বান্দরবানে মধুর সম্ভাবনাময় পথ, পাহাড়ে মধুর গুঞ্জনে উদ্যোক্তার উত্থান

fec-image

ভোরের আলো ফোটার আগেই বান্দরবানের শহরে এক তরুণের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। বাঁশ আর কাঠে তৈরি ছোট্ট মৌ বাক্সগুলোর চারপাশে গুনগুন শব্দ। ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছির দল। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে এসব বাক্স থেকে মধুর সংগ্রহ করছেন তরুণ উদ্যোক্তা আব্দুর শাকুর। তিন বছর আগেও যিনি ছিলেন শিক্ষক, আজ শিক্ষকতা পেশাকে ছেড়ে তিনি একজন সফল মৌচাষি উদ্যেক্তা।

আব্দুর শাকুর পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষকতার প্রভাষক। সেই পেশাকে ছেড়ে মধুর চাষকে পুঁজি করে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন পাহাড়ের এই তরুন আব্দুর শাকুর। ২০০৩ সাল থেকে বন জঙ্গল থেকে বিভিন্ন মধু সংগ্রহ করেছেন। নিজ বাড়ির ছোট্ট ঘরে চাষ করা বিভিন্ন পদে মধু নিয়ে করছেন গবেষনা। শহরের মেঘলা,নিলাচল ও বাসষ্ট্যান্ড এলাকাসহ আশপাশ পাহাড়ে ভাজে বসিয়েছেন ৭০টির মৌমাচির বাক্স। আর সেখান থেকে মধু সংগ্রহের পাশাপাশি বাড়তি আয় করছে এই উদ্যেক্তা। বর্তমানে মধু বিক্রি করে বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করছেন ।

তরুণ উদ্যেক্তা ও মধু গবেষক আব্দুর শাকুর বলেন, ২০০৩ সাল থেকে বন জঙ্গল থেকে রানী মৌমাছি সংগ্রহ করেছেন। প্রথমে অনেক পরিশ্রম হলেও পরে সেটা বিফলে চলে যায়। পূনরায় মৌমাছি সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে মধুর বাক্স বসিয়েছেন। এখন তার পাহাড়ে ভাজে ভাজে ৭০ টি মৌবাক্স রয়েছে। প্রতিদিন সকাল হলে মৌ বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। আর সেই মধুকে ছোট ঘরে গবেষণা পর সেই মধু বিক্রি করছেন বাজারে।

তরুণ এই উদ্যেক্তা বলেন, তিনি আজকে সফল উদ্যেক্তা হিসেবে সফলতা পেয়েছেন। তার মতন আরো অনেক তরুণকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যেক্তা হিসেবে সৃষ্টি করতে চান। যাতে করে মধু চাষটি পার্বত্য এলাকায় বানিজ্যিক সম্ভাবনা হিসেবে গড়ে উঠুক।

পাহাড়ের কোলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য জেলা বান্দরবান। এই প্রাকৃতিক পরিবেশই এখন হয়ে উঠছে মধু উৎপাদনের এক সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাতে। এই পাহাড়ি পরিবেশ এখন ধীরে ধীরে এটি রূপ নিচ্ছে মৌমাছি চাষের স্বর্গরাজ্য হিসেবে। বান্দরবানের পাহাড়ে মৌ চাষ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়। পাহাড়ি বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ফুল, লিচু, কফি, কলা ও পাহাড়ি ফলের সমারোহ মৌচাষের জন্য তৈরি করেছে আদর্শ পরিবেশ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বান্দরবানে মৌচাষির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আগে যেখানে হাতে গোনা কয়েকজন এ কাজে যুক্ত ছিলেন, এখন শতাধিক পরিবার নিয়মিত মৌ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আর বর্তমানে বিভিন্ন চাষের উদ্যেক্তা প্রায় শতাধিক উপরে রয়েছে।

বান্দরবানে রোয়াংছড়ি উপজেলা তারাছা ইউনিয়নের তেতুলিয়া পাড়াতে বাড়ির আশেপাশে মৌমাছি বক্স বসিয়েছেন আরো সাতজনের অধিক। প্রথমে বন জঙ্গল থেকে রাণী মৌমাছি সংগ্রহ করে নিজ বাড়ি আঙ্গিনায় শুরু করেছে বাণিজ্যিক ভাবে মৌমাছির চাষ। প্রতিটি বক্সে ২৫ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত মৌমাছি মধু জমা করে কয়েক মাস পর প্রতিটি বক্স থেকে ৩ থেকে ৬ কেজি মধু সংগ্রহ করছেন চাষীরা। স্বল্প পুঁজি ও কম পরিশ্রমে অধিক লাভ হওয়ায় মধু বিক্রি করে বাড়তি আয় করছে অনেক পরিবার।

তেতুলিয়া বাসিন্দা উথোয়াই শৈ ও হ্লামেচিং মারমাসহ আরো বেশ কয়েকজন বাড়িধারে মৌবাক্স বসিয়েছেন। মাসে দুইবার করে সেই বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করছেন আর বোতল ভরে বাজারে বিক্রি করছেন । তারা জানিয়েছে, প্রতিমাসে দুইবার করে মধু নিষ্কাশনের পর সেটি বিক্রি জন্য বাজারে নিয়ে যান বিক্রি করতে। প্রতিমাসে মধু সংগ্রহ করে দুই থেকে আড়াই কেজি যা প্রতিমাসে ৫ কেজির মতন মধু সংগ্রহ করে থাকেন এই মৌ চাষিরা। বর্তমানে তাদের আয়ের উৎস হিসেবে এই চাষকে বেছে নিয়েছেন তারা।

মৌ চাষে বাড়ছে পাহাড়ি নারীদের অংশগ্রহণ। অনেক পরিবারে নারীরাই মৌ বাক্স পরিচর্যা, মধু সংগ্রহ ও বোতলজাতকরণের কাজ করছেন। এতে পরিবারে আয় বাড়ার পাশাপাশি নারীদের আর্থিক সক্ষমতাও বাড়ছে।

রুমা উপজেলার এক নারী মৌচাষি চিংমা মারমা বলেন, ঘরের কাজের ফাঁকে মৌচাষ করি। নিজের আয় হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিতেও পারছি।

সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রশিক্ষণের অভাব, আধুনিক সরঞ্জামের সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এখনো বড় সমস্যা। তবে আগামীতেও উদ্যেক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মধুর চাষের বানিজ্যিক সম্ভাবনা বান্দরবানের পাহাড়ে মৌ চাষ হয়ে উঠছে নীরব এক বিপ্লব।

জেলা কৃষি বিভাগে উপ-পরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, উদ্যেক্তা আব্দুর শাকুর মধু চাষ নিয়ে গবেষনা করছেন। তার ৭০ টি মৌবাক্স মধ্যে প্রতিবছরে পাঁচ লাখ টাকা আয় করছেন। আর সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা বাড়লে এই খাত আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা গেলে মৌ চাষ হতে পারে পাহাড়ি অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অর্থনীতি, বান্দরবান, মধু চাষ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন