ উপজেলায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকায় হামলার শিকার হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইউনুছ বাঙ্গালী। ১১ মার্চ রাত ১০ টার দিকে ওই এলাকার ডা. জামালের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে আসার সময় এ হামলার শিকার হন তিনি। একই ঘটনায় আরো ৫ জন আহত হয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর তিন পুত্রের বিরুদ্ধে এ হামলার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ইউনুছ বাঙ্গালী।
অন্যদিকে গত ১২ মার্চ শনিবার ওই ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের নয়া পাড়া এলাকার ইউপি সদস্য প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর নির্বাচনী মাইকিং চলাকালে রাত ৮ টার দিকে হামলা করে আহত করা হয় আব্দুল নবীর পুত্র জাহেদ উল্লাহকে (১৬)। প্রতিপক্ষ প্রার্থী মোহাম্মদ হাসান আব্দুল্লাহর লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ মোহাম্মদ আলীর। একইভাবে ১৩ মার্চ রবিবার দুপুরে গুরুত্বর হামলার শিকার হন ৬ ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী দিদারুল ইসলাম জিন্নাহ। নির্বাচনীয় পোস্টার লাগানোর কাজ পরিদর্শন করার সময় প্রতিপক্ষ প্রার্থী ইয়াবা ‘গড ফাদার’ জামালের নির্দেশে তার অনুসারীরা এঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করছে সে।
এভাবেই পর পর তিন দিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনা ঘটেছে টেকনাফে। এ কারণে নির্বাচনীয় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এছাড়াও সাবরাং, সদর ও বাহারছড়া ইউনিয়নে যে কোন সময় বড় ধরণের সহিংস ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান ভোটাররা। কারণ সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নে আ.লীগের দলীয় প্রার্থীর চেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী শক্তিশালী।
টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল মজিদ জানান, আ.লীগ নেতা ইউনুছ বাঙ্গালীসহ ইউপি সদস্য প্রার্থীর উপর হামলার ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এসব ঘটনায় কোন পক্ষই এখনো অভিযোগ করেনি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তাপ ছড়ানো হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় অতিরিক্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালীতে ইউনিয়নে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী এনায়েত উল্লাহ বাবুল ও সরকার দলীয় প্রার্থী শরীফ বাদশার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সোমবার রাতে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে ২০ জন আহত হন। গুলিবিদ্ধ ৯ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীই আ.লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। এ ঘটনায় পুলিশ ১১ জনকে আটক করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে সংঘর্ষের কারণে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেখানে।
মহেশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম বারের মত দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় মহেশখালীতে পৌর ও ইউপি নির্বাচনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই আ.লীগ দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে মহেশখালী পৌরসভা, মাতারবাড়ি, কুতুবজোম, কালারমারছড়া ও বড় মহেশখালী ইউনিয়নে।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ বাবুল চন্দ্র বণিক জানান, বড় মহেশখালীর ঘটনায় এখনো কোন পক্ষই মামলা করেনি। তবে এলাকাটিকে নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে কোন সহিংস ঘটনা না ঘটে সে জন্য প্রতিটি নির্বাচনীয় এলাকায় ভ্রাম্যমাণ টিম, অস্থায়ী ক্যাম্পসহ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নের সোমবার রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে সিনিয়র (ফাজিল) মাদ্রাসার মাঠে আ.লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী জি.এম কাশেম এর প্রথম পথসভায় ককটেল বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জি.এম কাশেম অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতা (স্বতন্ত্র প্রার্থী) এইচ এম বদিউল আলমের নির্দেশে এলাকার চিহ্নিত জামায়াত-শিবিরের নেতারা এ হামলা চালিয়েছে। একইদিন রাত ১০ টার দিকে মগনামা ইউনিয়নে আ.লীগের প্রার্থী খাইরুল এনামের বসত বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আ.লীগ প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী শরাফাত উল্লাহ, মগনামা ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক হারুনুর রশীদ, এনায়েত উল্লাহ ও সুলতান আহমেদ বাদশার নেতৃত্বে শতাধিক বিএনপি নেতা-কর্মী দেশিয় অস্ত্র নিয়ে বসত ঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর এবং লুটপাট চালায়। পরে পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। তবে তাৎক্ষণিক উভয় ঘটনা পরিদর্শন করেছে পেকুয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসি।
স্থানীয় ভোটাররা জানান, পেকুয়ার অধিকাংশ ইউনিয়নেই নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এরমধ্যে রাজাখালী, বারবাকিয়া, মগনামা, সদর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ইউনিয়নে যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা তাদের।
কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নে সোমবার বিকেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাকের উল্লাহর (মটরসাইকেল) প্রচারকর্মী শাহাদাত হোছাইন ও কফিল উদ্দিনকে মারধরের অভিযোগ করেছে আ.লীগ প্রার্থী এ্যাড. ফরিদুল ইসলামের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শাকের উল্লাহর পুত্র তানভির মাহমুদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
কুতুবদিয়া উপজেলার সচেতন ভোটাররা জানান, প্রচারণার শুরুতেই প্রতিটি নির্বাচনীয় এলাকা উত্তাপ ছড়াচ্ছে প্রার্থীর সমর্থকরা। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। একারণে কুতুবদিয়া উপজেলার প্রায় ইউনিয়নই ঝুঁকিপূর্ণ। এরমধ্যে বড়ঘোপ ও আলী আকবর ডেইলে ইউনিয়নে বেশি ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এ ইউনিয়ন গুলোতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে। তাই প্রতিটি ইউনিয়নে আগে থেকেই অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান ভোটাররা।


















