উপজাতীয়দের করের আওতায় আনার প্রস্তাব সংসদে বাতিল করার অনুরোধ দীপেন দেওয়ানের

fec-image

উপজাতীয়দের বাস্তব অবস্থা বিচার করে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের করের আওতায় আনার প্রস্তাব সংসদে বাতিল করার অনুরোধ জানান রাঙামাটি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।

বৃহস্পতিবার ( ১৮ জুন ) জাতীয় সংসদে জনকল্যাণমুখী বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই অনুরোধ জানান।

সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, আমি দেশের বৃহত্তম নির্বাচনী এলাকা রাঙ্গামাটি ২৯৯ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে এই মহান সংসদে দাঁড়িয়েছি। আমার পাহাড়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে অবহেলিত এবং প্রান্তিক জীবনযাপন করে আসছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য অঞ্চলেও যেন সুসম উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে লক্ষ্য করছি যে, এই প্রস্তাবিত বাজেটে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম এলাকার উন্নয়নের জন্য গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

দীপেন দেওয়ান বলেন, এই বাজেট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি দূরদর্শী রূপরেখা। দেশের যুব উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার পেছনে যে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে, সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। যুব সমাজকে প্রশিক্ষিত করে তোলা এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধার যে প্রতিফলন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, এবারের অর্থ আইনে চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের আয়কর সুবিধার বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মাননীয় স্পিকার, আপনি অবগত আছেন বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী সরকার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রকে কর অব্যাহতি বা প্রদানের সুবিধা প্রদান করে থাকে। সে অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ভূত আয়ের ওপর কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়ে আসছে। এবারের অর্থ আইনে, আয়কর আইন ২০২৩ এবং তফসিলের অংশ এবং অনুচ্ছেদের ১৯ সংশোধন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উপজাতীয়দের পার্বত্য অঞ্চলে অর্জিত বেতন খাতের আয় এবং আবাসিক সম্পদ ও পরিসম্পদ হতে অর্জিত আয়কে করযোগ্য করা হয়েছে।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, যে কারণে কর অব্যাহতির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে, সে কারণ দূরীভূত হলে সুবিধা বাতিল করা উচিত। তবে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবগত। আমি সহমত যে, এই সুবিধা এখনো বাতিল করা সম্ভব নয়, বাতিল করার মতো বাস্তবতা তৈরি হয়নি।

বক্তব্যে দীপেন দেওয়ান স্পিকারের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনার সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উপজাতীয়দের মধ্যে সিংহভাগের আয়ের উৎস হচ্ছে জুম চাষ এবং কৃষি। সমতলের ন্যায় ধানি জমি বা কৃষি জমি পার্বত্য অঞ্চলে নেই বললেই চলে। উল্লেখ্য যে, পার্বত্য অঞ্চলের ধানি জমির প্রায় ৭০ শতাংশ কাপ্তাই বাঁধের কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে, যার শিকার হয়েছিলেন উপজাতীয় সম্প্রদায়। উপজাতীয়দের অন্যান্য পেশার মধ্যে নগণ্য পরিমাণ দোকানদার এবং হাজারো প্রজেক্ট, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পেশায় ও চাকরিতে রয়েছেন।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এবং এখনও পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের প্রায় ৭০% মানুষের খাওয়ার পানির উৎস হচ্ছে কুয়া, পুকুর, ছড়া ও বৃষ্টির পানি। মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা হতে বঞ্চিত। এখনও ৫০ শতাংশ মানুষ স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার হতে বঞ্চিত। এখনও অনেক উপজেলায় পাকা সড়ক নাই, রেললাইন নাই, কোনো গ্যাস লাইন নাই। অর্থাৎ বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুপেয় পানি ও ল্যাট্রিন সুবিধার মতো মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়ে প্রায় ৭০% মানুষ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। উপরোক্ত তথ্য হতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, উপজাতীয়দের এই কর অব্যাহতির সুবিধাটি এখনও অব্যাহত রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যে আশা নিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে সেটার উপর যেনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনে উপজাতীয় ভোটাররা ব্যাপকভাবে বিএনপিকে সমর্থন করে জয়যুক্ত করেছেন। সারা দেশের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের অধিকসংখ্য মানুষ বিএনপি প্রার্থীকে জয়যুক্ত করেছেন। এই মুহূর্তে পার্বত্য অঞ্চলের করের প্রস্তাব সংসদে আনা হলে পার্বত্য অঞ্চলে দলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং, উপজাতীয়দের বাস্তব অবস্থা বিচার করে, দলের স্বার্থে সংসদে এই প্রস্তাব বাতিল করার জন্য আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি। 

২০২৬ সালের অর্থবছরের এই ঐতিহাসিক এবং জনকল্যাণমুখী বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি স্পিকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

সাহসিকতার সাথে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে একটি বৈষম্যহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান দীপেন দেওয়ান।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: উপজাতীয়, এমপি, দীপেন দেওয়ান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন