বঙ্গোপসাগরে বসতে পারে মার্কিন নৌ সামরিক ঘাঁটি

fec-image

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। চীনের উত্থান ঠেকাতে অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অঞ্চলে চীনকে মোকাবেলা করা নিয়ে এরই মধ্যে উচ্চাভিলাষী এক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বাইডেন প্রশাসন। এছাড়াও এ অঞ্চলে নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পাশাপাশি পুরনো ঘাঁটি নতুন জায়গায় সরিয়ে আনার কথাও ভাবা হচ্ছে।

বিভিন্ন (আন্তর্জাতিক) গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ বহরের (সারফেস শিপ) ৬০ শতাংশই ইন্দো-প্যাসিফিকে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশালায়তনের এ নৌবহর পরিচালনার জন্য ঘাঁটি স্থাপনের পাশাপাশি রিফুয়েলিং ও লজিস্টিক সহায়তারও প্রয়োজন হবে। এজন্য সংলগ্ন আরব সাগর, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং বঙ্গোপসাগরে নিরাপদ স্থানের খোঁজে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।

২০০৪ সালে গ্লোবাল ডিফেন্স পোসচার রিভিউ (জিডিপিআর) পরিকল্পনা গ্রহণের পর থেকেই ইন্দো-প্যাসিফিকে ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ পেন্টাগন খুঁজছে বলে জানিয়েছে ইউরেশিয়া টাইমস। জিডিপিআরে স্নায়ুযুদ্ধকালে জার্মানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থাপিত ঘাঁটিগুলোকে আরো শক্তিশালী করা বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে এ পরিকল্পনায় নতুন নতুন ঘাঁটি স্থাপনেরও কথা বলা হয়।

পুরনো সামরিক ঘাঁটিগুলো প্রতিস্থাপন বা শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের ফ্যাসিলিটি ব্যবহারের কথা বলা হয় জিডিপিআরে। এর মধ্যে একটি হলো এফওএস। এগুলো হলো ছোট ও দ্রুত নির্মাণযোগ্য সামরিক স্থাপনা। আরেকটি হলো কোঅপারেটিভ সিকিউরিটি লোকেশনস (সিএসএল)। এসব ফ্যাসিলিটি মূলত ঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়া স্বাগতিক দেশই স্থাপন করে। তবে তাতে কিছুসংখ্যক মার্কিন সামরিক সদস্য নিয়োজিত থাকে। এসব সিএসএলে প্রধানত ভারী যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিক সুবিধার দিকেই বেশি নজর দেয়া হয়। পরিকল্পনায় প্রয়োজনের ভিত্তিতে দুই ধরনের ফ্যাসিলিটিই সক্রিয় করে তোলার কথা বলা হয়। জিডিপিআরে বলা হয়, ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার’ উৎস মোকাবেলা করতে প্রধানত এ দুই ধরনের ফ্যাসিলিটিই ব্যবহার করা হবে।

চীনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের ভাণ্ডার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এখন অনেক সমৃদ্ধ। আওতা ও নির্ভুলতার দিক থেকেও এসব মিসাইল বেশ উন্নত। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিদ্যমান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা তৈরির অবকাশ রয়েছে। পেন্টাগনের ইন্দো-প্যাসিফিকে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চাওয়ার পেছনে এ শঙ্কাও কাজ করতে পারে। এ কারণে বর্তমানে চীনের কাছাকাছি এলাকাগুলোয় একাধিক নতুন ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদকেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা সম্ভব হবে। একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা চীনের জন্যও বেশ কঠিন হবে।

ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনকে সামরিকভাবে মোকাবেলা করতে যাওয়ার সামগ্রিকভাবে কিছু অসুবিধাও রয়েছে। জটিল ভৌগোলিক গঠনের ইন্দো-প্যাসিফিকে উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা সহজ নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অধিকাংশই নিজ ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি স্থাপন করতে দিতে নারাজ। এক্ষেত্রে সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রবণতা যেমন ক্রিয়াশীল, তেমনি রয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশও। এছাড়া রসদ-সংক্রান্ত জটিলতাও এক্ষেত্রে বড় একটি বিষয়।

ভূরাজনৈতিক ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিকে দক্ষিণ এশীয় পরিমণ্ডলে নৌঘাঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হলো বঙ্গোপসাগর বা সংলগ্ন এলাকা। গত বছর এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বড় একটি সুযোগও তৈরি হয়। চীনের সঙ্গে ভারতের সামরিক সংঘাত নয়াদিল্লিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি ঠেলে দেয়। ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কোয়াড জোটকে সক্রিয় করে তোলে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে বেশকিছু সামরিক মহড়াও আয়োজন করে।

এত কিছুর পরও কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এ অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য অনেক বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে উষ্ণতা পেলেও এক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থহানির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যে ভাগ বসাবে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি যত জোরালো হবে, ভারতের আধিপত্য ততটাই খর্ব হবে।

তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে সমস্যায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো তাইওয়ান। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে মোকাবেলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

মার্কিন থিংকট্যাংক আরএএনডি জানিয়েছে, চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে তা মোকাবেলার জন্য তাইপের আনরিফুয়েলড কমব্যাট রেডিয়াসের (যেটুকু এলাকার মধ্যে হামলা চালিয়ে ফিরে আসতে যুদ্ধবিমানের পুনরায় জ্বালানি গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না, এক হাজার কিলোমিটারের কিছু কম এলাকা) মধ্যে মার্কিন বিমানঘাঁটি রয়েছে মোটে দুটি। অন্যদিকে তাইপে থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে চীনা বিমানঘাঁটি রয়েছে ৩৯টি। ফলে এ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চীনের আক্রমণ মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পেন্টাগন এসব দিক বিবেচনায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঘাঁটি করতে দেয়ার মতো সহযোগী দেশ খুঁজছে। এক্ষেত্রে সামরিক ও কূটনৈতিক সব চ্যানেলকেই কাজে লাগানো হচ্ছে বলে ইউরেশিয়া টাইমসের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্দো-প্যাসিফিকে বিদ্যমান ঘাঁটিগুলো নিয়েও সমস্যায় রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ঘাঁটির অবস্থানস্থলের স্থানীয় বাসিন্দারাই সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র টোকিও। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে বড় একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই জনবহুল ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মেরিন সৈন্যদের এয়ার স্টেশন সরিয়ে নেয়ার দাবি রয়েছে। দ্বীপটির স্থানীয় সরকারও সেখান থেকে ঘাঁটি সরিয়ে অন্যত্র প্রতিস্থাপনের জন্য চাপ দিয়ে আসছে। বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন ও টোকিও এক ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু সে ঐকমত্যের পর আড়াই দশকেও ঘাঁটিটি সরিয়ে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ঘাঁটি সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি অনেক কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

সূত্র: বনিক বার্তা

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + ten =

আরও পড়ুন