চকরিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে লক্ষাধিক মানুষের পারাপারে দুর্ভোগ

চকরিয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের চকরিয়ায় উপকূলীয় কোনাখালী ও ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের ১৩ গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ভাঙা সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করছে এসব এলাকার লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী। এসব গ্রামের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যাতায়ত চরম ভোগান্তিতে পৌঁছেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বুড়া মাতামুহুরীর উপ শাখা নদী মধ্যম কোনাখালী দারুল ইরফান মাদ্রাসা সংলগ্ন ঢেমুশিয়া খালের উপর নির্মিত ঢেমুশিয়া-কোনাখালী সংযোগ সেতুটি (লাল ব্রীজ) নামে পরিচিত সেতুটি  দীর্ঘ প্রায় একযুগের অধিক সময় ধরে চলাচল অনুপযোগী ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে উপজেলার দুই ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে নদীর দুই পাড়ের মানুষের মাঝে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের চকরিয়া ও পেকুয়া সদরে যাতায়াতসহ আরও নিত্য প্রয়োজন মেটাতে এসব ইউনিয়নের অন্তত লক্ষাধিক মানুষ একটি সেতুর অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের  কোনাখালী ও ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের দাবি, নতুন করে সংযোগস্থলের ঝুঁকিপূর্ণ লাল ব্রিজটি পুনরায় নির্মাণের।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, মাতামুহুরী নদীর শাখা নদী ঢেমুশিয়া ভরামুহুরী খালটি এক সময় খরস্রোতা নদী হিসেবে পরিচিত ছিল। কালের বিবর্তনে দেশ পরিবর্তনের ছোয়ায় পরিবর্তন হয় এ গ্রামীণ জনপদের মেঠোপথ। এককালে এখানকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা নৌকা দিয়ে পারা পারই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। ছিল না এলাকার মানুষের তেমন কোনো যোগাযোগের রাস্তা-ঘাট ব্যবস্থা। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও কালের পরিক্রমায় দুই ইউনিয়নের মানুষের যাতায়তের ভোগান্তি দেখে বিগত ১৯৯১ সনের ভয়াবহ প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের পরে বেসরকারি এনজিও সংস্থা কারিতাসের অর্থায়নে ওই ব্রিজটি নির্মিত হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, লাল ব্রিজটি নির্মিত হওয়ার পর কয়েক বছর যেতে না যেতেই ওই ব্রিজের কাঠের পাতাটন, পিলারগুলোতে মরিচা এসে নষ্ট এবং অকেজো হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ব্রিজটির উপরের এঙ্গেল সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ায় এসব গ্রামের কয়েকশত শিক্ষার্থী ও পথচারীরা দূর্ঘটনার শিকার হয়ে আসছে। গেল বর্ষা মৌসুমে সেতুর উত্তর পাশের অংশ দেবে পাতাটন উঠে যাওয়ার কারণে মারাত্মকভাবে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত করতে ভোগান্তির যেন অন্ত নেই। শুধু একটি সেতুর অভাবে দুর্ভোগে পড়েছেন ১৩ গ্রামের অন্তত লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী।

জানাগেছে, উপজেলার মধ্যম কোনাখালী-ঢেমুশিয়াস্থ ভরামুহুরী খালের উপর নির্মিত লাল ব্রিজ দিয়ে নিয়মিত ১৩ গ্রামের মানুষসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী যাতায়াত করে। এ ব্রিজের দক্ষিণে ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন। ওই ইউনিয়নের ছয় গ্রামের বাসিন্দারা সেতুর উত্তর পাশে অবস্থিত কোনাখালী ইউনিয়নে তাদের কৃষিজমিতে চাষাবাদ ও এলাকার একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল ইরফান মাদ্রাসা, এতিমখানা, নুরানী ও হেফজখানা, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া হাজারো শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে সেতুর উপর দিয়ে পারাপার করে আসতে হয়। ব্রিজটি ব্যবহার করে থাকেন, মোছার পাড়া, জমিদার পাড়া, নোয়াপাড়া, বাজারপাড়া, আম্মারডেরা ও হেতালিয়া পাড়া। এদিকে কোনাখালী ইউনিয়নের মৌলভী পাড়া, উত্তর পাড়া, কিল্লাপাড়া, খাতুর বাপের পাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া, সিকদার পাড়া ও চড়াপাড়ার লোকজন প্রতিদিন সেতু পারাপার করে ঢেমুশিয়া হয়ে ইলিশিয়া, বদরখালী বাজার এবং চকরিয়া পৌরশহর ও উপজেলা সদরে যাতায়ত করেন। এ নদীর উপরে নির্মিত পুরাতন জরাজীর্ণ ব্রিজটি একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হলেই চিত্র পাল্টে দিতে পারে দুই ইউনিয়নের মানুষের জীবন যাত্রার মান, খুলে যাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার।

কোনাখালী দারুল ইরফান মাদ্রসার পরিচালক হাফেজ মৌলানা নুরুল কাদের বলেন, এ ব্রিজটি অতি পুরাতন। দীর্ঘ একযুগের অধিক সময় ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে বর্তমানে সেতু দিয়ে যাতায়াত করা বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা এ ভাঙা সেতু দিয়ে পারাপার করে আসছে সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসলে সেতু দিয়ে যাতাোত করা বড় দুস্কর হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের যাতায়াত চিন্তা করে নিজ অর্থায়নে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কয়েকবার মেরামত করলেও তা বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জনগণ ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন ওই সেতু দিয়ে চলাচল করছেন।

ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম জিকু বলেন, ঢেমুশিয়া এলাকার সিংহভাগ মানুষের জায়গা জমি রয়েছে কোনাখালী ইউনিয়নের মধ্যে। এই এলাকাটি হচ্ছে কৃষি নির্ভরশীল। এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে কৃষি চাষ। গ্রামের উৎপাদিত ফসল ও কৃষিপণ্য শাক-সবজি বিক্রি করতে নিয়ে যেতে সেতুর অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ঢেমুশিয়ার ৬-৭ গ্রামের লোকজন শুধুমাত্র একটি সেতুর অভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য অন্যত্র নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে নদীর ওপর একটি আরসিসি সেতু নির্মাণের।

এ ব্যাপারে কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার বলেন, কোনাখালী ও ঢেমুশিয়া এ দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের সংযোগ স্থল হলো লালব্রিজ সেতু। গ্রামীণ জনপদের কৃষি ভিত্তিক এ অঞ্চলের কৃষকেরা সারা বছর ধরে নানা জাতের ফসল উৎপন্ন করে আসলেও শুধুমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে এলাকার হাজারো কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল অন্য এলাকায় নিতে পারছে না। ফলে স্বল্প মূল্যে ক্ষেতের ফসল জমি থেকে বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষক। ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল ইরফান মাদ্রাসাসহ চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দুইটি ইউনিয়নের হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও কোমলমতি শিশুসহ সাধারণ জনসাধারণ নিয়মিত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সেতুটি নতুন করে পুনরায় নির্মাণের জন্য স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) লিখিতভাবে আবেদন দেওয়া পরও সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারে আজও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × two =

আরও পড়ুন