প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বরণ


শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাৎ বরণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে একটা সংকট উত্তরণ কমিটি (Crisis Committee) গঠনের নির্দেশ দিলেন। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তিনার অবর্তমানে দেশে কোন জরুরী অবস্থার (Emergency Situation) সৃষ্টি হলে সেই সংকট কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে, প্রশাসনিক দায়িত্ব কিভাবে পালিত হবে তার জন্যই মূলতঃ এই ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
যে কোন সময় সংকট উত্তরণ কমিটির সদস্যবর্গ পূর্ব নির্ধারিত আপৎকালীন সময়ে অর্থাৎ Highest Emergency Situation এ কাজ করতে পারে তা সম্পাদন করার জন্যই মূলতঃ ক্রাইসিস কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
ভারতে স্বেচ্ছানিবাসী থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিলে অনুপস্থিত থেকেও সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ১৭ মে ১৯৮১ শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে এসে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিকাশমান ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্যই মূলতঃ এই ধরনের উদার গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
৩০ মে ১৯৮১ চট্রগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বরণের পর সংবিধান অনুসারে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভাইস প্রেসিডেন্ট অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। সংকটময় মূহুর্তে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিনা তা বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত না অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি অসমর্থ না হয়ে যান ততক্ষণ এপর্যন্ত তিনিই রাষ্ট্রপ্রধান। বিচারপতি আবদুস সাত্তার সিএমএইচ হসপিটাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বঙ্গভবনে রওনা হলেন। তিন বাহিনী প্রধানের উপস্থিতিতে বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভাইস প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ করলেন, সাংবিধানিকভাবেই এবং স্বতঃ সিদ্ধভাবেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে গেছেন। কেননা প্রেসিডেন্টের মৃত্যু এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে দেশে কোন নির্বাহী প্রধান নেই। আর সংবিধানে এরূপ কোন অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতার অবকাশ রাখা হয়নি। আর এ জন্যই সংবিধানের তফশিলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের কোন ফরমও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি। তিন বাহিনীর প্রধান এবং কেবিনেট সেক্রেটারির আনুগত্য প্রাকাশই সংকটকালীন সময়ে মূখ্য বিষয়। যদিও বেসামরিক প্রশাসনে কেবিনেট সেক্রেটারি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি পদ সৃজিত হয়নি। আর ক্রাইসিস কমিটির প্রধান হিসাবে কেবিনেট সেক্রেটারিই প্রথম আনুগত্য প্রকাশ করলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীর তরফ থেকে জেনারেল এইচ এম এরশাদ, এডমিরাল এম এ খান ও ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিন আহমেদ আনুগত্য প্রাকাশ করলেন। তিনাদের উপস্থিতিতে সংবাদ বুলেটিন তৈরী হলো, খসড়া বুলেটিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মৌখিকভাবে অনুমোদন করলেন। ইসলামী রীতি অনুযায়ী চল্লিশ দিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানগণ যার যার কর্মস্থলে চলে গেলেন।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্দেশ দিলেন মন্ত্রীসভার বৈঠক আহবান করে সব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সকাল ৯:৪০ মিনিটে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারের প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো- চল্লিশা দিন যাবৎ জাতীয় শোক দিবস পালন করা হবে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং সংসদের অধিবেশন চালু থাকবে। সংবিধানের ১৪১ (ক) ধারামতে দেশে জরুরী অবস্থার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো এবং এই ঘোষণা সংসদে পেশ করা হবে। সকাল ১০:৩০ মিনিটে রেডিও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশবাসী এবং বহিঃবিশ্বকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু সংবাদ জানানো হলো। সেই ঘোষনায় বলা হলো ১০:৪৫ মিনিটে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সকল বিষয় অবহিত করে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন এবং সকল ঘটনা দেশবাসীকে অবহিত করবেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনে শেশের সকল মানুষ শোকাহত মানুষ প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পরলো। স্কুল কলেজ ছুটি হয়ে গেল। দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে এসে দুষ্কৃতকারী জেনারেল মঞ্জুর ও তার সহকর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে লাগলো।
