রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে

আমের বাগানে ঢেকে গেছে বান্দরবানের পাহাড়

fec-image

বান্দরবানের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট হচ্ছে নীলগিরি। সম্প্রতি ঢাকা থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ৪০ জন সংবাদকর্মীর একটি দলের অংশ হয়ে ঘুরে এসেছি নীলগিরি থেকে। ১১ জুলাই (শুক্রবার) সকাল সাড়ে ৭টায় বান্দরবান সদর থেকে চারটি চান্দের গাড়িতে আমরা রওয়ানা হই নীলগিরির উদ্দেশে। বান্দরবানে এর আগে অনেকবার গিয়েছি, তবে শেষবার গিয়েছিলাম অন্তত ১১ বছর আগে। তাই অনেক কিছুই নতুন লাগছিল। বান্দরবান টানেল (যা আগে ছিল না) দিয়ে নীলগিরির দিকে গাড়ি যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন স্থাপনা চোখে পড়ল।

বিশেষ করে শৈল প্রপাত ঝর্ণাকে ঘিরে আগের চেয়ে বসতি অনেক বেড়েছে। বেড়েছে পাকা ভবনের সংখ্যাও। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়তে লাগল বিশাল বিশাল আমের বাগান। বেশিরভাগ গাছই ফাঁকা, কোনো আম নেই। বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে চোখে পড়ল, কোনো কোনো গাছে এখনো ঝুলছে কাঁচা-পাকা আম। বান্দরবান সদর থেকে নীলগিরির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার, তবে আমাদের গন্তব্যছিল আরও ৫ কিলোমিটার দূরের নীল দিগন্ত পর্যটন স্পট। পুরোটা পথই পাহাড়ের উপর দিয়ে। পাহাড়ের দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধুই আমের বাগান দেখা যায়। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ড্রাগন, পেঁপে, আনারসের বাগান। শুধু তাই না, বরবটি, করল্যা, কচু, শসার মতো নানা জাতের সবজি বাগানও চোখে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে।

কিছুক্ষণ পর পর রাস্তার পাশে সুবিধাজনক স্থানগুলোতে গড়ে উঠেছে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠির মানুষদের ছোট ছোট বসতি। এসব বসতি আগেও ছিল, তবে এখন ঘরের সংখ্যা বেড়েছে। সেই সাথে নতুন হিসেবে যুক্ত হয়েছে পাকা ভবন। উঁচু পাহাড়ে আগে যেখানে ছিল শুধু বাঁশ-কাঠ-শণের ঘর, এখন সেখানে অনেকেই পাকা ভবন তৈরি করে নিয়েছেন। রাস্তার পাশে বেশ কিছু ভিউ পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। এসব ভিউ পয়েন্ট এবং বসতি সংলগ্ন স্থানগুলোতে এক বা একাধিক দোকান আছে। দোকানগুলোতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি স্থানীয় ফল আম, আনারস, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ফল বিক্রি করা হচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ফ্রেশ ফল খাওয়ার জন্য পর্যটকরা ভিড় করছেন দোকানগুলোতে।

ভিউ পয়েন্টগুলোতে যাত্রা বিরতির পাশাপাশি ছবি তোলা, ফল খাওয়া আর হইহুল্লোড় করতে করতেই আমাদের গাড়ি চলতে থাকে নীল দিগন্তের পানে। নীলগিরি পেরিয়ে বেলা প্রায় সাড়ে ১১টায় পৌঁছে যাই সেখানে। বান্দরবানের সাথে নীল রঙের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। এর আগে আমার শেষ গন্তব্য ছিল নীলগিরি পর্যন্ত। এবারই নীল দিগন্তে এসে হাজির হয়েছি। উঁচু পাহাড় থেকে গাঢ় নীল আকাশকে খুব কাছ দেখা যায়, সম্ভবত সেকারণেই এখানকার জনপ্রিয় স্পটগুলোর নামের সাথে নীল জড়িয়ে গেছে। যেমন শহরের খুব কাছের স্পট নীলাচল, তারপর দূরের নীলগিরি, নীল দিগন্ত ছাড়াও নীল ক্যাফেসহ আরও কোনো কোনো স্থানের নামের সাথে নীলের যুক্ত থাকার বিষয়টি নজরে এসেছে।

নীল দিগন্ত নাম শুনে মনের মধ্যে স্পটটি নিয়ে যে কল্পচিত্র তৈরি হয়েছিল, স্পটে এসে সেটি আর মেলাতে পারিনি। পাহাড় আর প্রকৃতির অপূর্ব মিলনের কেন্দ্রবিন্দু হলেও স্থাপনাগুলো যেন মলিন। ভবনগুলো যেন ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার কোনো বালাই নেই। চারপাশ অরক্ষিত এবং নোংরা। একটি ভাঙ্গা ভবনের ভেতরে খাঁচার ভেতর দেখতে পেলাম দুটি পাহাড়ি ময়নাকে আটকে রাখা হয়েছে। আমাদের সাড়া পেয়ে চিৎকার করছিল পাখি দুটি। উঁকি দিয়ে দেখলাম, খাঁচার মধ্যে খাবার এবং পানিও দেয়া আছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো মানুষকে দেখতে পেলাম না। যাহোক, সেখান থেকে ফেরার পথে নীলগিরিতে দুপুরের খাবার খেয়ে রওয়ানা হলাম বান্দরবানের উদ্দেশে। গাড়ি ছুটছে আবারো সেই আম বাগানের ভেতর দিয়ে। আমরা ততক্ষণে প্রায় সবাই শ্রান্ত-ক্লান্ত। হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য ছটফট করছেন কেউ কেউ।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এম, এম, শাহ্ নেয়াজ জানান, ‘বান্দরবানে অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই বার্মিজ প্রজাতির রাঙ্গুয়াই নামের আমের বাগান। এই আমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দেরীতে পাকে। টক-মিষ্টি স্বাদের জন্য বেশ জনপ্রিয়। তবে স্থানীয় বাজারে এটি তেমন একটা বিক্রি করতে দেখা যায় না। প্রাণের মতো বিভিন্ন ফ্যাক্টরি এসব পাইকারী দামে আম কিনে নিয়ে যায়। রাঙ্গুয়াই ছাড়াও বান্দরবানে আম্রপালি, মিয়াজাকি, বানানা ম্যাংগো চাষ ইদানিং বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বান্দরবানের আম রপ্তানি হয়, এবার চীনেও কিছু আম রপ্তানি হয়েছে। আমের পাশাপাশি বান্দরবানের পাহাড়ে আনারস, কলা, ড্রাগন, কাজু বাদাম, লিচু, কফি চাষ হচ্ছে।’

বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই জানান, ‘প্রতি বছর পাহাড় পুড়িয়ে জুম চাষ করলে পরিবেশের জন্য ক্ষতি হয়। তাই এখানকার চাষিরা বাগান করার দিকে ঝুঁকছে। বাগান করার ব্যাপারে জেলা পরিষদের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাষিদের নানাভাবে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়ে থাকে। ফলের মধ্যে আম, আনারস, কলা, ড্রাগন, লিচুর চাষ বেশি হয়। এর মধ্যে বান্দরবানের আনারস মিষ্টি স্বাদের জন্য অনন্য। এবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত পার্বত্য ফল মেলায় দুই ট্রাক আনারস নিয়ে গিয়েছিলাম। স্বাদের কারণে সবই বিক্রি হয়ে গেছে। মেলার শেষদিন তো অনেককে আনারস দিতেই পারিনি। কারণ, আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।’

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন