বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বদলে বিষধর সাপ ও কুমির ছাড়ার কথা কেন ভাবছে ভারত?


বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ-চোরাচালান ঠেকাতে এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ভারত। যেসব এলাকায় ভৌগোলিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ হিসেবে কুমির ও বিষধর সাপ মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে দেশটির সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ)।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বিষয়ে গত ২৬ মার্চ বিএসএফ সদর দপ্তর থেকে একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সেখানে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ইউনিটগুলোকে নদীমাতৃক এলাকাগুলোতে হিংস্র সরীসৃপ মোতায়েনের ‘সম্ভাব্যতা’ যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সরাসরি নির্দেশনায় এই পরিকল্পনার ওপর কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার ইতোমধ্যে কাঁটাতারের আওতায় এসেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। বিশেষ করে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমি হওয়ায় সেখানে বেড়া দেওয়া প্রায় অসম্ভব। বিএসএফ-এর দাবি, এই ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়েই সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ ও অপরাধ সংঘটিত হয়।
এদিকে, এই পরিকল্পনা জানাজানি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা একে ‘বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স’ বা প্রকৃতির মাধ্যমে মানুষের ওপর সহিংসতা হিসেবে দেখছেন।
গবেষক অংশুমান চৌধুরী এবং অ্যাক্টিভিস্ট হর্ষ মান্দারের মতে, সাপ বা কুমির কখনো অনুপ্রবেশকারী আর সাধারণ নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না। এটি মূলত সীমান্ত সংলগ্ন বাঙালি মুসলিম এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করার একটি অপকৌশল। আইনি প্রক্রিয়ার বদলে প্রাণঘাতী প্রাণীদের মাধ্যমে মানুষকে দমনের এই চেষ্টা চরম নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কুমির বা সাপগুলো যদি ওই অঞ্চলের স্থানীয় না হয়, তবে তারা দ্রুত মারা যাবে। অন্যদিকে, বন্যার সময় এই বিষধর সাপগুলো লোকালয়ে বা মাছ ধরার এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি চরমভাবে বাড়বে। এটি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকেও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন মেক্সিকো সীমান্তে একই ধরণের চিন্তা করেছিল বলে গুঞ্জন আছে, তবে আধুনিক বিশ্বে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্তে বন্যপ্রাণীকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের নজির নেই। ফ্লোরিডার ‘অ্যালিগেটর অ্যালকাট্রাজ’ ডিটেনশন সেন্টারটির কথা উল্লেখ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সীমান্ত সুরক্ষার নামে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
এছাড়া বিএসএফের অনেক কর্মকর্তাই ব্যক্তিগতভাবে এই পরিকল্পনার কার্যকরিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তবে সদর দপ্তরের নির্দেশে বর্তমানে এর মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা চলছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্তে এমন শিকারি প্রাণী ব্যবহারের নজির বিশ্বের আর কোন দেশে নেই। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার সীমান্তে সাপ বা কুমিরভর্তি পরিখা খনন এবং মানুষের পায়ে গুলি করার প্রস্তাব করেছিলেন বলে জানা গিয়েছিল, যদিও পরে তিনি একে ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দেন।
উৎসঃ আলজাজিরা।
















