ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণ: আলোচনা থাকলেও গতি নেই উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে

fec-image

রাঙামাটির রাজস্থলীর বাসিন্দা চাইংথুই মার্মা জানান, ‘আমার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সে মার্মা ভাষায় বই পেয়েছে। তাতে আমার মেয়ে খুশি, আমিও খুশি। কিন্তু ভয়ে আছি অন্য কারণে। স্কুলে মার্মা ভাষায় পড়ানোর ভালো শিক্ষক নেই। তাই ঠিক মতো ক্লাস হয় না। মার্মা ভাষায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই আছে, এরপর তো তাকে বাংলা ভাষায় পড়তে হবে। তখন কী হবে? তখন সেকি অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে পড়তে পারবে?’

দেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও গতি নেই উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিগুলোর ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আমাই) ২০১৩ সালে শুরু করেছিল নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। পরিকল্পনা ছিল, এ সমীক্ষা শেষ করে তা ১০ খণ্ড বাংলায় ও ১০ খণ্ড ইংরেজিতে প্রকাশ করা হবে। ২০১৬ সালে মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষ হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি গবেষণা কর্মটি। অন্যদিকে ২০১৪ সালে পাঁচটি নৃ-গোষ্ঠির শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০১৭ সালে প্রথম চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি এই পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিুশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে বিতরণ করতে সক্ষম হয় এনসিটিবি। ২০২৩ সালে এসেও তারা আটকে আছে সেই পাঁচটি ভাষাতেই। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক শিশুদের মধ্যে বিতরণ করা হলেও তাদের জন্য ভাষা শিক্ষার দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা যায়নি স্কুলগুলোতে। গাইড লাইন না থাকায় পরীক্ষা পদ্ধতি বা মূল্যায়ন হচ্ছে না শিশুদের মাতৃভাষার শিক্ষা কার্যক্রমের। অভিভাকরা শঙ্কায় আছেন তাদের শিশুদের পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে।

এ ব্যাপারে রাঙামাটির রাজস্থলীর বাসিন্দা চাইংথুই মার্মা জানান, ‘আমার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সে মার্মা ভাষায় বই পেয়েছে। তাতে আমার মেয়ে খুশি, আমিও খুশি। কিন্তু ভয়ে আছি অন্য কারণে। স্কুলে মার্মা ভাষায় পড়ানোর ভালো শিক্ষক নেই। তাই ঠিক মতো ক্লাস হয় না। মার্মা ভাষায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই আছে, এরপর তো তাকে বাংলা ভাষায় পড়তে হবে। তখন কী হবে? তখন সেকি অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে পড়তে পারবে?’ চাইংথুই মার্মার মতো এমন আশঙ্কা আরো অনেকের মনেই আছে। উল্লেখ্য, অভিভাবকদের এমন আশঙ্কার কারণেই এর আগে ১৯৩৭-৩৮ সালে ব্রিটিশরা রাঙ্গামাটি সরকারি হাই স্কুলে বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি চাকমা এবং মার্মা ভাষায় শিক্ষা চালু করেও তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। যে ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় কামিনী মোহন দেওয়ানের আত্মজীবনী ‘পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের কাহিনী’তে। তিনি পাহাড়িদের মাতৃভাষায় শিক্ষার উদ্যোগের সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘মিলার বদ উদ্দেশ্যে চাকমা ভাষা ও বার্মিজ ভাষা চালু করেছিল’।

জনশুমারি ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রধান জনগোষ্ঠি বাঙালির পাশাপাশি দেশে বসবাস করা আরো ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে নৃ-গোষ্ঠির সংখ্যা আরো বেশি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিগুলোর মোট জনসংখ্যা ১,৬৫০,১৫৯ জন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ০.১০ শতাংশ। এসব জনগোষ্ঠির অনেকের নিজস্ব ভাষা আছে, অনেক ভাষার লিখিত রূপ তথা বর্ণমালাও আছে। কিছু কিছু ভাষায় পুরানো দিনের পুঁথি-পুস্তকও আছে। কিন্তু সেসব ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক ভাষা। বয়স্করা মুখে মুখে নিজেদের মধ্যে চর্চা করলেও নতুন প্রজন্ম ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে মাতৃভাষা থেকে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি তথা ভাষাশহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা অনেকটাই কেন্দ্রীভূত।

