লকডাউনে আনারস বাজারে ক্রেতাশুণ্যের গুজবে মধ্যস্থভোগীরা এখন লালে-লাল!

fec-image

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা প্রকৃতিগতভাবে উচুঁ-নিচু সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। এসব পাহাড়কে স্বর্ণের খনি মনে করেন কৃষকরা! আধুনিক চাষাবাদ, কৃষিবিদের পরামর্শ ও কৃষকের স্বদিচ্ছায় পাহাড়ে যা ইচ্ছে তাই ফলানো সম্ভব। ফলে এখানকার উঁচু-নিচু টিলা ভূমির পরতে পরতে সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ বা মে-জুন মাসের ফল আনারস। কিন্তু কালের আর্বতে এখন আগাম চাষাবাদে সফলতা পাওয়ায় রসালো ফল আনারস চাষে নজির সৃষ্টি করছে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি-রামগড়-গুইমারা উপজেলার সর্বত্র। আর এই রসালো ফল চাষাবাদে ৩ উপজেলার অন্তত সহস্রাধিক পরিবার কোন না কোনভাবে এ পেশায় জড়িয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন।

গত বছরের ন্যায় এবারও বৈশ্বিক মহামারী করোনার লকডাউনের শুরু হওয়ায় রীতিমতো কৃষকের মাঝে আতঙ্ক নেমে আসে। ফলে তারা লোকসানের আশঙ্কা মাথায় রেখে যে যার মতো করে মধ্যস্থভোগীদের নিকট (পাইকার) বিক্রি করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই সুযোগে প্রতি পিস আনারস ১০-১২ টাকায় কিনে জনপদে লোকসান, লোকসান গুজব ছড়িয়ে হায়-হুতাশ করেন মধ্যস্থভোগীরা, এতে কৃষকরা আরও ভেঙ্গে পড়েন। ফলে পাইকারদের ঘোষিত দামেই গণহারে সকলে ৯০% কৃষক আনারস ক্ষেত বিক্রি করে দেন। এখন লকডাউন স্বত্বেও রোজা এবং তাপদাহের কারণে সমতল ও পাহাড়ে আনারসের গায়ে আগুন ! কৃষকদের কাছে সেই সোনার হরিণ অধরা! মধ্যস্থভোগীরা লালে- লাল!

২১ এপ্রিল সরজমিন প্রত্যক্ষ ও কৃষক এবং মধ্যস্থভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, খাগড়াছড়ির প্রবেশদ্বার পাহাড়-সমতলে ঘেরা মানিকছড়ি, রামগড় ও গুইমারার সীমান্তবর্তী এলাকা জুড়ে বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ের পরতে পরতে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষিবিদের পরামর্শ ও কৃষকের কঠোর সাধনায়’ অবাধে চাষাবাদ হচ্ছে অনেক গুণে গুনান্বিত রসালো ফল আনারস। আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস। যা মানুষের দেহে পুষ্টির অভাব পুরণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, হাড় গঠন, দাঁত ও মাড়ি এবং চোখের সুরক্ষা, হজম শক্তি বৃদ্ধি, রক্ত জমাটে বাধা দেয়াসহ গরমের তীব্রতা নিরসনে শ্রমজীবি মানুষ এই রসালো ফল খেতে বেশ পছন্দ করেন।

ফলে প্রতি বছর এই মৌসুমে রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখানকার আনারসে সয়লাব থাকে। আর আনারস ব্যবসাকে ঘিরে খাগড়াছড়ির এই তিন উপজেলায় সহস্রাধিক কৃষক, শতাধিক পাইকার কোটি কোটি টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং গত বছরে করোনার লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ পুষিয়ে নিয়ে এবার আগে-ভাগেই ক্ষেতে রোগ-বালাই প্রতিরোধ ও ভালো ফলন প্রত্যাশায় পুঁজি, শ্রম, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনূকরণ ও কৃষিবিদের পরামর্শে গাফেলতি করেনি কেউ।  যার ফলে পাহাড়ের পরতে পরতে সারি সারি ক্ষেতে শোভা পাচ্ছে আনারস আর আনারস। টানা ৩-৪ মাস আনারস বিক্রি করে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখেন এখনকার কৃষক ও পাইকাররা।

গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে প্রতি পিস আনারস ক্ষেতে (পাইকারী)বিক্রি হয়েছে গড়ে ১০-১২ টাকা। প্রতি পিস উৎপাদনে খরচ ৬-৭ টাকা। কিন্তু এপ্রিল মাসের শুরুতে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত লকডাউনে হাঁট-বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ার গুজবে প্রান্তিক কৃষকরা আতংকিত হয়ে পড়েন এবং মধ্যস্থভোগীদের হাঁকানো দামেই এলাকার ৯০% কৃষক পুরো বাগান বিক্রি করে দেন। এতেই ভাগ্য খুলে যায় মধ্যস্থভোগীদের!

রোজার এবং তাপদাহের কারণে বাজারে আনারসের দাম আকাশচুম্বি হলেও জনপদে মধ্যস্থভোগীরা লোকসান, লোকসান বলে গুজব অব্যাহত রাখে! এতে কৃষকরা আরো আতঙ্কিত হয়ে মধ্যস্থভোগীদের নিকট অবশিষ্ট বাগানও বিক্রি করে দেন। ফলে তথ্য গোপন বা সত্য আড়াল করে মধ্যস্থভোগীরা লুফে নিল সোনার হরিণ! পুরো বাগান মধ্যস্থভোগীর হাতে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এখন আনারস খেতে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ বাগানেই গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হয় সমতলে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, গত ৫/৭বছর ধরে মানিকছড়ি, রামগড় ও গুইমারার পাহাড়ি(টিলা) পতিত জমিতে হত-দরিদ্র কৃষকরা দলবেঁধে নিজের কিংবা পরের জমি বর্গা নিয়ে দলে দলে আনারস চাষ করে আসছেন। ভাল ফলন ও ন্যায্য দাম পাওয়ায় প্রতি বছরই বাড়ছে চাষীর সংখ্যা। এ বছর তিন উপজেলার প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে দুই শতাধিক কৃষক আনারসের বাগান সৃজন করেছেন। আনারস চাষ লাভজনক হলেও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই কৃষকের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

এই এলাকার উদীয়মান কৃষক ও পাইকার নুর আলম জানান, নিজের ও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আনারস চাষ এবং অন্যের উৎপাদিত ফল পাইকারী কিনে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ২০/২৫ লক্ষ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করেছি। দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টি ও খরায় আগামে ক্ষেতে ফল পাকা শুরু হয়। আর প্রথম লকডাউনের প্রথম ২/৪ দিন সমতলে আনারসে বাজার কম ছিল। ওই সময় কারো কারো লোকসান, আবার কারো গায়ে গায়ে পুষিয়েছে। একেত কৃষকরা আতঙ্কিত হয়ে বাগানের পর বাগানে কম দামেই মধ্যস্থভোগীদের দিয়ে দেয়। কিন্তু বাজার হঠাৎ করে আবার ঘুরে দাঁড়ালে কপাল খুলে যায় ব্যবসায়ীদের! যা জনপদে অজানাই ছিল। অথবা বাজার বৃদ্ধির খবরটি গোপনই রাখা হয়েছে। আগামী ১৫/২০ দিন বাজার দর এই উর্ধ্বমুখি থাকলে আমরা (পাইকাররা/মধ্যস্থভোগী) লালে-লাল!

বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় ২১ এপ্রিল থেকে প্রতিটি আনারস মধ্যস্থভোগীরা( পাইকার) কিনছে গড়ে ১৫-১৬ টাকা। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম নিতে গাড়ি ভাড়া, লেবার ও আড়ত খরচসহ আরো ৭-৮ টাকাসহ মোট আনারস প্রতি পুঁজি দাঁড়ায় গড়ে ২২-২৪ টাকা। গড়ে মাঝারী প্রতি পিস বিক্রি ৪০/৪৫ টাকা। বড় সাইজ হলে ৫৫/৬০ টাকা। মোট কথা আনারস চাষাবাদে গড়ে ৪৫-৫০% লাভ করা সম্ভব। বর্তমানে এখান থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৫/২০ ট্রাক আনারস রাজধানীসহ সমতলে নেওয়া হয়। এখানকার মধ্যস্থ অন্যান্য পাইকাররা হলেন, গভামারার মো. মুকবুল হোসেন, মো. মহি উদ্দীন, ওসমান পল্লীর জাকির কাজী, হাতিমুড়ার মো. তুহিন, মো. কামরুল, মো. কবির হোসেন, মো. আবদুর রহিম, মো. সোহেল, মোৎ আমিনুল ইসলাম, মো. হাফিজুল ইসলাম, মো. জমসম উদ্দীন, মো. আবদুর রহিম, মো. মামুনর রশিদ, মো. ইব্রাহিম। তারা জানান, রোজার পর পর সমতলে আনারসের বাজার বেড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমান বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস চাষে কৃষক এবার আগাম ফলন আনতে সক্ষম হয়েছে। আমরা সাধারণ আধুনিক পরামর্শ ছাড়া কৃষকদের তেমন সহযোগিতা দিতে পারি না। অনেকে কৃষিবীদদের পরামর্শ ছাড়াই গাছ ও ফলে মাত্রাতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারের ফলে অকালে-অসময়ে গাছ পরিপক্ক না হয়েই ফল আসতে শুরু করে। তবে এই ফল সু-স্বাদু কম। প্রতিটি গাছ রোপনের পর কমপক্ষে ২২-২৩টি পাতা গজালে তারপর গাছে ফল আসার সময় হয়। ওই সময় যথা নিয়মে হরমোন ব্যবহার করলে এক সাথে গাছে ফল আসে, ফল পরিপক্ক হয় এবং পাকা শুরু করে। এই নিয়ম মেনে পাহাড়ে রসালো ফল আনারস চাষ করলে কৃষকরা অল্প পুঁজিতে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। তবে এবার অনাবৃষ্টি থাকায় আগাম এবং একযোগেই গাছে আনারস পাকার ধুম পড়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × five =

আরও পড়ুন