উখিয়ায় ঝাউবাগান ভাঙছে: সবুজবেষ্টনী অরক্ষিত হয়ে পড়েছে

fec-image

কক্সবাজারেরর উখিয়া উপকূলের সবুজবেষ্টনী অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। একদিকে স্থানীয় কাঠচোরদের অব্যাহত তাণ্ডব অন্যদিকে সাগর থেকে ধেয়ে আসা প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় একের পর এক ভাঙছে ঝাউগাছ। সতর্ক সংকেত অব্যাহত থাকায় মেঘমালার বিরূপ প্রভাবে উত্তাল সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে সপ্তাহকাল ধরে আঘাত হানছে উপকূলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জানমালরক্ষায় সৃজিত ঝাউবাগান উজাড় হয়ে যাবার ফলে অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় জনজীবন বিপন্নের আশংকা করছেন পরিবেশবাদীরা।

সূত্রমতে, ১৯৯১ সনের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে তৎকালীন জেলা প্রশাসন উপকূলীয় এলাকায় ঝাউবাগান সৃজন করার উদ্যোগ নিয়ে তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করে।

সরেজমিন উখিয়া উপকূলের রেজুখালের মোহনা থেকে মনখালী এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের তোড়ে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাসমূহের ঝাউগাছ উপড়ে যায়। বনকর্মীরা পড়ে যাওয়া কিছু কিছুু গাছ উদ্ধার করতে সম্ভব হলেও অধিকাংশ গাছ স্থানীয়রা রাতের আঁধারে লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক ইউপি সদস্য জাহেদুল আলম জানান, প্রতিরাতে ৭/৮টি বড় বড় ঝাউগাছ কর্তন করা হলেও বনকর্মীরা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। স্থানীয় সংবাদকর্মী জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঝাউবাগান দখল করে বসবাসরত অবৈধ রোহিঙ্গা নাগরিক ও স্থানীয় যেসব পরিবার ঝাউবাগানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, তাদের মধ্যে ঝাউগাছ কর্তন ও পাচার করার প্রবণতা প্রবল।

একাধিক লোকজন জানান, পানের বরজ, বাড়িঘর নির্মাণকাজে এসব ঝাউগাছ ব্যবহার ও বাজারজাত করা হলেও বনকর্মীরা তা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। যে-কারণে রেজুখালের মোহনা থেকে মনখালী পর্যন্ত উপকূল এখন ঝাউগাছশূন্য হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি উপকূলের সোনারপাড়া থেকে মনখালী পর্যন্ত ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে সাগর উত্তাল হয়েছে। এমতাবস্থায় সতর্ক সংকেত বলবৎ রয়েছে। জোয়ারের প্রচণ্ড ধাক্কায় প্রায় ২ শতাধিক ঝাউগাছ এখানে পড়ে গেছে। পড়ে যাওয়া এসব গাছ সংগ্রহের জন্য স্থানীয় বনবিভাগের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

জানতে চাওয়া হলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম জানান, গত ৭/৮ দিনে ইনানী থেকে চোয়াংখালী পর্যন্ত উপকূলের ঝাউবাগানের প্রায় শতাধিক ঝাউগাছ পড়ে গেছে। এসব ঝাউগাছ কর্তন করে আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিলামে বিক্রি করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, রাতের আঁধারে বেশ কিছু গাছ স্থানীয়রা লুটপাট করে নিয়ে গেছে।

জালিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী জানান, উপকূলে সৃজিত ঝাউবাগান প্রকল্প পর্যটন পরিবেশকে আকর্ষণীয় করেছে। এসব ঝাউবাগান উপকূলে বসবাসরত মানুষের জীবনমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তাই এ ঝাউবাগানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত ৭/৮ দিনে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে ২ শতাধিক ঝাউগাছ পড়ে গেছে।

উখিয়া উপজেলা নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধুরী জানান, উপকূলের পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত। তিনি বলেন, যারা বনরক্ষায় নিয়োজিত তারাই বনধ্বংস করছে। সুতরাং ঝাউগাছ নিধন হলে উপকূলের যে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে তার জন্য বনবিভাগকে দায়ভার নিতে হবে।
ইনানী বনরক্ষা সহায়ক কমিটির সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উপকূলে পর্যটন পরিবেশরক্ষার ব্যাপারে মাসিক সভায় বহুমুখী সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

তিনি বলেন, উপকূলের সবুজবেষ্টনীখ্যাত ঝাউবাগান প্রকল্প স্থানীয় মানুষের জানমাল রক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা রাখলেও এসব ঝাউবাগান রক্ষার ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। এভাবে ঝাউগাছ ভাঙতে থাকলে উপকূলীয় জনজীবন বিপন্ন হবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − nine =

আরও পড়ুন