বাণিজ্য চুক্তি যেন পরাধীনতার চুক্তি না হয়


আজ বেশ কটি পত্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য বানিজ্য চুক্তির খসড়া নিয়ে লেখা বেরিয়েছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে জনাব ট্রাম্প মার্কিন-কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পতন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কোন রকম রাখঢাক না করেই তিনি সরাসরি কট্টরপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। অলিখিতভাবে হলেও অনেকটা জর্জ ডব্লিউ বুশ এর মতোই তিনি যেন বিশ্বকে বলছেন, “You are with us or you are against us”.
পত্রিকা সূত্রে যেটুকু জেনেছি, চুক্তির খসড়ায় বেশ কিছু অপমানজনক এবং সার্বভৌমত্ব-পরিপন্থী ক্লজ আছে যা অনেকটা ‘নাকে খত দেয়ার’ সমার্থক। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোকে কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। যেমন:
১। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে বাংলাদেশকেও সেটা অনুসরণ করতে হবে।
২। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোন দেশের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, তবে বাংলাদেশকেও সেই দেশটির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে হবে।
৩। একটি বিশেষ দেশের সাথে বাংলাদেশ কোন প্রতিরক্ষা বা সমরাস্ত্রবিষয়ক ইস্যুতে জড়াতে পারবে না। (বলাই বাহুল্য, দেশটি চলমান বানিজ্য যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ গণচীন)।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পৃথক একটি মেসেজে জনাব ট্রাম্প BRICS জোটের নীতি সমর্থনকারী দেশগুলোর উপর অতিরিক্ত আরও দশ পার্সেন্ট শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে খসড়া চুক্তির ক্লজ অনুযায়ী বাংলাদেশকেও সেই দেশগুলোর উপর অতিরিক্ত দশ পার্সেন্ট শুল্ক আরোপ করতে হবে।
বর্তমানে BRICS ভূক্ত দেশগুলো হচ্ছে গণচীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদিআরব, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, ইন্ডিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। কাজেই মার্কিনীদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে এই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বানিজ্য-সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটবে।
ব্যাপারটা এমন, মার্কিন প্রস্তাবে রাজি হলে শুধুমাত্র মার্কিন ব্লকের দেশগুলো ছাড়া পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধেই বানিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে আমাদের। বাংলাদেশ কি এতো বড় ঝুকি নেবে? মার্কিনীদের উপর কি এতোটা আস্থা রাখা যায়? সব ছেড়েছুড়ে আমরা যে মার্কিনীদের হাত ধরবো, দু’দিন পর ওরা হাতটা ছেড়ে দেবে না তো?
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বৈরীতার মুখে মার্কিনীরা আমাদের কতোটুকু অর্থনৈতিক বা সামরিক নিরাপত্তা দেবে? মিয়ানমার তথা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে গণচীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে মার্কিনীরা আমাদের কতোটুকু সহযোগিতা করার সামর্থ বা সদিচ্ছা রাখে?
এগুলো ভেবে দেখার বিষয়। মার্কিনীদের আনুকুল্য পাবার জন্য আমরা পুরো পৃথিবীকে শত্রুতে পরিনত করতে পারি না। আখেরে সেটার ফলাফল ভাল হবে না। বিশেষ করে গণচীনের সাথে সম্পর্কের অবনতি কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। মার্কিনীরা যতোই আস্ফালন করুক, অন্তত বানিজ্য যুদ্ধে গণচীনের কৌশলের কাছে বেদম মার খাচ্ছে ওরা। এই অঞ্চলে গণচীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
বলাই বাহুল্য, কঠিন একটা সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রচন্ড চাপের মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সবচে’ উদ্বেগের বিষয়টি হলো, চুক্তির খসড়ায় ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ সন্নিবেশিত হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তির বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না। এটা অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। জনগনকে অন্ধকারে রেখে এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
পরিশেষে বলবো, এই অনাকাঙ্খিত চাপটি নিজের কাঁধে না রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসা। কারন, দিনশেষে রাজনৈতিক সরকারকেই এই অস্বাভাবিক চুক্তির মাশুল গুনতে হবে। এমন একটি নতজানু চুক্তির বোঝা নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিল জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
৮ জুলাই ২০২৫

















