৮ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত দিবস : রামগড়েই সর্বপ্রথম চালু হয় মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

fec-image

একাত্তরের আজকের এ দিনে পাকহানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে দীর্ঘ ৭ মাস ৬ দিন পর রামগড়ের মাটিতে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। শত্রুমুক্ত হয় বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ ঘাঁটি। মহান মুক্তিযুদ্ধে রামগড়ের ভুমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে রামগড় হাই স্কুল মাঠে খোলা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মুক্তিফৌজের সর্বপ্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ রামগড়েই খোলা হয়। রাঙ্গামাটি পতনের পর ১৩ এপ্রিল পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জেলা সদর সেখান থেকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে আসা হয় রামগড়ে। রামগড়ে এসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জন প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা) এইচ টি ইমাম স্বাধীন বাংলা সরকারের অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেন। ফেনী নদীর উপর কাঠের সেতু নির্মাণ করে ভারতে আনা হয় অস্ত্র গোলাবারুদসহ বিভিন্ন সমরাস্ত্র। এসব অস্ত্রশস্ত্র রামগড় থেকে চাঁদের গাড়ি করে পাঠানো হয় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে।

২রা মে ভোরবেলায় ভারী কামান ও শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চারিদিক থেকে রামগড় ঘাঁটির উপর হামলা চালায় পাকবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেস্টা করে। কিন্তু শত্রুপক্ষের বিপুল সৈন্যসংখ্যা ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রের মুখে বেশীক্ষণ টিকতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা। বিকেল ৫টার দিকে পাকবাহিনী পুরো রামগড় দখল করে নেয়। রামগড় পতনের পর সেক্টর এক এর হেডকোয়ার্টার পুন:স্থাপন করা হয় সীমান্তের ওপারের ভারতের ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমার হরিনায়। এর আওতায় সাবরুমের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ট্রেনিং সেন্টারে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়।

শত্রদের নিশ্চিহ্ন করে রামগড়ের মাটিতে আবার স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর দৃপ্ত শপথ নিয়ে সাবরুমের ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নেয় ১২ বছরের বালক থেকে ৫০ বছরের প্রৌঢ় সবাই। প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের নিয়ে গঠন করা হয় পৃথক পৃথক যোদ্ধা গ্রুপ।

রামগড়ের শত্রুঘাঁটির উপর বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই গেরিলা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করে পাক বাহিনী। ৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ে দখলদারবাহিনীর অবস্থানগুলোর উপর প্রবল বোমা বর্ষণ করে। প্রায় সাত মিনিট বোমা হামলা শেষে বিমান তিনটি ফিরে যাওয়ার সাথে সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সন্মিলিতভাবে কঠোর আক্রমণ চালায় পাকহানাদারদের উপর। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় শত্রুরা। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত পাকবাহিনীর সৈন্যরা ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে আরো দুটি ভারতীয় বিমান পাকঘাঁটির উপর পাঁচ মিনিট বোমা বর্ষণ করে। বিমান থেকে বোমা হামলা আর স্থলে অকুতোভয় বীরযোদ্ধাদের মরণপণ গেরিলা আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে পাক সেনারা। শেষ পর্যন্ত শত্রুরা নিজের প্রাণ বাঁচাতে সদলবলে রামগড় থেকে পালাতে শুরু করে।

৮ ডিসেম্বর বিকেলের আগেই পাক সৈন্যরা সবাই রামগড়ের মাটি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। বিকেল ৪ টার দিকে ভারতের সাবরুমের আশ্রয় শিবির থেকে বিজয় উল্লাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশের মাটিতে ছুটে আসে রামগড়ের মানুষ। রামগড় পোস্ট অফিসের উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 11 =

আরও পড়ুন