খাগড়াছড়িতে ভোটের হিসাবে ফ্যাক্টর এক অতিথি প্রার্থী

1419959_551458261615132_496655300_n
মো: আবুল কাসেম, খাগড়াছড়ি : বিএনপি তথা ১৮-দলীয় জোট ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না-করায় সারাদেশে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও খাগড়াছড়ি আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। সাধারণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততা না  থাকলেও এ লড়াই জমে উঠার একমাত্র কারণ হলো জাতীয় রাজনৈতিক দলের বিপরীতে আঞ্চলিক দলের স্বতন্ত্র দুইজন প্রার্থী এবং খাগড়াছড়িতে নতুন এক প্রার্থীর উপস্থিতি। নতুন এ প্রার্থীকে খাগড়াছড়ির সচেতন ভোটাররা বিবেচনা করছেন, একজন  অতিথি পার্থী হিসেবে। এ অতিথি প্রার্থীর কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে তারাও ভাবনায় পড়েছেন। তাকে ঘিরেই ভোটের হিসাব নিকাশ কষছেন অন্য প্রার্থীরা। তাই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জিতে কে হতে যাচ্ছেন এ আসনের সংসদ সদস্য তা নিয়েও ভাবনায় সাধারণ ভোটাররা।
 
জাতীয় রাজনৈতিক দল থেকে আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বিগত ১৯৮৮ সাল থেকে আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় এ নেতা দলের হালধরা নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বলে জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়। বিশেষ করে দলকে আর্থিক সহায়তা প্রদানে তার ভূমিকা ছিল মুখ্য। ২০০৬ সালে সময়ও কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা কেন্দ্র হতে মনোনয়ন পেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা শহরে বিশাল শো-ডাউন করেছিলেন। পরবর্তীতে নানা নাটকীতায় বর্তমান সংসদ সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এ আসনে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটি নানা কারণেই ধরে রাখতে পারেনি। খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তাছাড়া ২০০৮ সালে তৎকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রুইথি কার্বারীর পর পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি, এরপর থেকে তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন এ আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তিনি। বর্তমানে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থী হয়ে লড়ছেন ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে।

জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগের সমঝোতা না হওয়ায় এ আসনে সংকটে পড়েছেন আওয়ামী লীগের এই প্রার্থী। প্রার্থীতার লড়াইয়ের শুরুতেই মনোবল ভেঙ্গে পড়ে জাতীয় পার্টির সাথে সমঝোতা করতে না-পেরে এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশক্রমে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা নিয়ে। পরবর্তীতে নির্বাচনী বিধি অনুসারে প্রার্থীতা প্রত্যাহার না হওয়ায় প্রার্থীতা টিকে যাওয়ায় সমঝোতার বিপরীতে লড়াই করতে হচ্ছে এ আসনের একমাত্র বাঙালি প্রার্থী জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এরশাদের নির্দেশ অমান্যকারী সোলায়মান আলম শেঠ এর সাথে। এ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোট, সাধারণ ভোট ও বিএনপি সমর্থকরা যদি ভোটে অংশগ্রহণ করে তাহলে বাঙালি অধ্যুষিত ভোট কেন্দ্র গুলোতে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা (নৌকা) প্রতীকের বিপরীতে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে জাতীয় পার্টির সোলায়মান আলম শেঠ (লাঙ্গল) প্রতীক। এ  কারণে জেলা আওয়ামী লীগ লাঙ্গল নিয়ে কিছুটা ভাবনায় পড়েছে।

জাতীয় রাজনৈতিক দলের বিপরীতে নির্বাচনী লড়াইয়ে আরেক প্রার্থী হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ইউনাইনেট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রসীত বিকাশ খীসা। তিনি ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ গঠন করেন এবং প্রথম আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়কও হন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন এবং অদ্যাবধি একই পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর অন্যতম নামটি হলো ইউপিডিএফ। রীতিমত ইউপিডিএফ আঞ্চলিক অপর দল জেএসএস প্রতিপক্ষ হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এ দলটি পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে। ২৯৮-নং খাগড়াছড়ি আসনে ইউপিডিএফ বর্তমান আওয়ামী সরকারের কঠোর বিরোধিতা করলেও ইউপিডিএফ তাদের নেতা প্রসীত বিকাশ খীসাকে সমাজ পরিবর্তনের নিবেদিত প্রাণ আখ্যায়িত করে এ নির্বাচনে লড়াই করছে।

পার্বত্য খাগড়াছড়ি আসনে এবারে নির্বাচনে মাঠে ৪জন নির্বাচনী খেলোয়াড়ের মধ্যে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রসীত বিকাশ খীসা স্ট্রাইকারের ভূমিকা রয়েছেন বলে ভোটের হালচাল ও খাগড়াছড়ির ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইউপিডিএফ’র সাথে ফ্রন্ট লাইনে লড়াইটি নৌকার বিপরীতে হলেও শান্তিচুক্তির স্বপক্ষ হলেও জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি অংশ জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপ সমর্থিত ইঞ্জি: মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা (বই) প্রতীককে নিয়ে ভাবনায় রয়েছেন অনেকে। উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকায় প্রসীত বিকাশ খীসা (হাতি) বিপরীতে মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা (বই) প্রতীকের কিছুটা ভোট যুদ্ধ হবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ ও লাঙ্গল প্রতীকে সমানে সমানে ভোট পড়লে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে ইউপিডিএফ প্রার্থীর জন্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গ্রুপের  মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা এ লড়াইয়ে আসার একমাত্র কারণ হচ্ছে প্রতিপক্ষ দল ইউপিডিএফ প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করা। এ প্রার্থী প্রথম অবস্থায় ধীর গতিতে গণসংযোগ চালালেও বর্তমানে জোরেসোরে নির্বাচনী  গণসংযোগ করছে।

