রোহিঙ্গাদের রক্ষায় জাতিসংঘের ব্যর্থতা!

fec-image

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। জাতিগত নিধনের ভয়াবহ বাস্তবতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশটি বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও জাতিসংঘের হিসাবে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ এখনও সেখানে থেকে গেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের হিসাব অনুযায়ী, রাখাইনে থাকা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। ২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের জন্য স্থাপন করা হয় আইডিপি ক্যাম্প। তখন থেকেই এই ক্যাম্পে সহায়তা দিয়ে আসছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গা ও কামান জনগোষ্ঠীর প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার সদস্য এসব ক্যাম্পে বসবাস করে। তবে তাদের চলাফেরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে মিয়ানমার সরকার।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাবিরোধী নতুন অভিযান জোরালো করার পাশাপাশি এসব ক্যাম্প বন্ধ শুরুর অঙ্গীকার করে মিয়ানমার সরকার। তবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উল্টো অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও অবনতির দিকে গেছে। জাতিসংঘ এই সামরিক অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বলে আখ্যা দেয়।

জাতিসংঘের দূত গার্ড রোজেনথাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে অনেক জাতিসংঘের পদ্ধতিগত অনেক কারণে অনেক ভুল হয়েছে এবং সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। ৩৪ পৃষ্ঠার ওই অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে তিনি বলেন, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা না নিয়ে বিচ্ছিন্ন কৌশল অবলম্বন করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অনেকেই এই পর্যালোচনাকে স্বাগত জানালেও রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, জাতিসংঘের দূত গার্ড রোজেনথাল কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে দায়ী করেননি। এর পরিবর্তে তারা এটাকে সামগ্রিকভাবে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের অ্যাক্টিভিস্ট নায় সান লুইন বলেন, ব্যক্তিরা তাদের দায়িত্ব পালন করেননি বলে পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে। এই দায় বর্তানো জবাবদিহিতা এড়ানোর জন্য।

মঙ্গলবার ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন (এফআরসি)-এর এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও মিয়ানমারে জাতিসংঘের সাবেক আবাসিক সমন্বয়ক রেনেটা লক দেসালিনের পদত্যাগ দাবি করা হয়। রেনেটা লক ২০১৭ সালের প্রায় শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এফআরসি’র দাবি, ২০১২ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার ছিলেন গুতেরেস। ওই সময় তাকে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে আটক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন মিয়ানমারের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এবং রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়নে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। গুতেরেস প্রকাশ্যে এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও এফআরসি মনে করে তার অনেক কিছু করার ছিল।

বিবৃতিতে এফআরসি লিখেছে, জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায়ে মিয়ানমার নিজেদের আন্তর্জাতিক অপরাধের অভীপ্সা স্পষ্ট করলেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

লোক দেসালিনের বিরুদ্ধে রাখাইনে অসম সহিংসতার আশঙ্কা করা একটি প্রতিবেদন চেপে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এছাড়া রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে বিচ্ছিন্ন করে করে ফেলাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়।

মিয়ানমারের কর্মরত জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, লোক-দেসালিন ২০১৪ সালে একটি বৈঠক থেকে রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কথা বলা থেকে এক কর্মকর্তাকে বিরত রেখেছিলেন। কারণ ওই কর্মকর্তার অবস্থান ছিল দেসালিনের ‘নরম নরম’ প্রবণতাবিরোধী। এছাড়া নেতৃত্বের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন করলে কর্মীরা অপছন্দে পরিণত হতেন এবং অনেকে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকতেন।

লোক-দেসালিনের এক মুখপাত্র ২০১৪ সালের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে কোনও সাড়া দেননি। লোক-দেসালিন এখন ভারতে আবাসিক সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০১৬ সালের শেষ দিক পর্যন্ত মিয়ানমারের মানবাধিকার নিয়ে গবেষণা করা স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিয়েসন জানান, ২০১৭ সালের সহিংসতায় অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলায় জাতিসংঘ আরও নাজুক ছিল। তিনি বলেন, ওই সময় জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করা ছিল বিশৃঙ্খল ধনী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাজ করার মতো। যে পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে অবজ্ঞা করে।

মানবাধিকারকর্মী ও লেখক লিয়াম মাহোনি জানান, রোজেনথালের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এতে করে সমস্যাটি ভুলভাবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রতি বাধ্যতার ক্ষেত্রে খুব ভালো সমন্বয় ছিল। এটা জারি করেছেন আবাসিক সমন্বয়কারী এবং এই বিষয়ে নীরব ছিল জাতিসংঘের সবগুলো সংস্থা।

মাহোনি আরও বলেন, আমি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে স্পষ্ট করে বুঝিয়েছেন যে তারা অং সান সু চিকে রোহিঙ্গাদের কথা তুলে বিব্রত করতে চান না। সু চি চেয়েছেন তারা এটাকে এড়িয়ে যাক এবং তারা এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অং সান সূ চি, জাতিসংঘ, মিয়ানমার
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 11 =

আরও পড়ুন