দুই বছরে আসাম বাংলাদেশে পুশইন করেছে ১ হাজার ৬৭৯

fec-image

ভারতের আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল (এফটি) ঘোষিত ১৯৩ জন ‘বিদেশি’কে গত দুই বছরে বাংলাদেশে পুশ ইন বা ঠেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৭ জনকে গত বছর পুনরুজ্জীবিত করা ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ প্রয়োগ করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এই দুই বছরে ১ হাজার ৬৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে বা ঠেলে পাঠিয়েছে আসাম কর্তৃপক্ষ। আসাম সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য বিধানসভায় জমা দেওয়া তথ্য থেকে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, আজ মঙ্গলবার অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (এআইইউডিএফ) বিধায়ক বদরুদ্দিন আজমলের এক প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য দেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। এর আগের দিন ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

গতকাল সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ গুয়াহাটি হাইকোর্টের ২৭টি রায় বাতিল করেন। ওই রায়গুলোতে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের এমন সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছিল, যেখানে আবেদনকারীদের একতরফাভাবে (এক্স-পার্টে) বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছিল।

অর্থাৎ, তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে আদেশ জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট জানান, নাগরিকত্ব নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন অবশ্যই ন্যায্য, আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালত ২৭টি মামলাই সংশ্লিষ্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন, নাগরিকত্বের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়।

বিধানসভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এক দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিপোর্ট’ করা হয়েছে, এক দলকে ‘সেন্ট ব্যাক’ হিসেবে ফেরত পাঠানো হয়েছে ও আরেক দলকে ‘এক্সপেলড’ বা বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই ১ হাজার ৬৭৯ জনের মধ্যে ১৯২ জন ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত বিদেশি। এ ছাড়া মরিয়ম বেগম নামের এক শিশুকন্যাকেও তার মায়ের সঙ্গে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে। তার মা ঘোষিত বিদেশি। ভারতের আইন অনুযায়ী, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কাউকে বিদেশি ঘোষণা করলে তিনি গুয়াহাটি হাইকোর্ট ও পরে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক হিসেবে পারস্পরিক যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পর সেই দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে ২০২৫ সালের মে মাস থেকে আসাম সরকার ঘোষিত বিদেশিদের ‘পুশ ব্যাক’ বা জোর করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠানোর নীতি গ্রহণ করে। এতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি। পরে সেপ্টেম্বরে সরকার দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দেয়। একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন করে একাধিক ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়। ঘোষিত বিদেশিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পর প্রশাসন তাদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠায়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো ৬৭ জন ঘোষিত বিদেশির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন মধ্য আসামের নগাঁও জেলার বাসিন্দা। পশ্চিম আসামের কোকরাঝাড় থেকে ১৬ জন, বারপেতা থেকে সাতজন, চিরাং ও মধ্য আসামের কার্বি আংলং থেকে চারজন করে, ডিমা হাসাও ও হোজাই থেকে তিনজন করে, কামরূপ (গ্রামীণ) ও ধুবড়ি থেকে দুজন করে এবং বঙ্গাইগাঁও, তামুলপুর, উদালগুড়ি, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, লখিমপুর ও হাইলাকান্দি থেকে একজন করে বহিষ্কৃত হয়েছে।

অন্যদিকে অন্য ১২৬ জন ঘোষিত বিদেশিকে ‘রিপ্যাট্রিয়েটেড’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যাদের ‘সেন্ট ব্যাক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এই তালিকায় দরং জেলার এক শিশুকন্যাও রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের মে মাসে তাকে তার মা মানিকজানের সঙ্গে পুশ ব্যাক করা হয়েছিল।

বদরুদ্দিন আজমল আরও জানতে চান, বাংলাদেশে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন গুয়াহাটি হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন। জবাবে আসাম সরকার জানায়, হাইকোর্ট বা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে কোনো আপিল বিচারাধীন থাকলে কোনো চিহ্নিত অবৈধ অভিবাসীকে প্রত্যাবাসন করা হয় না। তবে যাদের প্রত্যাবাসন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আসাম, পুশইন, বাংলাদেশ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন