রাখাইনে যুদ্ধরত বাহিনীর অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহে মরিয়া বাংলাদেশি সন্ত্রাসী গ্রুপ

fec-image

বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে অবস্থান মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। এ রাজ্যটিতে বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপ নিজেদের দাবি নিয়ে ১৯৫৭ সাল থেকে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। তারা সশস্ত্র হলেও বিদেশী মদদে এখনো তাদের অর্থ সংকট কথা তেমন শোনা যায়নি। বরং তারা তাদের গোত্রদের মাঝে সারাবছর খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। আরএসও ছিল রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন।

আরকান আর্মি (এএ)

আরকান আর্মি (এএ) নামের অপর বিদ্রোহী সংগঠনটি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও ২০১৪ সাল থেকে তারা সক্রিয় হয় বাংলাদেশে-মিয়ানমার সীমান্তে। তারা মগ বা মারমা জাতি গোষ্ঠী। তারা নানাভাবে শক্তি সঞ্চয় করে মিয়ানমার সরকারের সীমান্তরক্ষায় নির্মিত সবকটি অবর্জাভেশন পোস্ট (বিজিপি ক্যাম্প) জান্তা সরকারের বিজিপিকে হটিয়ে দিয়ে মাত্র ১ বছরের মাথায় দখলে নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা জান্তা সরকারের রাখাইনের শহর ও উপ-শহরের অনেক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

সূত্র নিশ্চিত করে এখন মন্ডু জেলা শহর নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হলে জান্তা সরকার আকাশ-নৌ ও স্থল পথে তা প্রতিহত করছে। এখন তুমুল লড়াই চলছে মন্ডু শহরের ৩ দিকে। এর আগে গত ১ বছর ধরে তীব্র সংঘাতে তাড়া খেয়ে জান্তা সরকারের শতশত সৈন্য বিদ্রোহী আরকান আর্মির (এএ) হাতে আত্মসমর্পণ করে। এ ধরণের সংঘাতে টিকতে না পেরে ৫ শতাধিক সশস্ত্র জান্তা সৈন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। যাদেরকে দু’দফায় মিয়ানমার সরকারের হাতে তুলে দেয় বাংলাদেশ সরকার।

সূত্র আরো জানায়, এ সংঘাত আর হানাহানিতে মিয়ানমারের রাখাইনের যুদ্ধরত সরকার ও বিদ্রোহী আরকান আর্মির অনেক সদস্য অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে পালিয়ে বেড়ায় সীমান্তের বনজঙ্গলে। এছাড়া নানা কারণে অর্থ সংকটে পড়ে সীমান্ত চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। যারা গবাদি পশু, ইয়াবা ট্যাবলেট, স্বর্ণ, আইস ও অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশী চোরাকারবারীদের কাছে বিক্রি করে অর্থ সংকট ঘোঁচানোর চেষ্টা করে।

সম্প্রতি তারা নতুন এক ব্যবসায় হাত দিয়েছে। আর তা হলো, বিদেশী অস্ত্র-গোলাবারুদ। গত সোমবার (১ জুলাই) সকালে মিয়ানমারের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছ থেকে বোটে করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ হয়ে রামুর একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে অস্ত্র নিয়ে আসার সময় টেকনাফে পুলিশের হাতে ধরা পড়া পাচারকারী। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় জার্মিনির তৈরী ১টি জি-থ্রি রাইফেল, ২টি ম্যাগজিনসহ ৫০ রাউন্ড গুলি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরে জানা যায়, পার্বত্য তিন জেলায় যৌথ অভিযানে উদ্ধার হয়েছে জার্মানির তৈরি এমকে-১১, এইচকে-৩৩, রাশিয়ার তৈরি জি-৩, একে-৪৭, এম-১৬ রাইফেল, নাইনএমএম পিস্তল, চায়নিজ সাব-মেশিনগানসহ অত্যাধুনিক কিছু ভারী অস্ত্র। চায়নিজ সাব-মেশিনগান মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের চাহিদার শীর্ষে জি-থ্রি, এম-১৬ ও একে -৪৭ ও এম ৬০ রাইফেল।

কীভাবে ওই অস্ত্র দেশে ঢুকছে, জানতে চাইলে পার্বত্য জেলাগুলোয় কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমার ও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অস্ত্র কিনছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে ভারতের ২৮১ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের ১৯৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভারত সীমান্তের ১৩০ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হলেও এখনো অরক্ষিত ১৫১ কিলোমিটার। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তের ১৩৩ কিলোমিটার অরক্ষিত এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। বর্তমানে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বেশি ভারী অস্ত্র ঢুকছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে এ প্রতিবেদককে।

