ছেলে ধর্ম পরিবর্তন করায় লাশ গ্রহণ করলেন না পিতা বিধু কুমারশীল

fec-image

সবাই বলে মৃত ব্যক্তির সাথে নাকি শত্রুতা চলে না। কিন্তু সাঈদের বেলায় ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা স্বীয় পরিবার এমনকি স্বীয় পিতার বিরুদ্ধে। সাঈদ হিন্দু ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় তার লাশ গ্রহণ করলেন না তার পিতা বিধু কুমারশীল। হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের হেতালিয়া পাড়ায়।

সাঈদ ঢাকা বিজ্ঞান কলেজের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার লাশ পিতা গ্রহণ না করায় কক্সবাজারের চকরিয়া থানা ও কমলাপুর থানা পুলিশের সহায়তায় তার সহপাঠীরা লাশ গ্রহণ করে। অতপর শুক্রবার (১৩ জানুয়ারি) বাদ মাগরিব বিজ্ঞান কলেজ মাঠে জানাজার পর রাতেই বাড্ডা কবরস্থানে দাফন করেন।

ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় কিশোর বয়সেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সাঈদ আবদুল্লাহ (২২)। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। কক্সবাজারের চকরিয়া গ্রামার স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ছাত্র পড়িয়ে সেই টাকা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু দুর্ঘটনায় অবসান হলো তার সংগ্রামী জীবনের।

বুধবার (১১ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে রেললাইন পার হওয়ার সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রেলওয়ে থানা জানায়, সাঈদ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হচ্ছিলেন। কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে কাটা পড়ে সাঈদ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। পরে জিআরপি থানার পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠায়।

চকরিয়ার পশ্চিম কোনাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সইফুল হক বলেন, সাঈদ আবদুল্লাহর বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের হেতালিয়া পাড়ায়। তার আগের নাম ছিল জুয়েল শীল, পিতার নাম বিধু কুমার শীল। সে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় হিন্দু ধর্ম পরিবর্তন করে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবার তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং তার সঙ্গে সম্পর্কছেদ করে। সাঈদ এসএসসি পাস করে ঢাকায় গিয়ে তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। তিনি আরও জানান, সাঈদের মৃত্যুর খবর শুনে তার বাবা-মাকে লাশ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করতে এলাকাবাসীর পক্ষে আমরা গিয়েছিলাম। ওর বাবা তার লাশ গ্রহণ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

এদিকে সাঈদ আবদুল্লাহর সহপাঠী ও বন্ধু আবদুল্লাহ নোমান বলেন, সাঈদ অনেক কষ্ট করে চলত। কিন্তু কারো কাছে কিছু খুলে বলত না। পরিবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও সাঈদ তার মায়ের সঙ্গে গোপনে দেখা করত। আমাকে সে বলেছিল, এইচএসসির রেজাল্ট দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই বাড়িতে গিয়ে গোপনে মায়ের সঙ্গে আবার দেখা করবে। তার সে আশা আর পূরণ হলো না।

সাঈদের স্মৃতিচারণা করে আবদুল্লাহ বলেন, সুযোগ পেলেই তারা দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করতেন। কলেজ চলাকালে সাঈদ আর তিনি এক টেবিলে খেতেন। সাঈদ অত্যন্ত ভদ্র ও মেধাবী ছিলেন। ফুটবলও ভালো খেলতেন। সাঈদের লাশ গ্রহণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হওয়ায় পরে চকরিয়া থানা ও কমলাপুর থানা পুলিশের সহায়তায় সহপাঠীরা তার লাশ গ্রহণ করে শুক্রবার বাদে মাগরিব বিজ্ঞান কলেজ মাঠে জানাজা পড়ে, রাতেই বাড্ডা কবরস্থানে তার দাফন কার্য সম্পাদন করা হয়েছে বলে জানান আবদুল্লাহ।

চকরিয়া থানার ওসি বলেন, সাঈদের পিতা বিধু কুমার শীল ছেলের লাশ গ্রহণ করবেন না বলে লিখিত দিয়েছেন। বিষয়টি তেজগাঁও থানাকে অবগত করা হয়েছে।

তেজগাঁও থানার ওসি অপূর্ব হাসান বলেন, সাঈদের লাশ তার বাবা গ্রহণ করবেন না মর্মে চকরিয়া থানার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজের সহপাঠীদের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন