দখল-দূষণে হুমকির মুখে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত

fec-image

দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। বছরে কোটি পর্যটকের সমাগম হয় বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতে। পর্যটক ছাড়াও দেশি-বিদেশি শতাধিক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা অস্থায়ীভাবে বাস করেন এই শহরে।

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পর্যটক, ট্যুর অপারেটর, পর্যটক ও হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীদের দায়িত্বহীন আচরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসনের অক্ষমতার কারণে প্রতিনিয়ত কক্সবাজারসহ আশপাশের পর্যটন এলাকা মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে না পারলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

সরজমিনে কক্সবাজার শহর, সমুদ্র সৈকত ও আশপাশের এলাকায় অপরিচ্ছন্নতার ছাপ দেখা গেছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে সৈকতে দৃশ্যমান ময়লা না থাকলেও সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণায় ও গরুর বিচরণের কারণে বসে থাকা যায় না। পুরো শহরজুড়েই মশার রাজত্ব। সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় হোটেল-মোটেল থেকে তরল বর্জ্য ড্রেন দিয়ে পড়ছে বাঁকখালী নদীতে। সমুদ্র সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পয়েন্ট লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও আশপাশের বার্মিজ স্কুলের সামনের সড়ক, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের সড়ক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে রয়েছে ময়লার বিশাল ডাম্পিং।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর কক্সবাজারে এক কোটিও বেশি পর্যটক আসেন। এর মধ্যে পর্যটন মৌসুমেই আসেন প্রায় অর্ধকোটি। মূলত পর্যটন মৌসুমে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) ও ছুটির দিনগুলোতে এখানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পর্যটকের সমাগম ঘটে। এদের থাকা-খাওয়ার জন্য রয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। যার বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়ছে।

এছাড়া স্থানীয় বাঁকখালী নদীতে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। সাগরের পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে বিপুল সম্ভাবনার কথা বলা হলেও দূষণের ফলে তা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

dhakapost

জানা গেছে, বাঁকখালী নদীর উজানে ৩৫০ থেকে ৫০০ মিটার প্রশস্ততা থাকলেও মোহনায় তা সর্বোচ্চ ৫০ মিটার। এখানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলে, তার ওপর নদী খননের মাটি ফেলে হাউজিং প্রকল্প করা হয়েছে।

এদিকে সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে আশপাশের ভাতের হোটেল ও ঝুপড়ি দোকানের ময়লা। এসব কারণে সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকরা সৈকতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারছেন না। সুগন্ধা পয়েন্টে অবস্থান করা কয়েকজন পর্যটক বলেন, সৈকতের আশপাশের অনেক এলাকায় স্তূপাকারে ময়লা-আবর্জনা পড়ে রয়েছে। এতে চলাচল করতে চরম অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

তারা আরও বলেন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের গল্প শুনে অভিভূত হয়েছি। অথচ এখানে এসে দেখি দেশের অন্য পর্যটন স্পট থেকেও এটি নোংরা। নেই ভালো রাস্তাঘাট, পুরো সৈকতে অব্যবস্থাপনা। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী, ঝুড়ি, ডাবের ছোবড়া ও  ময়লা-আবর্জনা। এসব যেন দেখার কেউ নেই।

ঢাকা থেকে আসা মিলন কান্তি দাশ বলেন, কারখানার কর্মচারীদের নিয়ে এখানে পিকনিকে এসেছি। সব ভালো লাগলেও সৈকতজুড়ে পড়ে থাকা ময়লা দেখে খুব খারাপ লাগছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকতের এই বেহাল দশা মেনে নেওয়া যায় না।

সৈকতে বেড়াতে আসা ইমরান হোসেন বলেন,  যেভাবে সমুদ্রের পাড়ে বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ জমা হয়ে আছে, তাতে মনে হচ্ছে এসব দেখার কেউ নেই। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের আন্তরিক পদক্ষেপ জরুরি। অন্যথায় পর্যটকরা বিব্রত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই পর্যটন শহরে সব কিছুই হুমকির মুখে রয়েছে। যেন ইসিএ এলাকা নির্ধারিত সমুদ্র সৈকতের ৩০০ মিটারের মধ্যে নির্মিত এবং নির্মাণাধীন বহুতল ভবনগুলো ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সমুদ্র সৈকত রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন শুরু হয়, এটাই প্রশাসনের প্রতি পরিবেশ কর্মীদের দাবি। সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্যত্রে পুনর্বাসন করা হোক।

dhakapost

সমুদ্র দূষণের বিষয়ে গ্রিন কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, পৃথিবীর বহু সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে দূষণের ফলে। যেভাবে চলছে তাতে একদিন এই কক্সবাজারকেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এখানকার প্রশাসনের সেই সক্ষমতা নেই। পর্যটন বোর্ডকে এখানে এগিয়ে আসতে হবে। শিগগিরই এটার একটা বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি হোটেল-মোটেলের ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’ ধারণার বিকাশ ঘটাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কী পরিমাণ পর্যটক একদিন অবস্থান করতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। এরপর অবশ্যই এটার লাগাম টানতে হবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন,পরিবেশ বিধ্বংসী বন-নদী পাহাড় প্রকৃতি রক্ষা করতে সর্বোচ্চ আদালত বার বার আইন প্রয়োগের কথা বললেও তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলা রয়েছে। অন্য পরিবেশ কর্মীদের মতো আমারও আক্ষেপ, আমরা শুধু কথাই বলে যাই, কাজের কাজ কিছু করতে পারি না। কারণ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্রের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার ট্যুর অপারেটরের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, অন্যান্য শহরের তুলনায় কক্সবাজার অপরিচ্ছন্ন বেশি। এখানকার পৌরসভার গাফিলতি রয়েছে। আমরা ট্যাক্স দেই পৌরসভাকে। অথচ আমাদেরই লাখ লাখ টাকা খরচ করে বর্জ্য ফেলে দিয়ে আসতে হয়। এই দায়িত্ব ছিল মূলত পৌরসভার।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘উই ক্যান’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ওমর ফারুক জয় বলেন, কক্সবাজারের তলদেশ থেকে আর বিশুদ্ধ মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছে না। হোটেল-মোটেলের তরল বর্জ্য কিছুটা সমুদ্রে যাচ্ছে, আর কিছুটা মাটির নিচের পানিতে মিশে যাচ্ছে। আমরা এই শহরের বিভিন্ন নলকূপের পানি পরীক্ষার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠিয়েছলাম। তারা বলেছে, এটা পরীক্ষা করার মতো গবেষণাগার তাদের নেই।

তিনি বলেন, পৌরসভার কঠিন বর্জ্য রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িতে ফেলার কথা ছিল, কিন্তু তারা ওখানে না নিয়ে শহরের কাছাকাছি বাঁকখালী নদীতে ফেলে দিচ্ছে। এই নদীর পানি এখন চরম দূষিত। আশপাশে নলকূপ থেকে আর স্বচ্ছ পানি উঠছে না।

dhakapost

সৈকতে গরুর অবাধ বিচরণের বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ হাসান জানান, সৈকত লাগোয়া রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকানের উচ্ছিষ্ট খাবারসহ নানা বর্জ্য সৈকতের বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়। আর এসব পচা-বাসি খাবারের লোভে গরুগুলো এসব এলাকায় চলে আসে। এসব গরুর মালিকদের খোঁজ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে প্রথমে ১৯৯৯ সালের ইসিএ আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যানগুলো ভয়ের। কোথায় আমরা ভুল করেছি তা বের করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি দর্শনের জায়গায় আসতে হবে। যাতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা হয়।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আমিন আল পারভেজ জানান, নদী দখল করে ভরাট ও প্যারাবনের গাছ নিধনের অভিযোগে দখলবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারি জায়গা দখল,পাহাড় কাটাসহ পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন খবর আমাদের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়। তারপরও কিছু দখলবাজ ভূমিদস্যু আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্নভাবে দখলবাজি করে যাচ্ছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: কক্সবাজারের, সমুদ্র সৈকত
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × five =

আরও পড়ুন