পার্বত্য তিন জেলায় জেএসএস-সন্তু লারমা, জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সক্রিয়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চারটি দলের সঙ্গেই মিয়ানমারের বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সাতটি সংগঠনের সখ্য রয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমারের ওই সব সংগঠনের মাধ্যমেই অস্ত্র কিনছে তারা। মিয়ানমারের এসব সংগঠন হলো আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরসা), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (এনইউএ), পিপলস পার্টি অব আরাকান (পিপিএ), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট (এআরআইএফ) ও ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ)।

এছাড়া কক্সবাজার ও বান্দরবানের আরো বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে অস্ত্র-গোলাবারুদ কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যা দিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও লামা আর কক্সবাজারের গর্জনিয়া, ঈদগড়, উখিয়ার কুতুপালং, পালংখালী ও থাইনখালী আর টেকনাফের বেশকয়েকটি পাহাড়ি আস্তানায় সক্রিয় সন্ত্রাসীরা নিজেদের অপরাধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে।

সূত্র বলছে, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে বিদ্রোহী এবং সরকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘাত, হামলা, পাল্টা হামলা এবং ঘাঁটি দখল এবং লুটপাটের পর ভারী অস্ত্রসমূহ চোরাই পথে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের পর কৌশলে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিকট পৌঁছে যায়। এর ফলে অপরাধ প্রবণতা আরো বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টেকনাফ মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিদেশী ভারী জি-৩ রাইফেল, ২টি ম্যাগজিন ও ৫০ রাউন্ড তাঁজা বুলেটসহ একজনকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনায় আরো একজন পলাতক রয়েছে।

সোমবার (১ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৪টায় টেকনাফ মডেল থানার সম্মেলন কক্ষে অফিসার্স ইনচার্জ মুহাম্মদ ওসমান গণি সংবাদ সম্মেলনে জানান, অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ৩ দিনের সাঁড়াশি অভিযানে সকাল পৌনে ৮টার দিকে টেকনাফ মডেল থানার একদল পুলিশ পৌরসভাস্থ ঝর্ণা চত্বর সংলগ্ন আল করম মসজিদের সামনে প্রধান সড়কে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশি করার এক পর্যায়ে সুপারির বস্তাসহ রামু গর্জনিয়ার পূর্ব জুমছড়ির মনির আহমদের ছেলে হেলাল উদ্দিনকে (২৫) আটক করতে সক্ষম হয়। তবে এসময় মহেশখালীর ধলঘাটা পন্ডিতের ডেইলের লোকমান হাকিমের ছেলে মুহাম্মদ জুয়েল রানা (৩৫) পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে কৌশলে পালিয়ে যায়। পরে বাজারে উপস্থিত জনতার সামনে সুপারির বস্তা খুলে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষ কায়দায় লুকানো সিলিংযুক্ত প্লাস্টিকের বাটসহ একটি বিদেশি জি-৩ রাইফেল, (লম্বা ৩৯.৫ ইঞ্চি), ২টি ম্যাগজিন এবং ৫০ রাউন্ড তাঁজা গুলি জব্দ করা হয়। ধৃত আসামী ও পলাতক আসামীরা বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটনের উদ্দেশ্যে বর্ণিত অস্ত্র-গুলি নিজ হেফাজতে রেখে ১৮৭৮ সনের অস্ত্র আইনের অপরাধে টেকনাফ মডেল থানার মামলা নং-০১/৩৫৫, তাং-০১/০৭/২০২৪ইং রুজু করে আদালতে প্রেরণ করেন।

সাম্প্রতিক উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত পয়েন্ট হতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি অভিযানে এসব বিদেশী ভারী অস্ত্র এবং বুলেট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে এসব ভারী অস্ত্র স্থানীয় ও রোহিঙ্গা দুবৃর্ত্ত গ্রুপের হাতে পৌঁছে গেছে। এসব অস্ত্রের মহড়ায় তারা দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এতে বিভিন্ন স্থানে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সূত্র জানায়, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা এলাকাটি ৫৬ কিলোমিটার জুড়ে স্থল সীমান্ত হওয়ায় চোরাকারবারীরা জঙ্গলাকীর্ণ পথ বেয়ে গবাদিপশু, ইয়াবা ট্যাবলেট, স্বর্ণ ও অস্ত্র-গোলাবারুদ সহ সব পণ্য বাংলাদেশে পাচার করছে।

সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ১১-বিজিবি অধিনায়কের প্রতিনিধি তার বক্তৃতায় ইয়াবা ও সিগারেট সহ বিপুল পরিমাণ মিয়ানমারের পণ্য জব্দের তথ্য উপস্থাপন করেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: মিয়ানমার, সীমান্ত উত্তেজনা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন