“বঙ্গবন্ধু উনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীরে, তোর নাম কী?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘জি, রণবিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, তাতু’। শুনে উনি হেসে বললেন, ‘তোর অত বড় নাম আমি মনে রাখতে পারব না, তোকে আমি তাতু বলেই ডাকবো’।”

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং দুঃসহ ১৫ আগস্ট

fec-image

Twenty one is that dreaded phase
When big decision come a-knocking
At your door.
from ‘On being 21’ by Aynusha Ghosh.

তখন আমার বয়স সবে একুশ বছর। বাড়ি রাঙামাটি, তবলছড়ি, পড়াশুনা করি রাঙামাটি সরকারি কলেজে। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তুমুলভাবে জড়িয়ে রয়েছি। দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এ অঞ্চলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকলে জন অসন্তোষ ক্রমে ক্ষোভে রূপ নিচ্ছিল। জেনারেল ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রæতই পাল্টাতে থাকে। চলমান ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টি রেখে তখন আমরা রাঙামাটিতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকি। বলে রাখা ভালো, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম একটাই জেলা আর জেলার সদরদপ্তর রাঙামাটিতে। ঐ সময় জেলা প্রশাসক ছিলেন এইচ. টি. ইমাম, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। বলতে হয় মার্চ হতেই সিভিল প্রশাসনের উপর পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় শিথিল হয়ে পড়ে; সবাই তখন ধানমন্ডির ২১ নম্বর বাড়ির দিকে তাকিয়ে; বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার অপেক্ষায়। আমরা এইচ. টি. ইমাম সাহেবের সংগে যোগাযোগ রাখতাম। তিনিও আমাদের খোঁজখবর নিতেন। প্রয়োজনে তবলছড়িতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অফিসে খবর পাঠাতেন। তখন টেলিফোনে যোগাযোগের সুযোগ অনেকটা সরকারি অফিসেই সীমাবদ্ধ ছিল। এইচ. টি. ইমাম সাহেব আমাদের ঢাকায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি জানাতেন, পরামর্শ দিতেন। ওনার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল সার্বক্ষণিক।

প্রস্তুতি পর্ব ও প্রথম প্রতিরোধের দিনগুলি

৮ মার্চ তারিখে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি সম্প্রচারিত হয়। সেই কালজয়ী ভাষণটি শোনার পর সংগ্রামের চরম ক্ষণটি এলো। এটা আমাদের ভেতরে কীভাবে সঞ্চারিত হবে, সেটা নিয়ে কেমন এক শিহরণ, রোমাঞ্চ অনুভব করি। আর বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি। এইচ. টি. ইমাম সাহেব আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। পুলিশের একজন এসপি ছিলেন বাঙালি, যার নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তিনিও যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন। পুলিশের মাধ্যমে আমাদের ২০-৩০ জনের একটা দলের সীমিত পরিসরে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ হয়েছিল। প্রশিক্ষণটা হয়েছিল ক্লাস কোয়ার্টারের টেনিস গ্রাউন্ডে। প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপাশি আমরা আশপাশের এলাকার খবরাদি তথা আন্দোলন, সাংগঠনিক তৎপরতা, যুদ্ধ প্রস্তুতি ইত্যাদি জানার চেষ্টা করতাম। কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনায় বেশ বড় একটা দল সক্রিয় ছিল। খাগড়াছড়ি তখন নিছক একটা গ্রাম মাত্র, সাব-ডিভিশন হওয়ায় রামগড়ই ছিল যাবতীয় কর্মকাÐের কেন্দ্রবিন্দু। যোগাযোগ করে জানলাম ওখানেও সুলতান মিঞার নেতৃত্বে একটা দল মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাঙামাটিতে সৈয়দুর রহমান, হাজী নওয়াব আলী প্রমুখেরা নেতৃত্বে ছিলেন। ছাত্র ও তরুণ হওয়ায় আমাদের উচ্ছ¡াস ছিল আকাশচুম্বী।

ঐসময় আমরা বেশিরভাগ সময় তবলছড়িতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অফিসেই সময় কাটাতাম। রাতেও তাই। ২৫ মার্চ রাত ১টা নাগাদ অফিসে বসেই খবর পাই ঢাকা আক্রান্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পিলখানা, রাজারবাগ প্রভৃতি জায়গায় নিরপরাধ মানুষকে আক্রমণ করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে দিয়েছে। না বললেই নয় তখন আমরা বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠান খুব শুনতাম এবং বিবিসির বাংলা সার্ভিসের মাধ্যমে প্রকৃত খবরাখবর জানতে পারতাম। ২৫ মার্চের গণহত্যার সংবাদ প্রাপ্তির পরই ভাবতে থাকি- এবার নিরুপায়, প্রতিরোধের বিকল্প নেই। রাঙামাটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রবেশ যে করেই হোক ঠেকাতে হবে। কীভাবে প্রতিরোধ করতে পারি, আমরা তখন রাস্তা কেটে ফেলার পরিকল্পনা আঁটলাম। এইচ. টি. ইমাম সাহেবকে বলি, ‘স্যার আমরা ঘাগড়া যাচ্ছি রাস্তা কাটতে। রাতেই এক বাস ও এক ট্রাক ভর্তি লোক আর শাবল, কোদাল, খন্তা নিয়ে ঘাগড়া চলে যাই। সারারাত ধরে রাস্তা কেটে চাটগাঁর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। আর কী করা যায়? রাস্তার পাশেই সিএন্ডবির ইন্সপেকশন বাংলোর নিচে ছিল বিশাল এক বটগাছ। সেটাকে কেটে রাস্তায় শুইয়ে দিলাম। সেই কর্তিত বটের গোড়ার অংশটা এখনো যথাস্থানে বিদ্যমান। সকাল হয়। রাস্তা বøক করেও মনের খচখচানি দূর হয় না। ভাবি, এ কি যথেষ্ট! এভাবে কি পাকিস্তানি হানাদারদের ঠেকানো সম্ভব! মনের ভেতরে সে প্রশ্ন নিয়ে আবার রাঙামাটিতে ফিরে আসি।
রাঙামাটি ফিরে পুনরায় এইচ.টি.ইমাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করি। ওনার কাছে জানতে চাই, ‘স্যার, আমরা আর কী করতে পারি?’ তিনি আমাদের পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আর চাটগাঁর দিক হতে সেনাবাহিনী আসছে কিনা তা লক্ষ রাখার পরামর্শ দেন। ওনার পরামর্শানুসারে আমরা ঘাগড়া পাহাড়ের উপরে লোক বসিয়ে দিলাম, আর রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কোনো আর্মি কনভয় ঢুকে পড়ছে কিনা সেদিকে দিনে-রাতে নজর লাগিয়ে রাখলাম। ২৫ মার্চ এর পর বর্ডার বেল্টে ইপিআরে যেসব বাঙালি সদস্য ছিল তারাও পাকিস্তানিদের হত্যা করে রাঙামাটিতে জড়ো হতে থাকে। ক্যাপ্টেন রফিক সাহেবের (মেজর রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম) সঙ্গে এইচ. টি. ইমাম সাহেবের যোগাযোগ ছিল বোধ করি। তিনি চাটগাঁ থেকে ইমাম সাহেবকে ইপিআরের সদস্যদের ফ্রন্ট লাইনে লাইনে পাঠানোর অনুরোধ করেন। আমরা আলম ডক ইয়ার্ডে তাদের জন্য খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেছিলাম। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের এমপি। তিনিও এসব কাজে প্রভূত সহযোগিতা দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী ঐসব ইপিআরের সদস্যদের জন্য খাওয়া-দাওয়ার নিয়ে আমরা হাটহাজারী পর্যন্ত চলে যেতাম, আবার ফিরে আসতাম। পাকিস্তানিরা তখনো চট্টগ্রাম সেনানিবাস হতে বের হয়নি। এদিকে ইমাম সাহেব ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম ছোট্ট একটা দল পাঠালেন। ঐ দলে আমার বন্ধু শুক্কুরসহ কামাল, ইফতেখার, শফিক, আবুল কালামসহ প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন।

এর মধ্যে রাঙামাটিতে পাকিস্তানি সেনারা চলে আসে। আমরা সবাই পরবর্তী কর্তব্যকর্ম স্থির করার জন্য নিরাপদ স্থানে সরতে থাকি। আমি মহালছড়ি ফিরছিলাম, পথিমধ্যে প্রশিক্ষণ শেষে ভারত থেকে ফিরে আসা দলটির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ওরা রাঙামাটি যাচ্ছিল। ওদেরকে বলি, ‘পাকিস্তানি সেনারা রাঙামাটি অবস্থান নিয়ে ফেলেছে, সতর্ক থাকিস।’ ওদের সঙ্গে ছিল মাত্র একটি কি দুটি কারবাইন। ওই দেখিয়ে বললো, ‘ভয় পাস না, কিচ্ছু হবে না।’ পরে শুনি, ডিসি বাংলোর পেছনে পাকিস্তানিদের হাতে ওরা সবাই ধরা পড়ে এবং শহীদ হয়। শুধু আবুল কালাম মাঝির ছদ্মবেশ নিয়ে বিস্ময়করভাবে বেঁচে যায়। মাত্র কিছুদিন হলো তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

প্রথম সম্মুখ সমর ও ক্যাপ্টেন কাদেরের বীরত্বময় শাহাদাৎ

মহালছড়িতে ফিরে যেসব সহযোদ্ধার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের, প্রভুদান চৌধুরী, সুবিলাস চাকমা, শওকত (পরবর্তীতে যিনি আর্টিলারিতে মেজর শওকত) প্রমুখ। ক্যাপ্টেন কাদের আমাদের আর ওই খানকতক অস্ত্র নিয়ে ওখানেই ডিফেন্স তৈরি করেন। ২৭ এপ্রিল আমরা রাঙামাটির দিক থেকে আগমনরত লঞ্চের শব্দ শুনি এবং শব্দটা ক্রমশ নিকটবর্তী হচ্ছিল। আমরা অনুমান করি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওই লঞ্চে করে এদিকেই আসছে। তাদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমরা ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বে মহালছড়ি থানার উপরে এখন যে শশ্মান রয়েছে ওখানে পজিশন নিই। পজিশনরত অবস্থাতেই হঠাৎ পূর্ব পাশ তথা সিংগিনালার দিক হতে ব্রাশফায়ার শুরু হয়। আমরাও আমাদের সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ করতে থাকি। ওদের সঙ্গে মিজো বিদ্রোহীরাও ছিল। পাক আর্মি ওদের সামনে রেখেছিল। বুঝতে পারি, ওদের ব্যাপক লোকবল আর ভারী অস্ত্রের মুখে আমাদের পক্ষে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব নয়। একসময় আমরা প্রায় ঘেরাও হয়ে পড়ি। ক্যাপ্টেন কাদের তখন আমরা যাতে নিরাপদে সরে যেতে পারি তার জন্য ঝুঁকি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে গিয়ে শত্রæ সেনাদের উপর গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। একসময় ওদের মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারে ক্যাপ্টেন কাদেরের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় এবং স্পটেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন শওকত বলেন যে, ওদের মেশিন গান আর যেসব অস্ত্র রয়েছে, তাতে আমাদের এই থ্রিনটথ্রিতে কিচ্ছু হবে না, বরঞ্চ রিট্রিট করাই সমীচীন হবে। ক্যাপ্টেন কাদেরের লাশটা গাড়িতে তুলে নিয়ে শওকত খাগড়াছড়ি হয়ে রামগড়ের দিকে চলে যান। ক্যাপ্টেন কাদেরকে ওখানেই দাফন করা হয়; আর পরে আমরাও পায়ে হেঁটে সিন্দুকছড়ি রোড ধরে রামগড় পৌঁছে যাই।

গেরিলা যুদ্ধের দিনগুলি, দেরাদুন যাত্রা ও প্রশিক্ষণ

রামগড়ে অবস্থানকালে মে মাসের দুই তারিখে শুনতে পাই যে, মিজোদের একটা গ্রæপ রামগড়ের দিকে আসছে। আর ফটিকছড়ির হেয়াকো দিয়ে আসছে পাকিস্তানি আর্মির একটা দল। উদ্দেশ্য দু’দিক থেকে আমাদের আক্রমণ করা। লেফটেন্যান্ট মেহফুজের নেতৃত্বে আমরা তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব সত্তে¡ও সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কোনরকমে টিকে থাকতে পারি। এইচ. টি. ইমাম সাহেবও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাঙামাটি আসার আগেই ত্রিপুরায় চলে এসেছিলেন। এসব প্রশিক্ষণের উদ্যোগ ও যোগাযোগ উনার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল। মাসখানেকের একটা প্রশিক্ষণ আমাদের হয়েছিল। প্রশিক্ষণ শেষে দল গঠন করি। দলে হেমদা, কালাচাঁদ প্রমুখ ছিলেন। সেই দল নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে রামগড়ের উপরে বৈষ্ণবপুরে বেজ ক্যাম্প স্থাপন করে পাকিস্তানি আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে ছোট ছোট চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতে থাকি। আমাদের কৌশল ছিল হিট এন্ড রান। এধরনের জঙ্গলযুদ্ধে আমরা বেশ খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলাম। কেননা, প্রতি ইঞ্চি জায়গা আমাদের নখদর্পণে। আর ওদের কাছে পুরো জায়গাটা একেবারেই আনকোরা ও অপরিচিত। আমরা সর্বশেষ ক্যাম্পটা করেছিলাম মানিকছড়ির গাড়িটানায়। বৈষ্ণবপুর থেকে গাড়িটানার মাঝখানে ওদের যে ক্যাম্পগুলো ছিল ওগুলোতে ‘হিট এন্ড রান’ কৌশলে আমরা ওদের ব্যতিব্যস্ত রাখতাম। দেখা যেত কী আমরা একটা গুলি ছুড়লে ওরা কয়েকশ গুলি ছুড়তো। ততক্ষণে আমরা পগার পার। ওদের পাতাছড়ায় একটা ক্যাম্প ছিল। আমাদের আক্রমণে বাধ্য হয়ে ওরা একসময় ক্যাম্পটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

মানিকছড়ির বাটনাতলীতে মুজাহিদদের ক্যাম্পে একটা অপারেশন চালিয়েছিলাম। ওরা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী ও বেতনভুক্ত। রাতে পাহাড়ের ওপরে পজিশন নিয়ে আমরা ঐ ক্যাম্পে আক্রমণ করি। পরে শুনেছি, সাত কী আটজন মুজাহিদ মারা গিয়েছিল। বাটনাতলীর ঐ অপারেশনের আগে মনি ভাই (শেখ ফজলুল হক মণি) আমাকে ভারত থেকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে লিখেছিলেন যে, আমাকে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে হবে। চিঠি পেয়ে আমি আগরতলা যাই। তখন ওখানে গিয়ে দেখি রাজ্জাক ভাইও (আব্দুর রাজ্জাক) উপস্থিত। তখনো উনার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। ইউসুফ ভাই (এস.এম ইউসুফ) আমাকে ওনার সামনে নিয়ে গিয়ে বলেন, ‘রাজ্জাক ভাই, এ হলো তাতু’। রাজ্জাক ভাই বললেন, ‘মনি ভাইয়ের কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি। তোমাকে দেরাদুনে প্রশিক্ষণে যেতে হবে’।

দেরাদুনে ঐ প্রশিক্ষণে আমার সঙ্গে প্রভুদান চৌধুরীও ছিলেন। বস্তুত ঐ প্রশিক্ষণটার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করা। আমরা যখন দেরাদুনে পৌঁছি তখন বিএলএফের একটা ব্যাচের প্রশিক্ষণ প্রায় শেষ। আমরা পরের ব্যাচ। ওখানে গিয়ে ইনু ভাইকে (হাসানুল হক ইনু) দেখি। ইনু ভাই তখন প্রশিক্ষণ শেষে পুরোদস্তর ইন্সট্রাক্টর বনে গিয়েছেন। উনি আমাদেরও ইন্সট্রাক্টর ছিলেন। এছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর মালহোত্রা, মেজর চৌহান, কর্নেল পুরকায়স্থ প্রমুখ আমাদের ইন্সট্রাক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভারতের স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান আমাদের এই বিশেষ বাহিনীর (বিএলএফ) প্রশিক্ষণ প্রভৃতির দায়িত্বে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার নেতৃত্বাধীন ব্রিগেডটির নাম ছিল ২২২ মাউন্টেন ব্রিগেড আর এর হেডকোয়ার্টার ছিল দেমাগ্রীতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হানাদার মুক্তকরণে মিত্রবাহিনীর অধীনে এই ব্রিগেডটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। বলতে হয়, জেনারেল উবান একজন জ্ঞানী ও অতি দক্ষ সেনানায়ক ছিলেন। কিন্তু তখন অবসরে। তার দক্ষতার কারণে আবার ফোর্সে ফিরিয়ে আনা হয়। তার অধীনে পরিচালিত সেই প্রশিক্ষণে আমি ওয়্যারলেস অপারেশন, ম্যাপ রিডিং, রিকোয়েললেস রাইফেল চালানো ইত্যাদি জানতে পারি।

