বাংলাদেশি গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমকে স্যালুট জানিয়ে পাকিস্তানের পোস্ট

fec-image

বাংলাদেশের পাবনা জেলায় জন্ম নেওয়া কীর্তিমান বৈমানিক সাইফুল আজমকে সম্মানের সাথে স্মরণ করলো পাকিস্তান। ইতিহাসে আজকের এই দিনে তৎকালীন গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমের অসাধারণ কীর্তিকে স্যালুট জানিয়ে অফিসিয়াল ফেইসবুক পোস্টে পাকিস্তান বিমান বাহিনী উল্লেখ করেছে যে, ‘আকাশযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং কর্তব্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

সাইফুল আজম ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল ৬ দিনের যুদ্ধে অংশ নিয়ে ৪টি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করেন, যা তৎকালীন ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে একক যোদ্ধা হিসেবে সর্বাধিক বিমান ধ্বংসের রেকর্ড। সাইফুল আজম তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাইলট হিসেবে ডেপুটেশনে রয়্যাল জর্ডানিয়ান এয়ার ফোর্সে কর্মরত ছিলেন।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পোস্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এই পাইলট ডেপুটেশনে গিয়ে জর্ডানের আকাশে সামনের সারিতে থেকে সত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন তিনি ইসরায়েলি এয়ার ফোর্সের সুপার মিস্টিয়ারকে গুলি করে ভূপাতিত এবং আরেকটিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে বিশ্বের আকাশ প্রতিরক্ষা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম লেখান।

সাইফুল আজম ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে ​​পাইলট হিসেবে কমিশন লাভ করেন এবং সরকারি আদেশে ১৯৬৬ সালে রয়্যাল জর্ডানিয়ান এয়ার ফোর্সে ডেপুটেশনে যোগদান করে ১ স্কোয়াড্রনে হকার হান্টার বিমান উড়ান। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে জর্ডানের আকাশশক্তিকে পঙ্গু করে দেয়ার হুমকি দেয় ইসরায়েল। ইসরায়েলের এই হুমকি প্রতিহত করতে ১৯৬৭ সালের ৫ জুন জর্ডানের মাফরাক বিমানঘাঁটির রানওয়ে থেকে ধুলো আর বিপদে ভরা আকাশে গর্জন তুলে উড়ে যান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম। একটি ইসরায়েলি এয়ার ফোর্সের সুপার মিস্টিয়ারকে গুলি করে ভূপাতিত করেন এবং আরেকটিকে করেন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত।

শুধু তাই নয়, দুদিন পর ৭ জুন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম আবারও যুদ্ধের সামনের সারিতে থেকে ইরাকের এইচ-৩ সেক্টর থেকে হান্টার বিমানের একটি ফর্মেশনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ছুটে যান এবং আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। একটি শক্তিশালী ইসরায়েলি স্ট্রাইক প্যাকেজের মুখোমুখি হয়ে তিনি দক্ষতার সাথে একটি শত্রু মিরাজকে আউটম্যানুভার করেন এবং সাহসী স্প্লিট-এস ম্যানুভার চালিয়ে কাছাকাছি চলে আসেন। অসাধারণ নির্ভুলতার সাথে তিনি দুটি শত্রু বিমানকে ভূপাতিত করেন একটি মিরাজ-III এবং একটি ভাউটুর IIA। এই অসাধারণ সাহস ও উড়ান দক্ষতার জন্য তিনি বিশ্বের আকাশ প্রতিরক্ষার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম লেখান এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। তাঁর এই অতুলনীয় সাহস, জাতীয় সীমানার বাইরেও আকাশ যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ইতিহাসে অমরত্ব এনে দেয়।

ইউকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিখ্যাত বৈমানিক সাইফুল আজমের জন্ম ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে। যিনি কর্মজীবনে পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সম্মুখ সমরের যোদ্ধা, প্রশিক্ষক, উপদেষ্ঠা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।

সাইফুল আজম একমাত্র সামরিক পাইলট, যিনি যুদ্ধে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, জর্দান ও ইরাকসহ মোট ৪টি দেশের বিমান বাহিনীতে হয়ে কাজ করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র বৈমানিক যিনি সর্বোচ্চ ৪টি দেশের বিমানবাহিনীতে চাকরি ও ৩টি দেশের বিমানবাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৬১ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার লুক এয়ার ফোর্স বেস থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মার্কিন বিমান বাহিনী সাইফুল আজমকে টপ গান উপাধি দেয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কৃতিত্বের পুরস্কার স্বরূপ পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক সিতারা–ই–জুরাত পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।

একক ব্যক্তি হিসেবে আকাশপথের যুদ্ধের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার কৃতিত্ব স্বরূপ জর্দান থেকে তাকে হুসাম-ই-ইস্তিকলাল সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে কৃতিত্ব স্বরূপ ইরাকি সাহসিকতা পদক নুত-আল-শুজাত পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে।

সাইফুল আজম পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, জর্দান, ইরাক, রাশিয়া, চীন এবং বাংলাদেশসহ মোট ৮টি দেশ থেকে৮টি পৃথক প্রশংসাপত্র অর্জন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্য সব অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে সাইফুল আজমকে ২০০১ সালে মার্কিন বিমান বাহিনী বিশ্বের ২২ জন লিভিং ঈগলসের স্বীকৃতি দেয়।

১৯৭১ সালে সাইফুল আজম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের শুরুতেই তাঁর ওপর পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে সাময়িকভাবে উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগেই আজম নিজেও পাকিস্তান এয়ারলাইন্স ও বিমান বাহিনীতে তার সহকর্মী বাঙালিদের সাথে গোপনে পরিকল্পনা করেন করাচি থেকে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের একটি জেটবিমান ছিনতাই করার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ মার্চ তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানকে পাঠিয়ে দেন ঢাকায়। পরবর্তীকালে সে পরিকল্পনা আর সফল করতে পারেন নি।

সাইফুল আজম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ফ্লাইট কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ছিলেন। তিনি ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের টি-৩৩ জঙ্গী বিমান নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় মতিউর শহীদ হবার পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা সাইফুল আজমকে রিমান্ডে নেয় এবং টানা ২১ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মতিউর রহমানের শহীদ হবার পরপর সাইফুল আজমকে পাকিস্তানি অফিসাররা বন্দি করে নিয়ে যান এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে রাখেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৭৭ সালে উইং কমান্ডার পদে উন্নীত হন। তাকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ঢাকা ঘাঁটির অধিনায়ক করা হয়। বিমান বাহিনীতে ডিরেক্টর অব ফ্লাইট সেফটি ও ডিরেক্টর অব অপারেশন্স হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি ঢাকা বিমানঘাঁটির কমান্ড লাভ করেন এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নেন তিনি।

তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) চেয়ারম্যান হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাইফুল আজম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হয়ে রাজনীতি করতেন। তিনি পাবনা-৩ আসন থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বিখ্যাত এই বৈমানিকের জন্ম ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে। তিনি ২০২০ সালের ১৪ জুন ঢাকার সিএমএইচে ইন্তেকাল করেন। আকাশ প্রতিরক্ষায় এই সাহসী বৈমানিকের অনন্য রেকর্ড বিশ্বের আকাশ প্রতিরক্ষা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে চিরদিন লেখা থাকবে।

সূত্র : পাকিস্তান এয়ার ফোর্স’র ফেইসবুক এবং উইকিপিডিয়া

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম, পাকিস্তান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন