পার্বত্যাঞ্চলে বিদেশী এনজিওগুলোর ধর্মান্তরিত করার কার্যক্রম থেমে নেই

খোকন বড়ুয়া
তারিখ: 22 May, 2013

পার্বত্য জনগণের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিদেশী এনজিওগুলো। স্বাস্থ্যসেবা ও মানবসেবার নাম করে প্রায় এক দশক ধরে এসব এনজিও তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তাদের একটাই লক্ষ্য অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করা। এ জন্য তারা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাকে বেছে নিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, তিন পার্বত্য জেলায় এক সময় বৌদ্ধ, মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বেশি থাকলেও বর্তমানে খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরখানেক আগে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন তিন পার্বত্য জেলায় এনজিগুলোর কার্যক্রমের ওপর প্রতিবেদন আকারে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরে।

তথ্য মতে, খ্রিষ্টান কমিশন ফর ডেভলপমেন্ট বাংলাদেশ (সিসিডিবি), অ্যাডভানটেজ ক্রুশ অব বাংলাদেশ, হিউম্যানিট্রেইন ফাউন্ডেশন, গ্রিন হিল, গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থা (গ্রাউস), ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ক্রুশ, শান্তিরানী ক্যাথলিক চার্চ, জাইনপাড়া আশ্রম, তৈদান, আশার আলো, মহামনি শিশু সদন, কৈনানিয়া, তৈমু প্রভৃতি এনজিওর বিরুদ্ধে তিন পার্বত্য জেলায় খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এনজিওগুলো নানা প্রলোভনে পড়ে দলে দলে ধর্মান্তরিত হচ্ছে পাহাড়ি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী। এসব এনজিও প্রতি সপ্তাহে চাল, ডাল, তেল বিতরণের পাশাপাশি মাসিক অর্থও সাহায্য করছে খ্রিষ্টান হওয়ার শর্তে।

সূত্র মতে, বছরখানের আগে এসব এনজিওকে সরকারি নজরদারিতে আনলেও তাদের কার্যক্রম থেমে নেই। দারিদ্র্য ও সরলতার সুযোগ নিয়ে পাহাড়িদের সাহায্য ও সহযোগিতার নাম করে এনজিওগুলো তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল করছে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ত্রিপুরা উপজাতি থেকে ৩ শতাংশ, চাকমা উপজাতি থেকে ৫ শতাংশ মারমা উপজাতি থেকে ২ শতাংশ ও সাঁওতাল উপজাতি থেকে ৩ শতাংশ খ্রিষ্টান হয়েছে। খ্রিষ্টান মিশনারিগুলোর বিরুদ্ধেও ধর্মান্তরিত করার তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়াও ইউএডিপি ও ইউনিসেফের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত পাড়া কেন্দ্র এলাকার শিশুদের মধ্যে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। পাড়া কেন্দ্রের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রত্যেক দিন তাদের মধ্যে ইউনিসেফ সরবরাহকৃত হাই এনার্জি বিস্কুট বিতরণ করা হয়। বিভিন্ন রেজিস্টার্ড ও নন রেজিস্টার্ড এনজিওর মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের আড়ালে মূলত এসব এনজিও খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব এনজিও প্রতিনিয়ত উপজাতীয়দের বাঙালিবিদ্বেষী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। কোনো কোনো এনজিও বেতনভুক লোক নিয়োগের মাধ্যমে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে সহজ সরল উপজাতীয়দের মধ্যে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেলায় খ্রিষ্ট ধর্মের যে জনসংখ্যা তা বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমানসহ অন্যান্য সব ধর্মের সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

তথ্য মতে, বান্দরবানের আজিজ নগরের গোদার পাড়া ও ইসলামপুর ত্রিপুরা পাড়ার (হরিণ মারা) প্রায় ত্রিপুরাই বর্তমানে খ্রিষ্টান। তারা রোববারে গির্জায় প্রার্থনা করেন। খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণের জন্য প্রাপ্য আর্থিক সাহায্য অটুট রাখার স্বার্থেই তাদের সপ্তাহের রোববার বাধ্যতামূলকভাবে গির্জায় যেতে হয়।

