যেকোন সময় পুনর্গঠন হবে জেলা পরিষদ

fec-image

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে। খোদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর ফলে পদ প্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও দৌড়-ঝাপ শুরু হয়েছে। অপর দিকে নির্বাচন ছাড়া দলীয় মনোনীত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ। তবে তিনি পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধান অন্তরায় আঞ্চলিক সংগঠনগুলো এমন দাবি পর্যবেক্ষক মহলের।

অপরদিকে পরিষদগুলোর কতিপয় সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ থাকলেও চেয়ারম্যানরা রয়েছে সরকারের গুডবুকে। ফলে সদস্যদের ক্ষেত্রে যোগ-বিয়োগ হলেও বর্তমান চেয়ারম্যানরাই থাকছেন এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

১৯৮৯ সালের ২৫ জুন নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদ। একজন চেয়ারম্যান (উপজাতি) ও ৩০ জন সদস্য নিয়ে এই পরিষদের যাত্রা। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদটি গঠন হওয়ার কথা ছিল। সময়ের ব্যবধানে স্থানীয় সরকার পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’-এ রূপ লাভ করেছে। কিন্তু স্থানীয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের টানাপোড়েনে আর সরকারের উচ্চ মহলের আন্তরিকতার অভাবে একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার মাধ্যমকে গণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল করা হয়নি আড়াই যুগেরও বেশি সময়ে।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বদৌলতে স্থানীয় সরকার পরিষদের নাম বদল করে রাখা হয় ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’। সে সাথে ৩১ সদস্যের পরিষদ ভেঙ্গে ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমে একজন চেয়ারম্যান (উপজাতি) ও অপর চার সদস্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠিত হয়। সে থেকে নির্বাচন বিহীন ও ফ্যাক্স বার্তায় জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্য পরিবর্তন হওয়ায় সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে আসছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ। প্রথম নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ৬ মাস পর পর আদালতের মাধ্যমে মেয়াদ বৃদ্ধি করা হতো। তবে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন শুরু হওয়ার পর থেকে বলা হচ্ছে পরবর্তী পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিষদ বহাল থাকবে। অর্থাৎ সরকার চাইলে যে কোন মুহূর্তে জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করতে পারবে। এদিকে জবাবদিহিতা না থাকায় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ দুর্নীতির আখরায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখি হলেও কাজের কাজ কোনটাই হয়নি।

বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সংশোধনীতে ৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদকে ১ জন চেয়ারম্যান ছাড়াও ১৪ জন সদস্য নিয়ে জেলা পরিষ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সে আলোকে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কংজরী চৌধুরী, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্য শৈ হ্লা ও রাঙামাটি জেলা পরিষদে বৃষ কেতু চাকমাকে চেয়ারম্যান করে ও প্রত্যেক পরিষদে মোট ১৫ সদস্যের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে স্বাক্ষাৎকারে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো যেদিন থেকে গঠন করা হয়েছে সেদিনের পর থেকেই শুনছি নির্বাচন হচ্ছে, হবে। স্বাভাবিকভাবে আমরা চাই নির্বাচন হোক। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের নিয়োগে সুনির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ নেই। তবে বর্তমানে যেটি চলমান আছে সেটি আমরা ধরে নিই ৫ বছর মেয়াদি। ইতোমধ্যে বর্তমান পরিষদগুলোর ৫ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো নির্বাচনের কিংবা পুনরায় গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সেক্ষেত্রে যেকোনো মুহূর্তে পুনর্গঠন হবে। পরিষদের নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন। তারা যখন মনে করবে জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন করা দরকার তখনই উদ্যোগ নেবে। আমরা চাই জনগণের পছন্দ অনুযায়ী একজন জনপ্রতিনিধি আসুক নির্বাচনের মাধ্যমে। জেলা পরিষদের নির্বাচন হলে জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণ হবে। অন্যান্য নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলার সবার অংশগ্রহণ থাকে। তবে জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে স্থানীয় ভোটার তালিকার মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি রয়েছে। এটা সম্ভব হবে কি হবে না নির্বাচন কমিশন তা ভালো বলতে পারবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একই ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন হয়ে আসছে, কিন্তু জেলা পরিষদের নির্বাচন কীভাবে অন্য প্রক্রিয়ায় সম্ভব আমার জানা নেই।

খাগড়াছড়ি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, এখন পর্যন্ত জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, শীঘ্রই নির্দেশনা পাবেন। কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি জানান, নির্দেশনা পেলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে যোগ্য নেতাদের দিয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকারের ভিশন বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। সরকার রাখলে থাকবো, না রাখলে চলে যাবো।

এদিকে জেলা পরিষদ পুনর্গঠন হচ্ছে এমন খবরে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে পদ প্রত্যাশীদের দৌড়-ঝাপ শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের পদ নিশ্চিত করার জন্য জেলা এবং জেলার বাইরে দলের উচ্চস্তরে যোগাযোগ শুরু করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য জেলা পরিষদ, পুনর্গঠন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − seven =

আরও পড়ুন