খাগড়াছড়ি আসনের রাজনৈতিক পটভূমি পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাগড়াছড়ি জেলার এ আসনে অতিথি পাখির ভূমিকায় রয়েছে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সোলায়মান আলম শেঠ।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রার্থী এখনও খাগড়াছড়ি জেলায় কয়টি উপজেলা, উপজেলা সমূহের জাতীয় পার্টি কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদে কোন কোন ব্যক্তি রয়েছেন তাদেরও নাম সঠিক ভাবে জানেন না বলে জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির একাধিক নেতাকর্মীর মুখে শোনা গেছে। তবে কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, সোলায়মান আলম শেঠ খাগড়াছড়িতে প্রার্থী হওয়ায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছে। জেলা জাতীয় পার্টি আগের চেয়েও এখন আরও বেশী সু-সংগঠিত। তিনি মূলত খাগড়াছড়ি থেকে কিছু নিতে আসেন নাই, বরং দিতেই এসেছেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়িতে টিআইবি’র উদ্যোগে খাগড়াছড়ি শহীদ কাদের সড়কস্থ অরুনিমা কমিউনিটি সেন্টারে চলতি সালে  তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলনে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো: আলাউদ্দিন নিজেকে তার বক্তব্যে এ আসনের প্রার্থী হওয়ার কথা উল্লেখ করলেও শেষমেষ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি চেয়ারপার্সন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে এ আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন সোলায়মান আলম শেঠ। ১৯৭৮ সালে তার পিতার হাত ধরে খাগড়াছড়ি জেলায় আগমন ঘটে এবং জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ভূমি ক্রয় করেন। এ কারণে মাটিরাঙ্গা উপজেলার তার কিছুটা পরিচিতি থাকলেও পুরো জেলাবাসী তাকে তেমন একটা চিনে না।
 
তার রাজনৈতিক জীবন চট্টগ্রামে গড়ে উঠলেও খাগড়াছড়ি জেলায় তেমন পরিচিতি নেই এ প্রার্থীর। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর হতে এ প্রার্থী প্রথম কিছুদিন খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে অবস্থান করে চট্টগ্রাম থেকে বেশকিছু সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী এনে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারপত্র, পোস্টারিং, মাইকিং ও গণসংযোগের সকল  দায়-দায়িত্ব চট্টগ্রাম থেকে আগত নেতাকর্মীদের প্রদান করায় খাগড়াছড়ি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি/সম্পাদকসহ একাধিক নেতাকর্মী রয়েছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। তাছাড়া তার গণসংযোগটি চলে মূলত ভাড়াটিয়া কিছু লোকদের দিয়ে। তার গণসংযোগে গাড়ির বহর বের হলে প্রতিটি গাড়িতে কতজন লোক, তাদের নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা হয়। সন্ধ্যার পর খাগড়াছড়ি জেলা জাতীয় পার্টির অফিস প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলে দেখা যায়, নাম ধরে ধরে টাকা বিতরণের দৃশ্য। প্রতিজন পাচ্ছে ২শ থেকে ২শ ৫০টাকা। এভাবেই  গণসংযোগ চালানো এ প্রার্থী যখনই চট্টগ্রাম চলে যান তখন থেকে জাতীয় পার্টির নির্বাচনী অফিসটি থাকে একেবারেই নেতাকর্মী শূন্য।

বর্তমানে জাপার এ প্রার্থী খাগড়াছড়ি কলেজ রোডস্থ খাগড়াছড়ি গেস্ট হাউসে রাত্রি যাপন করছেন। খাগড়াছড়ি জেলা সদরে তার কোন বাসাবাড়ি নেই। তাই জেলাবাসী জাপার এ প্রার্থীকে খাগড়াছড়িতে অতিথি প্রার্থী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। সচেতন ভোটাররা মনে করেন, অতিথি প্রার্থী খাগড়াছড়িতে বাসা বাঁধতে এসেছে। ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি আসনে একমাত্র বাঙালি প্রার্থী সোলায়মান আলম শেঠ বর্তমানে নির্বাচনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বাঙালি সেন্টিমেন্ট কাজে লাগানোর জন্য ইতোমধ্যে বাঙালি ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীদের সাথেও যোগাযোগ রাখছেন। এ প্রার্থীর কারণে জেলার অন্যান্য প্রার্থীরা ভোটের হিসাব নিকাশ কষতে ভাবনায় পড়েছে।  

তবে অনেকের ধারণা, খাগড়াছড়িতে যে সকল ভোটার জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করে তার অধিকাংশই এরশাদের সমর্থক। এক্ষেত্রে এরশাদের নির্দেশ অমান্যকারী এ প্রার্থী খাগড়াছড়িতে জাতীয়পার্টির নেতাকর্মীদের ভোটও পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, জনসংসহতি সমিতি এমএন লারমা গ্রুপ, জাতীয় পার্টি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − nine =

আরও পড়ুন