লামা উপজেলার গজালিয়া, শৌরই, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের গহিন পাহাড়ে বসবাসকারী উপজাতিদের দারিদ্র্যের সুযোগে কারিতাস, গ্রাউস, সিসিডিবি, হিউমেনিট্রেইন প্রভৃতি সংগঠন তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অর্থ ঋণ দিয়ে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করে। জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সমতলের তুলনায় পাহাড়ি ইউনিয়নগুলোতে চার থেকে ছয় বছর বয়স্ক শিক্ষার্থীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। খ্রিষ্টান মিশনারি তৎপরতায় এ উপজেলায় ব্যোম, মারমা প্রভৃতি উপজাতীয় লোকদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অন্য দিকে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বাড়ছে।

রুমা হচ্ছে বান্দরবানের সবচেয়ে ছোট উপজেলা। এ উপজেলার রুমা ইউনিয়নেই কেবল স্বল্পসংখ্যক মুসলমানের বসবাস। গেইলাঙ্গা, রেমাকৃপাংশা, ফাইন্দু প্রভৃতি ইউনিয়নে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও স্বল্পসংখ্যক হিন্দু বসবাস করে। এই উপজেলাটি অত্যন্ত সুন্দর। বিশ্বের প্রাকৃতিক জলাধার বগা লেক এ উপজেলাতেই অবস্থিত। মার্মা ও ব্যোম এ দু’টি উপজাতি অধ্যুষিত এ উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ খ্রিষ্টান।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রুমা বাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আশ্রম পাড়া এলাকায় চার-পাঁচটি ত্রিপুরা পরিবার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর আর্থিক অনটনে পড়ে মুসলমান সমাজের মুখাপেক্ষী হয়। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে খ্রিষ্টান মিশনারিদের জাইনপাড়ার চার্চের দ্বারস্থ হলে পরে আর্থিক সাহায্য ও অন্যান্য সেবা দেয়ার মাধ্যমে তাদের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত জাইনপাড়ার খ্রিষ্টান মিশনে হেলিকপ্টার অবতরেণের সুবিধাও রয়েছে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা, আর্থিক অনুদান প্রভৃতি কার্যক্রমও এ মিশনের আওতায় বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। এ মিশনের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হচ্ছে মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা। কোনো মহিলা গর্ভবতী হয়েছে এমন তথ্য পেলে মিশনের উদ্যোগে খ্রিষ্টান স্বাস্থ্যসেবা কর্মী সে মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যার নামে তাকে মিশনে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, আর্থিক সাহায্য দেন। সন্তান প্রসবকালে হাসপাতালে ভর্তি করে। শিশু জন্মের পর শিশুর সামগ্রিক পরিচর্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে পরে শিশুটিকে মিশনের স্কুলে পড়ালেখা করানোসহ তার যাবতীয় খরচ বহন করে। মায়ের জন্য ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকে। এক সময় মা ও শিশু উভয়েই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। এভাবেই চলতে থাকে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রচার ও প্রসার কার্যক্রম। খ্রিষ্টান মিশনারির এ রকম তৎপরতা থাকলেও বৌদ্ধ বা মুসলিম ধর্মের প্রচার বা প্রসারে কোনো উদ্যোগ নেই। বান্দরবানে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারি মারমা ও ব্যোম সম্প্রদায়ের অনেকেই খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ায় বর্তমান বৌদ্ধ জনসংখ্যার প্রায় তিন গুণ হয়েছে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। খ্রিষ্টান মিশনারির তৎপরতায় উপজাতীয়দের মধ্যে বর্তমান শিক্ষার গড় হার ৭০ শতাংশ। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের মধ্যে শিক্ষার হার ২০ শতাংশ। খ্রিষ্টান মিশনারির তৎপরতাকে পরোক্ষভাবে সহায়তা দিচ্ছে ইউএনডিপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ অর্থায়নে ‘পাড়া কেন্দ্র’। পাড়া কেন্দ্রে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে ১০ শতাংশ বাঙালি। বাকি সবাই উপজাতি।

