রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদযাপনের দাবি

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের সংগঠন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপনের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ও সমতলের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে হবে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও সংষ্কৃতি সংরক্ষণ ও প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর ভাষায় শিক্ষাদান কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে হবে। এ সব দাবি পূরণে শুধুমাত্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নয় বাঙালি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’।

সোমবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শহীদ মিনার চত্ত্বরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পূর্ব সমাবেশে এ সব দাবি তুলে ধরেন বক্তারা।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মাতৃভাষার চেয়ে অন্য ভাষায় জ্ঞানচর্চা করতে গেলে তা বেশি ফলপ্রসু হয় না। একটি সভ্য দেশে প্রত্যেকের নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করা উচিত। আমাদের দেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করা উচিত। এটা তাদের অধিকার। আদিবাসীদের আত্ননিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার তাদের দেওয়া উচিত’।

এ সময় তিনি সমাবেশে উপস্থিত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা যারা গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন রয়েছেন আপনারা আমার এ বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করবেন না। আত্ননিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। এটি মানে হচ্ছে আমি কিভাবে বাঁচতে চাই। আমার শিক্ষা, সংষ্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষার অধিকার আমার রয়েছে। এগুলো নিজেদের মতো করে চর্চা করা আত্ননিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া। রাষ্ট্রকে প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার দিতে হবে’।

তিনি বলেন, ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে তাদের বোঝানো হয়েছে। এই যে আদিবাসী শব্দ নিয়ে, আদিবাসী অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের একটা ফোবিয়া। এই ফোবিয়া থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আদিবাসীদের অধিকারের এ লড়াই ন্যায্য লড়াই। এই অধিকার রক্ষায় অব্যাহত চেষ্টা করে গেলে জয় সুনিশ্চিত হবেই’।

সমাবেশে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘জিয়াউর রহমান পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি নিয়ে গিয়ে যে সংঘাতের অবস্থা সৃষ্টি করেছিলো, এরশাদও পার্বত্য অঞ্চলে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেছিলো। জিয়া ও এরশাদের এই ব্যবস্থাকে অনুসরণ করছে বর্তমান প্রশাসন। জিয়া-এরশাদের সেই পদক্ষেপ নতুন করে বর্তমান প্রশাসন নেওয়ার কারণে পাহাড়ে অশান্তি বেড়েই চলেছে। এই অশান্তির কারণ শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ভূমি অধিকার কমিশন বাস্তবায়ন হয়নি। এর বাস্তবায়ন জরুরি’।

তিনি বলেন, ‘আদিবাসীদের হত্যা ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে, দাবি পূরণে আদিবাসী-বাঙালি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’।

কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আদিবাসীদের দাবি না মানলে তাদের আত্ননিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে না। আমরা যে ৮ দফা বা ১৩ দফা বলছি এটা শুধু আদিবাসী না সারা বাংলাদেশের মানুষের দাবি হওয়া উচিত। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে হবে’।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করতে হবে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। আদিবাসীদের এ অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে সবাইকে’।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং সমাবেশে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি ৮ দফা দাবি তুলে ধরে বলেন, ‘আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্ত প্রায় আদিবাসী ভাষাগুলো পুনরুজ্জীবিতকরণ ও সংরক্ষণে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আদিবাসী শিশুরা যাতে নিজেদের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে সেই লক্ষে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর ১৮, ১৯ ও ২০ নং ধারায় যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্বত্য চুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে এ কমিশনকে কার্যকরি করে তুলতে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও আদিবাসী মণ্ত্রনালয় গঠন করতে হবে’ বলে জানান তিনি।

‘আদিবাসীদের ভাষা ও সংষ্কৃতি রক্ষায় দেশের সব জেলায় আদিবাসী সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে ও একটি আদিবাসী কমিশন গঠন করতে হবে’ বলেও দাবি করেন তিনি।

এ সময় সঞ্জীব দ্রং ‘জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের’ দাবি জানান ও সবাইকে ‘আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার’ আহ্বান জানান।

উজ্জ্বল চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস,  গবেষণা কালেক্টিভের সাধারণ সম্পাদক ও ককাসের টেকনোক্র্যাট সদস্য জান্নাত-এ ফেরদৌসী লাকি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্ত, অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহিন আলম, আশা ইউনিভার্সিটির উপ উপাচার্য ডালেম চন্দ্র বর্মণ, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্রাচার্য প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশ শেষে একটি সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনা করা হয়। শেষে শহীদ মিনার থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আদিবাসী দিবস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =

আরও পড়ুন