বিচারহীনতার সংস্কৃতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ


বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে “বিচারহীনতার সংস্কৃতি” একটি বহুল আলোচিত বাস্তবতা। কোনো অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী যখন তার রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে শাস্তি এড়িয়ে যায়, তখন সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি শুধু আইনের শাসনকে দুর্বল করে না, বরং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থার তীব্র সংকট তৈরি হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু ঘটনায় কার্যকর বিচার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে বহুদিন যাবৎ। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণা আজ প্রতিষ্ঠিত যে, “ক্ষমতাবানদের বিচার হয় না”।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারহীনতার শেকড় বহু পুরোনো। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দলীয়করণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা ধীরে ধীরে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যেখানে অপরাধের চেয়ে অপরাধীর পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর অনেকগুলোরই সুষ্ঠু বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে গেছে। এতে অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শনের মনমানসিকতা তৈরি হয়েছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা সামাজিক সহিংসতার বহু ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হয় না, সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, আবার কখনো রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের কারণে মামলা প্রত্যাহার করা হয়। সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার উল্লেখ করেছে যে বিচারহীনতার কারণেই অনেক অপরাধ পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, অর্থনৈতিক খাতেও বিচারহীনতার প্রভাব গভীর। ব্যাংক লুটপাট, ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থপাচার কিংবা শেয়ারবাজার ধসের মতো ঘটনায় জড়িত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়িয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং সুশাসনের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন বড় অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন ছোটখাটো দুর্নীতিও সমাজে স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিও অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের সংজ্ঞা ও বিচার প্রক্রিয়ার পরিবর্তন সাধারণ মানুষকে হতাশ করে তুলছে। বিরোধী দলের লোকজনের দ্বারা সংঘঠিত অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের দ্বারা সংঘঠিত একই ধরনের অন্যায় অপরাধের বিষয়ে নমনীয়তা বা নীরবতার অভিযোগ বহুদিনের।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই অবনতির দিকে ঠেলে দেয় না; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। যখন মানুষ দেখে অপরাধ করেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব, তখন সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। ফলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের মতো মৌলিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও জবাবদিহিতার অভাব বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বাগ্রে আইনের শাসনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তদন্ত সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব, সাক্ষী সুরক্ষা, দ্রুত বিচার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে সহিংসতা ও অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন জনগণের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে শুধু আইন দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয়। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই যেন বিচার পাওয়ার প্রধান ভিত্তি হয়—এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পাশাপাশি যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠাই হতে পারে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের প্রধান শর্ত।
সাত বছর বয়সী একটি শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর একজন পিতার মুখ থেকে যখন বেরিয়ে আসে—“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার দিতে পারেন না”—তখন সেটি শুধু একজন শোকাহত বাবার আর্তনাদ নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে নানা আলোচিত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম কিংবা আর্থিক অপরাধের ঘটনায় দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদন্ত ও বিচার বিলম্বের অভিযোগ মানুষের মনে হতাশা তৈরি করেছে। ফলে অনেকেই মনে করেন, বিচার হয় বেছে বেছে, আর ক্ষমতাবানরা প্রায়ই আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যায়। এই বাস্তবতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও গভীর করে।
বিশেষ করে শিশু নির্যাতন ও নারী সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যায়। অপরাধীরা সাহস পায়, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। একজন বাবা যখন বিচার চাইতেও অনীহা প্রকাশ করেন, তখন বুঝতে হবে সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থার সংকট।
তবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি হতাশা যতই থাকুক, ন্যায়বিচারের দাবি ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাজের জন্য শুভ নয়। কারণ বিচারহীনতা শেষ পর্যন্ত অপরাধকেই শক্তিশালী করে। তাই প্রয়োজন—
* নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত,
* রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত বিচার,
* সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা,
* শিশু নির্যাতন মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বৃদ্ধি,
* এবং অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকে বিচার করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি শুধু উন্নয়ন বা অবকাঠামোতে নয়; মানুষের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো—ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী

