দেরাদুনে প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে দেশে ঢুকে আবার বিভিন্ন জায়গায় অ্যাকশনে নেমে পড়ি। যোগ্যছোলায় একটি অ্যামবুশের কথা মনে পড়ে। মানিকছড়ি রাজবাড়ি দখলে নিয়ে পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প বসিয়েছে। মং রাজা মং প্রু সাইন বাবু তখন ত্রিপুরায়। রাজবাড়ি থেকে তারা মাঝে মাঝে পেট্টোলিংয়ে বেরুতো। এরকম একদিন মং রাজার ঘোড়ায় চড়ে তারা যাচ্ছিল। আমরা সুযোগমত জায়গায় ওত পেতে ওদের আক্রমণ করি। সামনাসামনি গুলি বিনিময় হয়। গুলি খেয়ে একজনকে ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে দেখি। পরে জানতে পারি, পড়ে যাওয়া লোকটি ছিল ক্যাপ্টেন। যোগ্যছোলায় সেমুতাং গ্যাসফিল্ডের লোকজনও আমাদের বেশ সহযোগিতা করেছিলেন। মাইনিংয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য ওদের কাছে যে এক্সপ্লোসিভগুলো ছিল সেগুলো তারা আমাদের দিয়েছিল। এক্সপ্লোসিভগুলো আমাদের খুব কাজে লেগেছিল। রাজবাড়ির ক্যাম্পে পাকিস্তানি আর্মি গাছের ওপর ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করেছিল। আমরা পয়েন্ট টু টু রাইফেল দিয়ে ওয়াচ টাওয়ার লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তাম। পয়েন্ট টু টু রাইফেলের সুবিধে ছিল শব্দ হয় কম, কিন্তু অনেক দূর থেকে লক্ষ্যভেদ করা যায়। পর পর দুজনকে গুলি করে ফেলে দেওয়ার পর দেখতাম ওরা আর ওয়াচ টাওয়ারে উঠতোই না।

শত্রু মুক্ত রামগড় ও বিজয়ের চূড়ান্ত ক্ষণ

দেশের ভেতরে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে চালাতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যুদ্ধ পুরোদস্তরভাবে শুরু হয়ে যায়। তখন মিত্র বাহিনীর কমান্ডের আদেশে আমরা ত্রিপুরায় ঢুকে ফাস্ট ডিফেন্স লাইন তৈরি করি। ফেনী নদীর এপারে পাকিস্তানি আর্মি আর ওপারে আমরা। ডিসেম্বরের ৭ তারিখ আমাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মিত্র বাহিনীর ফাইটার প্লেন ওদের গান পয়েন্টে বোমা ফেলে। পরদিন অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর খুব ভোরে আমরা বুঝতে পারি, বাগান বাজারে ওদের যে দুটি বড় গান ছিল সেগুলি ধ্বংস হয়েছে। আর ওরা ওখান হতে পালিয়েছে। আমরা নদী পেরিয়ে রামগড়ে প্রবেশ করি। ওরা অসংখ্য বাংকার খনন ও মাইন পুঁতে রেখেছিল। মাইনগুলো সুইপিং করে আমরা রামগড় থানায় উঠি। সহযোদ্ধা দুলালের পকেটে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত একটা পতাকা ছিল। ছোট একটা বাঁশ জোগাড় করে আমরা পতাকাটা ওড়াই। এভাবে রামগড়কে হানাদার মুক্ত করি। তবে আমরা লক্ষ্য করলাম চারিদিকে প্রচুর মাইন, প্রায় হাজার খানেক হবে। সেই মাইনগুলো আমরা নিষ্ক্রিয় করলাম। পরে অবশ্য দূর থেকে লম্বা বাঁশ দিয়ে মাইনগুলো বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে ফেলতাম। ওই মাইনগুলোয় কয়েকটি বিভৎস দুর্ঘটনাও ঘটেছে। একজন মারমা মহিলার কথা মনে পড়ে। মহিলাটি যুদ্ধের সময় পালিয়ে ত্রিপুরায় চয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে আবার ফিরে আসে। বাড়িতে একদিন গাছ থেকে পাকা কলা পাড়তে যায়, সে মুহূর্তেই পুঁতে রাখা মাইনে মহিলার একটি পা উড়ে যায়।

রামগড় থেকে আমরা পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের সহযোগী যারা ছিল তাদের তাড়া করে ফটিকছড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাই। ওখানে তারা শওকতের হাতে পড়ে। শওকত তখন লেফটেন্যান্ট। ওর হাতে ওদের অনেকের প্রাণ বধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর আমরা ফটিকছড়ি থেকে মানিকছড়িতে আসি, আর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়াই। দেশ সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের তপ্ততায়

ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ থেকেই আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, গিয়েছি, বিজয়ী হয়ে ফিরেও এসেছি। কিন্তু তখনো বঙ্গবন্ধুকে চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। এই দীর্ঘকায় ও ঋজু ব্যক্তিকে প্রথম দেখি যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে আমরা অস্ত্র জমা দিতে যাই। তখন আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা কমান্ডার। আমার নেতৃত্বে একটি দল ঢাকা যাই। স্টেজে দূর থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখি, আর ভাবতে থাকি, ওনাকে একবার প্রণাম করার সুযোগ কীভাবে পাই। মনি ভাই আমাকে খুব পছন্দ করতেন। মনের গোপন ইচ্ছেটা কয়েকদিন পর মনি ভাইয়ের কাছে বলেই ফেললাম। উনি একদিন গাড়িতে তুলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু তখন কোথায় যেন বেরুচ্ছিলেন। পরনে সেই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী আর হাতাবিহীন কালো কোট। মনি ভাই আমাকে সামনে নিয়ে বললেন, ‘মামা, এ ছেলেটা মুক্তিযোদ্ধা, তোমাকে সালাম করবে বলে রাঙামাটি থেকে এসেছে’। বঙ্গবন্ধু উনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীরে, তোর নাম কী?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘জি, রণবিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, তাতু’। শুনে উনি হেসে বললেন, ‘তোর অত বড় নাম আমি মনে রাখতে পারব না, তোকে আমি তাতু বলেই ডাকবো’। কাছে গিয়ে পা ছুঁয়ে প্রণাম করি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরবর্তী সাক্ষাৎ ১৯৭৩ সালে রাঙামাটিতে। ওখানে মুক্তিযোদ্ধা যারা ছিলেন তাদের সাথে দলবেঁধে গেলাম উনাকে স্বাগত জানাতে। কী আশ্চর্য, হেলিকপ্টার থেকে নেমেই উনি আমাকে খুঁজতে লাগলেন। তাতু কই? আমি সামনেই ছিলাম, কাছে এগিয়ে প্রণাম করি। আমার সঙ্গে পিন্টুসহ আরো যারা ছিল তারাও এগিয়ে গিয়ে সালাম করলো। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এই তোরা আয়’। আমরা পেছন পেছন চললাম। শহীদ আব্দুর আলী একাডেমী, যেটা এখন পার্ক করা হয়েছে। ওখানেই ছিল সভামঞ্চ। কাছে যেতেই তিনি আমাকে ডাকলেন, বললেন ‘তুই ওঠ, আমার সঙ্গে স্টেজে বসবি’। শুনে আমি কিছুটা বিহŸল আর দ্বিধাগ্রস্ত। তখন আমি বাইশ-তেইশের যুবক মাত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদেশের আড়ালে ¯েœহের এমন এক প্রাবল্য ছিল যে, দ্বিতীয় কোনো পথ না পেয়ে কিছুটা আড়ষ্ট মনে উনার পিছনের সারিতে টুপ করে বসে পড়ি।

বেদনার্ত ১৫ আগস্ট ও কারাবরণ

এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাÐের দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে আর প্রত্যক্ষ দেখাসাক্ষাত হয়নি। তখন আমি কয়েকদিন ধরে ঢাকায়, সাথে ছোট ভাই নব বিক্রমও (নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা) আছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগেরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি টিম মনি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়। ঐ দলে দীপংকর (দীপংকর তালুকদার) আর আমিও ছিলাম। পরদিন বঙ্গবন্ধু জগন্নাথ হলে আসবেন, নর্থ হাউজের সামনে একটা স্মৃতিফলক উন্মোচন করবেন, এরকম কথা আছে। মনি ভাই আমাদের বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন।

আমরা জগন্নাথ হলের ২৩ নম্বর রুমে ছিলাম। রাতটা কাটলো। পরদিন খুব ভোরে কে যেন ভীষণ অস্থির হাতে দরজায় করাঘাত করে ডাকতে লাগলো। দীপঙ্কর আর আমি ধড়মড় করে উঠে দরজা খুলে শুনি ৩২ নম্বরে হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আর নেই। আমাদের কাছে খবরটা উদ্ভট মনে হলো। উল্টো তাকে পাগল সাব্যস্ত করি। সে বলে, ‘বিশ্বাস না হয় রেডিও খুলে শুনো’। রেডিও অন করি। কী আশ্চর্য! বাংলাদেশ বেতার হঠাৎ রেডিও বাংলাদেশ বনে গেল! আর কোন এক মেজর ডালিম বারবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ঘোষণাটি দিয়ে যাচ্ছিল। হৃদয়ের কোণে সূ² তন্ত্রীতে গভীর বেদনা অনুভব করি। ভেতরে গুমরে ওঠা কান্নাটা চোখের কোণে বাষ্প হয়ে ওঠে আসে। মনে হলো, মাথার উপরে থাকা কোনো প্রশান্ত মেঘ অকস্মাৎ উধাও হয়ে গেল।

দেশে তখন মহা এক ভীতিকর পরিস্থিতি। সামরিক আইনের আওতায় প্রতিনিয়ত নানা বিধিনিষেধ আরোপ হয়ে চলেছে। ভয়ে কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করে না। যারা ক্ষমতা নিয়েছিল তাদের মধ্যে অস্থিরতা। ক্যু-পাল্টা ক্যু চলছে। নানারকম গুজব আর গুঞ্জনে সবাই বিভ্রান্ত। এরই মধ্যে রাঙামাটি ফিরে আসি। বড় অসময়ে জাতির জনককে হারানোর কান্না ক্রমে ক্ষোভে ধুমায়িত হয়ে উঠে। গোপনে সংগঠিত হয়ে হত্যাকাÐের প্রতিবাদে তৎপর হয়ে উঠি। এদিক ওদিক যোগাযোগ করি। সঙ্গীদের অনেকেই হয় জেলে নয় আত্মগোপনে। বেশি কিছু করার সুযোগ গেলাম না। একসময় ১৯৭৬ সালের কোনো একদিন রাঙামাটিতে গ্রেফতার হয়ে যাই। গ্রেফতারের পর প্রথম একুশ দিন চট্টগ্রামে টর্চার সেলে রাখলো। এরপর ঢাকায় নিয়ে দু’মাস জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন চালাতে থাকে। নির্যাতনে আমার হাঁটু দোমড়ায়, কোমর ভাঙ্গে। এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। কোনো মামলা ছিল না বলে জেলার সাহেব রাখতে চাচ্ছিলেন না। তখন জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলের কেউ একজন জেলার সাহেবকে আমাকে জেলে সেগ্রেগেশনে রাখার জন্য বাধ্য করেন। সপ্তাহখানেক পর তখনকার ডিসি আলী হায়দার খান সাহেবের স্বাক্ষর সম্বলিত অনির্দিষ্টকাল যাবৎ আটকাদেশের একটি চিঠি আসে। তখন ঐ আদেশের বিরুদ্ধে তিন বছরের আগে রিটও করা যায় না। তিন বছর কাটে। রিট করি। শেষে প্রায় চার বছর পর জেল থেকে ছাড়া পাই।

রণ বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা: সাবেক জেলা কমান্ডার, পার্বত্য চট্টগ্রাম মুজিব বাহিনী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আওয়ামী যুবলীগ ও সিনিয়র সহসভাপতি, খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × five =

আরও পড়ুন