মন্ত্রীসভার বৈঠকের পরপরই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট শোক প্রকাশের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গেলেন। শোকে মুহ্যমান বেগম খালেদা জিয়া পাথরের মত নিশ্চল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি শুধু একটা কথাই উচ্চারণ করেছিলেন, “আনবেন না?” শহীদ জিয়ার লাশ! তিনি ঢাকায় লাশ আনার জন্য ইঙ্গিত করেছিলেন বলেই ক্রাইসিস কমিটির চৈতন্যদয় হলো শহীদ জিয়ার লাশ সংগ্রহ করে ঢাকায় এনে যথাযথ মর্যাদায় দাফন করার জন্য।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বরণ বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন প্রবর্তনের পথে এক চরম আঘাত। শহীদ জিয়ার মৃত্যু তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অর্জিত উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এক প্রচণ্ড অভিঘাত। কারণ তিনি মুসলিম, স্বল্পোন্নত ও জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর একজন শক্তিশালী প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন। জনগণের মনে সুখ, সমৃদ্ধি, স্বস্তি ও শান্তির আশা প্রদীপ্ত করে তুলেছিলেন। মুসলিম বিশ্বের তিনি একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের জন্য গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট আল-কুদস কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি ইরাক-ইরান দ্বন্দ্বের মধ্যস্ততাকারী নিযুক্ত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশ তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council) এর সদস্য পদ লাভ করেছিল।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত বরণের পরদিন ৩১ মে ১৯৮১ যে শোক প্রস্তাব মন্ত্রীসভা গ্রহণ করেছিল, তা ছিল নিম্নরূপ-
“অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের এই সভা কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারীর হাতে চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করিতেছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁহার অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা, তাঁহার গভীর দেশপ্রেম ও জনগণের সার্বিক কল্যাণে নিরলস ও নিঃস্বার্থ কর্মপ্রচেষ্টা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং জনগণকে সংগঠিত ও ঊর্ধ্ব করিয়া আত্ম-নির্ভরতার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁহার প্রকৃত অবদানের কথা এই সভা গর্বের সাথে স্মরণ করিতেছে। মুসলিম ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সমস্যাবলীর সমাধানে, জোট নিরপেক্ষ জাতিসমূহের দাবী দাওয়ার বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসাবে তাঁহার প্রশংসনীয় ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য যে সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করিয়াছিলেন, এই সভা শ্রদ্ধাভরে তাহা স্মরণ করিতেছে। এই সভা সমগ্র দেশবাসীর নিকট আহবান জানাইতেছে যে তাহারা যেন জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণ এবং কঠোর শ্রমের মাধ্যমে পরলোকগত প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নির্দেশিত আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য পুনরায় আত্মনিয়োগ করেন।
এই সভা মরহুম রাষ্ট্রপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পত্নী বেগম খালেদা জিয়া ও তাহাদের সন্তানদ্বয় এবং পরিবারের অন্যন্য সদস্যদের প্রতি গভীর মর্মবেদনা জ্ঞাপন করিতেছে যে আল্লাহ তায়ালা যেন তাহাদেরকে এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোক বহনের শক্তিদান করেন।
এই সভা পরলোকগত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রূহের মাগফিরাতের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করিতেছে।”
পহেলা জুন ১৯৮১ সকাল ৯:২৫, বিকাল ৩:২৫ এবং রাত ৮:৩০ মিনিটে তিনটা মন্ত্রীসভার বৈঠক হয়েছিল। সেইদিন ভোরে জেনারেল মঞ্জুরের পতনের খবর আসে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। বিকাল ৩:২৫ মিনিটে মিটিং এ সিদ্ধান্ত হলো যে, মরহুম জিয়াউর রহমানের লাশ এনে ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের কাছে দাফন করা হবে। আরো সিদ্ধান্ত হলো যে, দেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যাবস্থা বিবেচনা করে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কোন বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানকে দাওয়াত দেওয়া হবে না।
১৯৮১ সালের ২ জুন বেলা ১২:০০ ঘটিকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সম্মুখে মানিক মিয়া এভিনিউতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা নামাজের আয়োজন করা হলে বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমাম জানাজা পড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী, তিন বাহিনীর প্রধান সহ লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এই জানাজার নামাজ একটি অনন্য সাধারণ এবং অবিস্মরণীয় ঘটনা।
১১ জুন’১৯৮১ মন্ত্রী সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারের উপর একটা সমাধি সৌধ নির্মাণ করা হবে। এজন্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের সকল স্থপতিদের নিকট থেকে মডেলসহ নকশা আহবান করা হবে। সেই মোতাবেক স্থপতি আবুল বাশারের নকশা গৃহীত হয়। তাঁর নকশা অনুসারেই শহীদ জিয়ার মাজারের দ্বিতীয় অংশের উপর চাঁদোয়া পরবর্তিতে নির্মিত হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে কাদের কি ভূমিকা ছিল পরবর্তিতে রাষ্ট্রযন্ত্রে যারা বেনিফিশিয়ারী ছিল তাদের নিয়ে চিন্তা করলেই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। একদিন মন্ত্রী পরিষদের মিটিং এ হঠাৎ করেই জেনারেল এরশাদ, জেনারেল আতিকুর রহমান ও রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদেকুর রহমান চৌধুরী সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন। তাদের আচম্বিত প্রবেশাধিকারে সকলেই হকচকিয়ে গেলেন। উদ্বেগ আকুল দৃষ্টিতে সবাই তাদের দিকে তাকালেন। সবারই মনে ঔৎসুক্য, কোনরূপ খবর না দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে কেন তারা মন্ত্রীসভায় ঢুকে পড়েছেন। সবার নজরই অভ্যাগত তিন জেনারেলের দিকে। জেনারেল এরশাদ সর্বপ্রথম মুখ খুলে বললেন, “কি তারা শেখ মুজিবর রহমানের দেহাবশেষ টুংগিপাড়া থেকে তুলে এনে জিয়ার মাজারে জিয়ার কবরের পাশে দাফন করতে চান।” তিনি আরো বলেন, “এটা আমরা চিন্তা করেছি, ইহা আমাদের কোন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নয়, আপনারা ভেবে দেখুন।” এই বলে তারা চলে গেলেন। সামরিক স্তব্ধতার ঘোর কেটে গেলে মন্ত্রীসভা নির্ধারিত কর্মসূচিতে মনোনিবেশ করলো। জেনারেল এরশাদ ও তার সঙ্গীদের মৌখিকভাবে উল্লেখিত এই বিষয়ে কেউ কোন আলোচনার প্রয়োজনই বোধ করলেন না।
তৎকালীন সরকার কর্তৃক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার তদন্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তদন্ত আইন, ১৯৫৩ (Commission of Enquiry Act, 1953) এর ৩ ধারা মতে বিচারপতি রুহুল ইসলামকে সভাপতি ও বিচারপতি এটিএম আফজাল এবং জেলা ও সেসন জজ সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তদন্তের বিষয়গুলো নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে বললেন। তদনুসারে ৬ জুন, ১৯৮১ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি হলো। তদন্তের বিষয় (Terms of Reference) ছিল নিম্নরূপ-
০১. প্রেসিডেন্ট এর হত্যা কোন ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি স্বরূপ সংঘটিত হয়েছিল কিনা,
(ক) ষড়যন্ত্রকারীদের অভিসন্ধি কি ছিল, তাদের সনাক্তকরণ,
(খ) ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কৌশল উদঘাটন,
(গ) কাহারা ষড়যন্ত্রকারীদের সাহায্য সহযোগীতা করেছিল এবং এই সাহায্য সহযোগীতার স্বরূপ কি ছিল।
০২. প্রেসিডেন্ট এর প্রাণরক্ষার জন্য নিরাপত্তা ব্যাবস্থা কিরূপ ছিল এবং
(ক) তৎকালীন বিরাজমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট এর চট্রগ্রাম সার্কিট হাউজে রাত্রি যাপনের সময়ে এই ব্যাপারে গৃহীত ব্যবস্থা সমূহের ধরণ, রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণ ও সতর্ক প্রহরায় কি বন্দোবস্ত করা হয়েছিল এবং তা প্রেসিডেন্টের প্রাণরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত সরকারী বিধি ও নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ছিল কিনা।
(খ) প্রেসিডেন্টের দেহ রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ, কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিবর্গের পক্ষে তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে কোন ব্যর্থতা ঘটেছিল কিনা এবং তা কতটা ও কি ধরণের ছিল।
০৩. দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা প্রেসিডেন্টের লাশ অপসারণের পূর্বে কেন তা আয়ত্ব এবং সংরক্ষণ করা হলো না এই ব্যাপারে কর্তব্য পালনে করো কোন ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটেছিল কিনা।
০৪. পুলিশসহ বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রেসিডেন্টের নিহত হবার পর থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের আত্মসমর্পণ পর্যন্ত আচরণ সঠিক ছিল কিনা।
০৫. উপরোক্ত বিষয় সমূহের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য যে কোন বিষয়।
স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিশন কাজ শুরু করে দিল। এরই মধ্যে কয়েকদিন পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি এ সাত্তার তদন্ত কমিশনের বিষয়বস্তু (Terms of reference) থেকে দফা নম্বর ১-(ক), (খ), (গ) বাদ দিয়ে সংশোধনী প্রজ্ঞাপন জারী করার নির্দেশ দিলেন। একটা তদন্তে এক নম্বর দফা বাদ দিলে যেখানে তদন্তের বিষয়বস্তুই থাকে না, সেখানে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৩ জুন’১৯৮১ তদন্তের বিষয় সংশোধন করা হলো। শুধু তাই নয় তদন্তের মূল বিষয় অর্থাৎ এক নম্বর দফাটি (প্রেসিডেন্টের হত্যা কোন ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি স্বরূপ সংঘটিত হয়েছিল কিনা?) বাদ দেওয়া হলো। যার ফলশ্রুতিতে হত্যাকান্ডে ষড়যন্ত্রকারীদের অভিসন্ধি, পরিকল্পনা ও কাহারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, এই ধরণের সব অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিরদিনের জন্য অনুদঘটিত থেকে গেল।
ড. মোঃ শামসুজ্জামান মেহেদী
বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]
















