বার্মার রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কাহিনী

রুশনারা আলী, বৃটিশ এমপি

যখন আপনার বাড়িঘর ঘূর্ণিঝড়ের মুখে তখন আপনি পুনর্বাসনের দাবি করলে যদি আপনার সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে তখন কত হতাশ হতে হয়? বার্মার রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত অনেক মানুষ তাই তাদের জীবন কতটা জটিল তা উপলব্ধি করছেন। কয়েক মাস ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমরা একটি টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিকে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মুসলমান ‘জাতি নিধন’ যজ্ঞ বলে অভিহিত করেছে। বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসতিকে আলাদা করা হয়েছে। তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে আলাদা বসতিতে বসবাস করতে ও বিভিন্ন ক্যাম্পে চলে যেতে। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। মে মাসে আমি রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল এবং বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে’র সঙ্গে রাখাইনে বাস্তুচ্যুত বেশকিছু শিবির পরিদর্শন করেছি। এ সময়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। তারা গত অক্টোবরে রাখাইনের বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের লোকদের হাতে ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ফলে তারা দেশের দুর্গম এলাকাগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তারা এমন সব স্থানে বসবাস করছেন যা সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী। সেখানে নৌকায় করে পানীয়জল সরবরাহ করে এনজিওগুলো। সপ্তাহে একদিন সকালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। অন্য সময়ে যদি কারো মেডিকেল সহায়তার দরকার হয় তাহলে তাকে এই আশায় বসে থাকতে হয়- কখন এনজিও’র কর্মীরা নৌকায় করে গিয়ে তার কাছে যাবেন। অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় বসবাস করার কারণে এখানকার অধিবাসীরা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়েন। দু’ঘণ্টা নৌকায় করে ভ্রমণের পর আমি পৌঁছি পাকতা এলাকায়। সেখানে ইউএনএইচসিআর-এর সমর্থনে একটি আশ্রয় ক্যাম্পে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী ওই ক্যাম্পে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পায়খানা। শিশুরা প্রচণ্ড গরম থেকে শীতলতা পাওয়ার জন্য গোসল করছে যেসব স্থানে সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে সেই  পানিতেই ভাসছে মরা ইঁদুর। আক্রান্ত হওয়ার আগে রোহিঙ্গা সমপ্রদায়কে বাজার থেকে এবং চাকরির সুবিধা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এতে তাদেরকে এক বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। বার্মার লোকজন যেসব স্থানে কাজ করে এবং ব্যবসা করে সেখানে এসব রোহিঙ্গার চলাফেরা নিষিদ্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাজ্য সহ কিছু দাতা সরকার এসব মানুষকে কিছু মৌলিক সেবা দিয়ে সহায়তা করছে। কিন্তু তা তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। যেসব রোহিঙ্গাকে আমি দেখেছি তারা সমুদ্র তীরের এত কাছে ফিলফিলে পাতলা তাঁবুতে বসবাস করে যে, বর্ষা ঋতুতে তাদের টিকে থাকার কোন পথ আছে, ঘূর্ণিঝড় তো দূরের কথা। এখন তাদেরকে উদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ চলছে। কিন্তু আগামী কয়েক মাসে তারা তাতে নিরাপদ ঠিকানা খুঁজে পাবে না। সফরের সময় আমাকে বলা হয়েছে, উঁচু স্থানে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণে কমপক্ষে দু’মাস সময় লাগবে। এক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ দিতে বিলম্ব করছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাখাইনদের কট্টর অবস্থানকে দমন করা হতে পারে। এতেই সরকার রোহিঙ্গা সমপ্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিচ্ছে না- এ চিত্র ফুটে উঠে। এসব মানুষকে সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তাকারী এজেন্সিগুলোও বাস্তব অর্থে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। সরকার ক্যাম্পগুলোকে বিচ্ছিন্ন  করে শুধু আদর্শগত সমস্যাই সৃষ্টি করছে না একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রাণ সহায়তাকারীদের সফরের অনুমতি দিতে এবং ভিসা দিতে মারাত্মক বিলম্ব। সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো- ত্রাণ সহায়তাদানকারী এজেন্সিগুলোকে রাখাইন বৌদ্ধ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা হুমকি দিয়েছেন। এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে সরকার যেসব এলাকায় এ রকম হুমকি দেয়া হয়েছে ত্রাণকর্মীদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো আমাকে বলেছেন, গত অক্টোবরে তারা কিভাবে তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। তারা বলেছেন তাদের কষ্টের কথা। তাদের বেশির ভাগই ঘরে ফিরতে চান। কিন্তু সেক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া তারা ভীষণ ভীত। তারা উদ্বিগ্ন এই জন্য যে, এপ্রিলজুড়ে মানুষজনকে উঁচু স্থানে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পগুলোতে ‘যথার্থতা যাচাই’ পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা বাঙালি এমনটা জোর করে আবেদনপত্রে স্বীকার করতে বাধ্য করানোর চেষ্টা হয়। এতেই কর্তৃপক্ষের ওপর অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে। গত বছর নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এই সমপ্রদায়ের ওপর হামলা করেছে অথবা হামলাকারীদের রেহাই দিয়েছে। এতে কর্তৃপক্ষের ওপর তাদের অনাস্থা অনেক বেশি। লোকজন আমাকে বলেছেন, তাদেরকে কখনও বাড়িঘরে ফিরে যেতে অনুমতি দেয়া হয় না। কারণ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেখানে মুসলিম-মুক্ত এলাকা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গা নারীদের একটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনার সময়ে যেসব পরিবার তাদের সদস্যদের হারিয়েছেন তাদের কাহিনী শুনেছি। তাদের কেউ ৭, ৮, ৯ জন পর্যন্ত প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। এসব কাহিনী শোনার পর আমি বিস্মিত হইনি যে, ঘূর্ণিঝড়ের মুখেও রোহিঙ্গারা এলাকা না ছাড়তে একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। তারা এতটাই হতাশ যে, কাকে বিশ্বাস করতে হবে এবং তাদের পরবর্তী গন্তব্য কি তার কিছুই তারা জানেন না। একজন নারী তার পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, আমার পুরো পরিবার সহ সবকিছু হারানোর পরই সরকার আমাকে এদেশের রোহিঙ্গা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। কারণ, আমি রোহিঙ্গা মুসলিম। তাই এখন আমি মরার মতো বেঁচে আছি। রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ মানবিক সহায়তা দিতে বার্মিজ সরকারের ওপর অবশ্যই চাপ সৃষ্টি করতে হবে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারকে। রাখাইন রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন রাখার বিরুদ্ধে হতে হবে সেই চাপ। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার মতো নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাদেরকে বার্মিজ নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে হবে।

গতকাল অনলাইন গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘বার্মাস রোহিঙ্গা পিপল: এ স্টোরি অব সেগ্রেগেশন অ্যান্ড ডেসপারেশন’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ।

রুশনারা আলী: সিলেটে জন্মগ্রহণকারী বৃটিশ লেবার দলের এমপি। তিনি বৃটেনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো এলাকার এমপি। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক ছায়ামন্ত্রী।

সৌজন্যে: দৈনিক মানবজমিন

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 17 =

আরও পড়ুন