শেখ হাসিনা কি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন নাকি এটা নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার জন্য পলিটিক্যাল রেঠরিক?

fec-image

পলাতক ও পতিত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরবেন। তার এই ঘোষণার পর বাংলাদেশ ও ভারতের তোলপাড় শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রতিফলন দৃশ্যমান। অন্যদিকে সরকারের মধ্যে আলোচনা কীভাবে তিনি দেশে ফিরতে পারেন, আদৌ কি ফিরতে পারেন? এই মুহূর্তে কেন তিনি এ ধরনের ঘোষণা দিলেন? এ ব্যাপারে আমি তিনদিন পূর্বে আমার একটি পোস্টে কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছিলাম, সেগুলো এখানে পুনরায় উল্লেখ করতে চাই। পোস্টটি ছিল নিম্নরূপ:

“আপনার কি মনে হয়

  1. .শেখ হাসিনা কি এই ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন?
  2. .নাকি এটা নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার জন্য পলিটিক্যাল রেঠরিক?
  3. .দেশে ফিরে মামলা ফেস করার মত সাহসী মনে হয় তাকে?
  4. .দেশে ফিরে কারাগারে বসবাস করার মত মানসিকতা ধারণ করেন তিনি?
  5. .তার সাথে পলাতক আওয়ামী লীগের শত শত দুর্নীতিবাজ নেতৃবৃন্দ যারা এই মুহূর্তে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন তারাও কারাগারের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরবেন?
  6. .এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কি সরকারের উপর কোন চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন?
  7. .কোন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে দেশে ফেরানো হতে পারে?
  8. .চায়নার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন প্রবণতা থামিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারত এই কার্ড খেলতে পারে?
  9. .চায়নার সাথে করিডর, তিস্তা ব্যারেজ, টার্কির সাথে ড্রোন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে কি?”

তবে সরকারি দল এবং জুলাই পক্ষের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরা নিয়ে খুব বেশি বিশ্বাসী নয় এবং তারা এটাকে তেমনভাবে কোন গুরুত্ব দিচ্ছে না। মানুষ যখন প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তখনই প্রতিপক্ষ সক্রিয় ও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটের পর আওয়ামীলীগ অনেক বেশি কনফিডেন্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ২০৪১ সালের পূর্বে অথবা যতদিন শেখ হাসিনা জীবিত আছেন ততদিন কেউ তাকে সরাতে পারবেন না। শুধু আওয়ামী লীগ নয় দেশের অনেক মানুষই হতাশ হয়ে এ ধরনের ছড়িয়ে দেয়া বয়ান বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। অথচ মাত্র এক মাসের একটি অপরিচিত বাউকুরি বাতাসে শেখ হাসিনা অটল তখত তাসের ঘরের মতো উড়ে গেল। তাই এ ধরনের হুমকি বিনা পরীক্ষায় ছেড়ে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাই শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দুইবার ফিরে এসেছেন। ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় বিদেশে আটকে পড়া শেখ হাসিনা দেশে আসতে পারেননি। এসেছিলেন ১৯৮১ সালে। তার ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান রয়েছে। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন দেশে প্রকৃতই গণতন্ত্র ফিরে আসুক এবং বহু দলীয় গণতন্ত্রের চর্চা হোক। এ কারণে নিজ দলের অনেক সিনিয়র ও দলের বাইরের শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ ও সর্তকতা উপেক্ষা করে তিনি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা পর্দার অন্তরালে করেছিলেন। তবে এর ভেতরেও অন্য খেলা ছিল এবং সেই পর্দা ফাঁস করেছেন তার এককালের গোপনীয় সহকারি মতিউর রহমান রেন্টু। তিনি তার রচিত আমার ফাঁসি চাই গ্রন্থে এ ব্যাপারে লিখেছেন,

“আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মাত্র কয়েক দিন হলো দেশে এসেছেন, এর মধ্যেই তিনি এমন একটি নির্দেশ কিভাবে দিতে পারেন? প্রশ্ন করা হলে কর্নেল শওকত আলী বলেন, শেখ হাসিনা দেশের বাইরে (ভারত) থাকতেই এ বিষয়ে অবহিত আছেন। কর্নেল শওকত আলী জিয়া হত্যাকাণ্ডে ও হত্যা পরবর্তী সময়ে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলেন যে, হত্যাকাণ্ডের সময় আমাদের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় থাকতে হবে। আমাদের যারা চট্টগ্রামে থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে জেনারেল মঞ্জুর-এর কাছে থেকে অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় চলে আসা এবং ঢাকায় যারা থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে চট্টগ্রাম থেকে আসা অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় রেডিও-টেলিভিশসনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের মধ্যে একজন কবে নাগাদ এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে প্রশ্ন করায় কর্নেল শওকত বলেন, এখন থেকে যে কোন সময় হতে পারে। যখনই জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যাবেন তখনই তাকে হত্যা করা হবে। কর্নেল শওকত আরো বলেন, জিয়া হত্যা সংগঠন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদসহ অন্যান্য জেনারেলগণ এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর গার্ড রেজিমেন্টের কর্নেল মাহফুজুর রহমান অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মঞ্জুরের সাথে থাকবেন। কিন্তু যে মুহূর্তে জিয়া হত্যা সংঘটিত হয়ে যাবে সেই মুহূর্তে থেকে এরা বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং দ্বন্দ্ব শুরু হবে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে থাকবে পাকিস্তান প্রত্যাগত (রিপেট্রিয়ট) অফিসার ও জোয়ানসহ ঢাকার জেনারেলগণ। অন্যদিকে জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে থাকবে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার ও জোয়ানরা। জিয়া হত্যার পর জেনারেল এরশাদের আনুগত্যশীল সেনাবাহিনী এবং জেনারেল মঞ্জুরের আনুগত্যশীল সেনাবাহিনীর লড়াই হবে, যুদ্ধ হবে। এই যুদ্ধে উভয় গ্রুপেরই ক্ষতি হবে এবং একটি গ্রুপকে পরাজিত ও ধ্বংস করে অপর গ্রুপটি বিজয়ী হলেও খুবই দুর্বল থাকবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা ঐ বিজয়ী দুর্বল গ্রুপকে আক্রমণ করে পরাজিত করবো। এই হচ্ছে আমাদের হত্যা ও হত্যা পরবর্তী করণীয়।

এই জরুরী গোপন বৈঠকে ৩রা নভেম্বর ‘৭৫-এ সামরিক অভ্যুত্থানকারী কর্নেল গাফফার, মেজর নাসির, ক্যাপ্টেন হাফিজ এবং আরো কয়েকজন সদস্যসহ প্রায় সত্তর পঁচাত্তর জন যোদ্ধা উপস্থিত ছিল। বৈঠকে আমাদেরকে প্রধানত ৩টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে চট্টগ্রাম যেয়ে জেনারেল মঞ্জুরের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ সদস্যের দ্বিতীয় গ্রুপকে সারা দেশ সফর করে জিয়া বিরোধী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছানো ও যে কোন মুহূর্তে যে কোন ধরনের একশনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাকি সবাইকে তৃতীয় গ্রুপ হিসেবে চব্বিশ ঘন্টা প্রস্তুত করে ঢাকায় রাখা হয়। (পৃষ্ঠা ৪১-৪২)।

অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের ইচ্ছার ভেতরেও ভারতের একটি প্লট সাজানো ছিল। এ ব্যাপারে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র এর সাবেক কর্মকর্তা অশোক রায়ানা তার ‘ইনসাইড র ‘গ্রন্থে আরও বিস্তারিত বলেছেন। আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন।

ওয়ান ইলেভেনের পর তৎকালীন সামরিক ও বেসামরিক সরকারের চাপের মুখে শেখ হাসিনা পুনরায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পালিয়ে যাওয়ার সময় তৎকালীন ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিন সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল এবং তারা ক্ষমতায় ফিরতে পারলে এদের বৈধতা দেবেন এমন ঘোষণা দেন। তবুও তৎকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে। মাইনাস টু ফর্মুলার অংশ হিসেবে চাপটা দুইনেত্রীর উপর থাকলেও কেবল শেখ হাসিনাই দেশ ছেড়ে চলে যান এবং বেগম খালেদা জিয়া সকল চাপ অগ্রাহ্য করে দেশে থেকে যান। শুধু তাই নয়, তিনি কেবল দেশে থেকেই যাননি, বরং কারান্তরীন থেকেও শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য দাবি করেন। তার এই আপসহীন মনোভাবের কারণে তৎকালীন সরকারের মাইনাস টু থিওরি পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ফলে একসময় শেখ হাসিনা ফেরত আসেন।

ফিরে আসার পাশাপাশি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে পালিয়ে যাওয়ার বা পালানোর চেষ্টার বেশ কিছু ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। প্রথমত জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা পুনরায় দেশ ছেড়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন। ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেস্টার সময় শেখ হাসিনা আরেকবার ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি নিজেকে নিরাপদে রাখতে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেও গোপনে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান প্রথমে এমন অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান ইলেভেন এর সময় মইনুদ্দিন ফখরুদ্দিনের চাপে পড়ে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়েন এবং সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।

অথচ এ ধরনের বা এই সকল পরিস্থিতিতে তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া প্রত্যেকবার দেশে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। তিনি কখনোই দেশ ছেড়ে পালান নি বা পালানোর চেষ্টা করেননি। সকল চাপ ও পরিস্থিতির মুখে তিনি দেশের টিকে থেকেছেন এবং দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সবসময় বলেছেন, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। উনার ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় তাকে শেখ হাসিনার মত বিদেশে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনে প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে কারাগার কবুল করেছেন। হাসিনার আমলে নিজের প্রাণঘাতী অসুস্থতার চিকিৎসার বিনিময় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার বহু প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে থেকেছেন এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন অবশেষে মৃত্যুকে বরণ করেছেন কিন্তু বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি। শেখ হাসিনা ও তার নেতারা বারবার বলেছেন, তারা এই দেশ ছেড়ে পালাবেন না। এমনকি বাপের নামে শপথ করে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শেখের বেটি পালায় না।’ কিন্তু তিনি পালিয়েছেন এবং খুব সহজেই পালিয়েছেন। নিজে পালানোর তিনদিন পূর্বেই তার পরিবারের সদস্য ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীদের পালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি হয়তো ক্ষমতায় নাও টিকতে পারেন।

উপরের ইতিহাসগুলো উল্লেখের মূল কারণ শেখ হাসিনার মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য। এছাড়াও তিনি তার সপরিবার হত্যাকাণ্ড এবং জেলখানা হত্যা ট্রমা গুলো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বলা ভালো তিনি কাটিয়ে উঠতে চাননি বরং এগুলো নার্সিং করেছেন এবং দেশের মানুষের মাঝে সব সময় ছড়িয়ে দিয়ে একটি বিশেষ সহানুভূতি অর্জন করতে চাইতেন। এরকম পরিস্থিতির একজন মানুষ মৃত্যুদণ্ডের রায় উপেক্ষা করে ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে কনডেম্ড সেলে যাবেন এটা অনেকটাই অবিশ্বাস্য। ব্যক্তিগত ইতিহাস তাকে প্রচলিত কারাগারের ভীতি মুক্ত হতে দেবে না। তাছাড়া তিনি দেশে ফিরলে শুধু যে কারাগারে চুপচাপ দিন পার করে ফাঁসির আপিল ট্রায়াল ফেস করবেন, এমনকি নয়। তার বিরুদ্ধে আরো অনেক মামলা রয়েছে এবং সেসব মামলায় তাকে নিয়মিত আদালতে যেতে হবে এবং পুলিশি রিমান্ড মোকাবেলা করতে হবে। এসব রিমান্ডে চাপের মুখে ভারতের সাথে তার বিভিন্ন গোপন চুক্তি অথবা তার ক্ষমতাসীন সময়ের অনেক গোপন কথা প্রকাশ করে দিতে পারেন। যেগুলো তার নিজের, পরিবারের এবং ভারতের জন্য বিব্রতকর হতে পারে। এ বিষয়টিও ভারত মাথায় রেখেছে নিশ্চয়ই।

তাহলে কি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আদৌ সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব। সেক্ষেত্রে বেশ কিছু পূর্ব শর্ত এবং বেশ কিছু দাবার ঘুঁটি নড়চড় প্রয়োজন। এবং এসব ঘটলেই কেবল শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেন ডিসেম্বরের মধ্যে। সেগুলো কী?

১. বর্তমানে ক্ষমতায় ও বিরোধী দলে এবং রাজনীতিতে যারা সক্রিয় রয়েছেন তারা সকলেই জুলাই পক্ষের ও চেতনার রাজনৈতিক দলগুলো। এদের মধ্যে যদি বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে এবং একপক্ষ অন্যপক্ষকে জিতের ভাত সারমেয়কে দিয়ে খাওয়ানোর মতো সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছে যায় তাহলে সম্ভব।

২. বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তার পিতার মতো বহুদলীয় ও মুক্ত গণতন্ত্রের চর্চায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার কোন গোপন সিগন্যাল দিয়ে থাকেন তাহলে সম্ভব।

৩. বিরোধীদল যদি সরকারের উপরে এমন চাপ সৃষ্টি করে যে সরকার ক্ষমতারচ্যুত হওয়ার মত পরিস্থিতিতে উপনীত হয়, তাহলে জামাত-এন সি পি জোটকে প্রধান প্রতিপক্ষ নির্ধারণ করে তাদের কোনঠাসা করার জন্য সরকার হয়তো আওয়ামী লীগকে স্পেস করে দিতে পারে।

৪. মতিউর রহমান রেন্টুর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার প্লট চূড়ান্ত হলে শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে বা আগামী দিনে এ ধরনের পরিস্থিতি উপনীত হলে তাকে দেশে ফেরাতে পারে ভারত।

৫. দেশের মধ্যে কোন সামরিক বা বেসামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে তিনি ফিরতে পারেন। এবং এটাই তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন।

৬. ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক বাংলাদেশী পলাতক সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরীকে দেয়া সাক্ষাৎকার থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকার এবং তাদের ডিপ স্টেট ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে ফেরানোর জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক ধরনের সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেটা সম্ভব হলে শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠানো হতে পারে।

৭. বর্তমান সরকারের চায়না মুখী নীতি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে এক টেবিলে বসিয়ে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসাথে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ছক করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মারমুখী নিতে অবলম্বন করেছিলেন এবং তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন তাকে উৎখাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাকে কতটা বিশ্বাস করবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৮. শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা তার ভারতে অবস্থান। এদেশের মানুষের মানসিকতায় ভারত প্রশ্নের যে অবস্থান, এবং বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন কর্মকান্ডে মানুষের মধ্যে যে ভারত বিরোধী চেতনা সক্রিয় হয়ে উঠছে, সেক্ষেত্রে ভারত থেকে তার সরাসরি দেশে ফেরা এবং তাকে ফেরানোর ক্ষেত্রে ভারতের যে সকল কর্মকান্ডের কথা সুবীর ভৌমিক তার এই ইন্টারভিউতে বলেছেন এগুলো তার সম্পর্কে বাংলাদেশে যে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করবে, তাতে বাংলাদেশের দেশ প্রেমিক ও ভারত বিরোধী জনগোষ্ঠী তাকে কতটা গ্রহণ করবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। তিনি ভারত থেকে তৃতীয় কোন দেশে থাকলে এবং সেখান থেকে ফিরে আসলে হয়তো এই পরিস্থিতি কিছুটা এড়াতে পারতেন।

৯. শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের অবস্থানটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনোভাবে বা যে কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যদি যদি এই ডিপ স্টেট শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার পথ করে দেয় বা তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করে সেক্ষেত্রে একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই ডিপ স্টেটের গ্রীন সিগনাল না আসলে শেখ হাসিনার পক্ষে দেশে ফেরা সম্ভব নয়।

১০. দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারা, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে না পারা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার মত পরিস্থিতিতে যদি বর্তমান সরকার উপনীত হয়, জনদুর্ভোগ লাঘবে ব্যর্থ হয়- সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মত প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে।

সর্বোপরি শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয় রয়েছেন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে। তাদের নিরাপত্তা প্রটোকলে রয়েছেন। কাজেই মুখে তিনি যতই হম্বিতম্বি করুন, দেশে ফেরার ব্যাপারে তার একক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। ভারতের ইচ্ছা বা বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি একক সিদ্ধান্তে বিমানের টিকেট বাংলাদেশে নামতে পারবেন না। তাকে অবশ্যই ভারত সরকারের গ্রিন সিগন্যাল এবং তাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ফিরতে হবে। কবে ভারত কেবল একাই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে সেটা নাও হতে পারে। এর সাথে আরো এক বা একাধিক দেশি-বিদেশি ফ্যাক্টর্স যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন পড়বে।

উল্লেখিত প্যারামিটার বা শর্তগুলোর উপর নির্ভর করছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং না ফেরা। এর সাথে তার বয়স, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আওয়ামী লীগ, ভারত, মৃত্যুদণ্ড
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন