গুইমারায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর প্রদানে অনিয়ম, তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন

fec-image

খাগড়াছড়ির গুইমারায় সরকারি প্রকল্প কর্মকর্তার অফিসে কর্মরত উভাচিং মারমা উত্তমের বাবা নিথোয়াই মার্মাও পেয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় গৃহহীন পরিবারের ঘর। দুইটি হাইজ (মাইক্রো) গাড়ির মালিক বড়পিলাক ইদ্রিস আলীর স্ত্রী মাসুদা বেগম, গুইমারা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জুয়েল, জালিয়াপাড়ার মুনছুর সওদাগর, হাফছড়ির কালাপানির ব্যবসায়ী ইব্রাহীম, মাছ ব্যবসায়ী মোশারফ, ইউপি সদস্য আরমানের নিকটাত্মীয় বাবুল, মিনারা বেগম, গুইমারা মেম্বারপাড়ার আনোয়ারা বেগমসহ আরও অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি পেয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের এসব ঘর। এমনকি দুই কক্ষ বিশিষ্ট সরকারি ঘরকে স্বচ্ছল আনোয়ারা বেগম নিজ উদ্যোগে চার কক্ষ করেছেন। ঘরটি যে আশ্রয়ন প্রকল্পের এমন নমুনাও নেই বর্তমানে।

অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনা মডেল আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় গৃহহীন পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেওয়া ঘরগুলো অর্থের বিনিময়ে সচ্ছলদের প্রদান করা হয়েছে গুইমারায়। হাফছড়ির কালাপানি এলাকার ভূমিহীন বিধবা রিজিয়া বেগম জানান, তার স্বামী নেই। একটি ঘরের জন্য ইউপি সদস্য আরমানের কাছে অনেকবার গিয়েছিলেন তিনি। ইউপি সদস্য আরমানের দাবিকৃত ৩০ হাজার টাকা দিতে পারেননি। এজন্য তার কপালে জুটেনি সরকারি ওই ঘর। এমন অভিযোগ রয়েছে আরও অনেকের।

এদিকে ঘর বরাদ্দ পাওয়া হেডম্যানপাড়ার থুইম্রাপ্রু মারমা জানান, গরু বিক্রি করে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৫৪ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি একটি ঘর পেয়েছেন। এত টাকা দেওয়ার পরও তার ঘরটি ভালোভাবে নির্মাণ করে দেওয়া হয়নি। বৃষ্টিতে পানি পড়ে তার ঘরে।

ঘর বরাদ্দ পাওয়া চিংগুলি পাড়ার অংক্রাইউ মারমা জানান, ঘরের জন্য ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন। পরে ইট কেনার জন্য আবার এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তিনিও টাকাগুলো এনজিও থেকে ঋণ করে দিয়েছেন।

হাফছড়ি ইউপির সাবেক সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সর্ববৃহৎ মানবিক আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন জড়িয়ে রয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার দেশের ভূমিহীন দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করে তাদের জীবনধারা স্বাভাবিক ও সমুন্নত রাখার চেষ্টা করছে। সরকারের উদ্দেশ্যটি যে মহৎ-এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঘর না পেয়ে যদি স্বচ্ছলরা পায় তাহলে সেটি হল হতদরিদ্র মানুষের জন্য দুর্ভাগ্য।

দুর্যোগ সহনীয় গৃহ নির্মাণ প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প- এই তিন প্রকল্পের আওতায় সরকার সারদেশের মতো গুইমারাতেও হতদরিদ্রদের গৃহনির্মাণ করার বরাদ্দ দিয়েছে। এদিকে এসব ঘর কেবল সমাজের হতদরিদ্রদের পাওয়ার কথা থাকলেও গুইমারা উপজেলায় জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এসব ঘরে ভাগ বসিয়েছেন-এমন দাবিতে উপজেলার কালাপানি এলাকায় গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বঞ্চিত ও হতদরিদ্র লোকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘর বরাদ্দ পাওয়া লোকজনদের নিজ দখলে খাস বা দলিলের ভূমি ছিল। তবে পাকাবাড়ি ছিল না। তাদের ভূমিহীন সাজিয়ে তড়িঘড়ি করে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর দেওয়া হয়েছে। অথচ জমি নেই ঘরও নেই, এমন শত শত লোক জনপ্রতিনিধিদের কাছে বার বার ধর্ণা দেওয়ার পরও তাদের ভাগ্যে জুটেনি আশ্রয়নের ঘর।

গুইমারা ডাক্তারটিলায় বসবাস আব্দুর রহিমের। তিনি ওই ঠিকানায় ঘর বরাদ্দ নিয়ে যৌথখামার হাড়ভাঙ্গা এলাকায় বাগানে নির্মাণ করেছেন আশ্রয়নের ঘর। প্রতিবেশীরা বলেছেন, ঘরে কোন লোক বসবাস করে না-এমন বেশ কিছু ঘর রয়েছে। আবার অনেকে গরিব আত্মীয়স্বজনের নামে ঘর বরাদ্দ নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করছেন।

অপরদিকে নকশা অনুযায়ী কাজ না করে ফাউন্ডেশনসহ ইট, রড ও সিমেন্ট ব্যবহারেও বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বেশ কিছু ঘরের ফাউন্ডেশনসহ অর্ধনির্মিত দেয়ালে ফাটল ধরাসহ বৃষ্টির পানি পড়তে দেখা গেছে ।

হাফছড়ি কালাপানি এলাকার স্থানীয় সমাজসেবক ইকবাল তারাসি, আব্দুল খালেক, অসহায় কুলসুম বেগম বলেন, জনপ্রতিনিধিরা অর্থের বিনিময়ে স্বচ্ছলদের কাছে এসব ঘর দিয়েছেন। এতে প্রকৃত অস্বচ্ছল ও দরিদ্ররা বঞ্চিত হয়েছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তুষার আহমেদ বলেন, ‘নির্মিত ঘরগুলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ পরিদর্শন করেছি। এ সময় কেউ এসব বিষয়ে অভিযোগ করেননি। প্রত্যেকটি ঘর সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে।

ইউপি সদস্য আরমান হোসেন জানান, তার বিষয়ে অভিযোগগুলো একটি মিথ্যে, একটি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়য়ন্ত্র করছে।

গুইমারা সদর ইউপি চেয়ারম্যান সুইজাউ মার্মা (ভারপ্রাপ্ত) জানান, জুয়েলদের বাজারে দোকান থাকলেও তার দৃষ্টিতে জুয়েল অসহায়। তাছাড়া তার বাবা দল করে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 2 =

আরও পড়ুন