গত এক বছর আগের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিবেদনের তথ্য মতে, চারটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ও ধর্মভিত্তিক পরিবারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বান্দরবানের রুমা উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ২৬ হাজার ৫৮৯ জন। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ছয় হাজার ৮২৭। এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা এক হাজার ৮১৩ জন, পরিবার ৩৫০টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১১ হাজার ৮৮০, পরিবার দুই হাজার ৫১৯টি, বৌদ্ধ জনসংখ্যা নয় হাজার ৯০৯, পরিবার এক হাজার ৯৮৮টি ও হিন্দু জনসংখ্যা ৪১৬, পরিবার ১৪২টি।

থানচি উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ১৬ হাজার ৯৯২। ১০ বছরের কম বয়সী শিশু চার হাজার ৭৯৭টি। এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা এক হাজার ২৮৬, পরিবার ১৪০টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা নয় হাজার ২৯২, পরিবার এক হাজার ৯৫১, বৌদ্ধ জনসংখ্যা চার হাজার ৫৪৫, পরিবার ৮৮৯ ও হিন্দু জনসংখ্যা ৩৫১ এবং পরিবার ১০৩টি।

আলী কদম উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ৩৫ হাজার ২৬৪ জন। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশু ১০ হাজার ৩৪০। এই জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২০ হাজার ৭৩৭। পরিবার তিন হাজার ৯৯৫টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ হাজার ৯১৭, পরিবার দুই হাজার ২৩৬, বৌদ্ধ জনসংখ্যা দুই হাজার ৩২, পরিবার ৪৬২টি ও হিন্দু জনসংখ্যা এক হাজার ৫১৭ ও পরিবার ৩২০টি।

বান্দরবান সদরে মোট জনসংখ্যা ৬৮ হাজার ৬৯৩ জন। এর মধ্যে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৩৬। এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ২৯ হাজার ১৮৫ জন, পরিবার পাঁচ হাজার ৭০২টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ২৯ হাজার ৩৬৫, পরিবার পাঁচ হাজার ৪৫০, বৌদ্ধ জনসংখ্যা তিন হাজার ৭৪ ও পরিবার ৬৩৪টি এবং হিন্দু জনসংখ্যা পাঁচ হাজার ৩২৯, পরিবার এক হাজার ১৯৫টি।

লামা উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ৭৮ হাজার ৪৮৮। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশু ২৮ হাজার ৮৩০। এই উপজেলায় মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম ৫৪ হাজার ৩৪৯ ও পরিবার ১১ হাজার ২৬৯ টি, খ্রিষ্টান জনসখ্যা ১৫ হাজার ৪২৯ জন, পরিবার তিন হাজার ১৫০টি, বৌদ্ধ জনসংখ্যা চার হাজার ৯৬৬ ও পরিবার এক হাজার ১৫টি এবং হিন্দু জনসংখ্যা রয়েছে দুই হাজার ৪৩৪ জন, পরিবার ৫৭৩টি।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ৪৯ হাজার ৪৬৫ জন। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৭২। এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৬ হাজার ৭৬৬, পরিবার ছয় হাজার ৬২৯টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১১ হাজার ৫২৩ জন, পরিবার দুই হাজার ১৯১টি, বৌদ্ধ জনসংখ্যা ২৫৪ জন, বৌদ্ধ পরিবার ৬৭, হিন্দু জনসংখ্যা ৫৩০ ও পরিবার ১২৩টি।

রোয়াংছড়িতে মোট জনসংখ্যা ২২ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা পাঁচ হাজার ৯৮০। একই উপজেলায় মুসলিম জনসংখ্যা এক হাজার ৯২৬ জন, পরিবার ৩৮৭টি, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১৫ হাজার ৫৯১ জন, পরিবার তিন হাজার ৪০৪টি, বৌদ্ধ জনসংখ্যা তিন হাজার ৭৬৬ জন, পরিবার ৭৬৫টি এবং হিন্দু জনসংখ্যা ২১৯ ও পরিবার ৮৩ টি।

  সৌজন্যে- দৈনিক নয়াদিগন্ত: ২২-৫-২০১৩।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − fifteen =

আরও পড়ুন