বিষয়টি অনুধাবন করে জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষানীতির আলোকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি, এই পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করবে। কিন্তু নানা কারণে সেটি তখন সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২০১৭ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এসব ভাষার শিশুদের হাতে তাদের মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক তুলে দিতে সক্ষম হয়। কথা ছিল, ক্রমান্বয়ে অন্তত ২০টি নৃ-গোষ্ঠির ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে এনসিটিবি তাদের শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ২০২৩ সালে এসেও পাঁচটি ভাষাতেই আটকে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় নানান সীমাবদ্ধতার কথা। যে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এখনো কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এনসিটিবি বই প্রকাশ করে সারাদেশে তা বিনামূল্যে বিতরণ করছে ঠিকই, কিন্তু সেসব বই শিশুরা কতটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে, তার মূল্যায়নের কোনো গাইড লাইন তৈরি করতে পারেনি। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির মাতৃভাষায় বই প্রণীত হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদানে সক্ষম শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাই, বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিশুদের পাঠদানের উপযোগী করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষকদের স্বল্প মেয়াদে প্রশিক্ষণ চলছে বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি। এক্ষেত্রে আছে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)’র চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. ফরহাদুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, ‘আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে, সেগুলো আগে ভালো করে পড়ানোর ব্যবস্থা করি। তারপর অন্যান্য ভাষায় বই প্রণয়ন করার ব্যাপারটি দেখতে হবে। তাছাড়া, জনগোষ্ঠিগুলোর মধ্যেও তাদের মাতৃভাষার বর্ণমালা নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধ আছে। আমরা মণিপুরি ভাষায় বই প্রণয়ন করতে গিয়ে দেখেছি, লিপি নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তিনটি মত আছে। প্রত্যেকেই চায় তাদেরটা দিয়ে যেন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়।’

বর্তমানে যে পাঁচটি নৃ-গোষ্ঠির ভাষায় প্রাক-প্রাথমিকের বই বিতরণ করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, এই তিনটির বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতেই বেশি। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠির শিশুরা ছয় বছর ধরে বিদ্যালয়ে নিজেদের ভাষার বই পাচ্ছে। চলতি ২০২৩ সালের প্রথম দিন রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিগুলোর ২৯ হাজার ৮০৬ শিশু শিক্ষার্থী মোট ৬৬ হাজার ২৫০টি নিজেদের মাতৃভাষার বই পেয়েছে। বান্দরবানে ১০ হাজার ৭৫৭ শিক্ষার্থী পেয়েছে ২৪ হাজার ২৫১টি এবং খাগড়াছড়িতে ৩৮ হাজার ৭৮১ শিক্ষার্থী পেয়েছে ৮৬ হাজার ৯৮৯টি বই। নিজ ভাষার বর্ণমালা অনুশীলন খাতাও দেওয়া হয়েছে এসব শিশুকে। প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এসব বই দেওয়া হচ্ছে। ফলে যে ভাষায় তারা কথা বলছে, সে ভাষায়ই তাদের শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

পার্বত্য এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ। নৃ-গোষ্ঠির শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে জেলা পরিষদ কী ভূমিকা রাখছে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী জানান, ‘আমাদের দক্ষ শিক্ষকের অভাব আছে। তাই আমরা পিটিআই এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আশা করি, এ ক্ষেত্রে শিক্ষক সংকট বেশি দিন থাকবে না।’

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুনেল চাকমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য মাতৃভাষায় পাঠদানের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠির ভাষা নিয়ে সেমিনার এবং প্রকাশনার ব্যবস্থাও করি। এখন পর্যন্ত চাকমা ভাষায় ৩টি, মারমা ভাষায় ১টি এবং ত্রিপুরা ভাষায় ১টি বই প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট।’
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ির ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক জিতেন চাকমা জানান, ‘আমরা ২০১৮ সালে ১০০ জন শিক্ষককে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় শিশুদের পাঠদানের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এখন তারাই পিটিআই’র মাধ্যমে অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠদানে দক্ষ করে তুলছেন। এছাড়াও চাকমা ভাষায় ৩টি, মারমা ভাষায় ১টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ২টি বই প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সেমিনার করা হয়।’

পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ১১টি নৃ-গোষ্ঠির মানুষের বসবাস রয়েছে। বান্দরবান জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কাউছার হোসেন এ জেলার শিক্ষকদের মাতৃভাষায় পাঠদানের ব্যাপারে প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা জানাতে পারেননি। তিনি পরিষদের জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন। জনসংযোগ কর্মকর্তা জুড়ি মং বলেন, ‘জেলা পরিষদ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই, প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ এটা ভালো বলতে পারবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি তো তারাই দেখেন।’

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবানের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লীলা মুরং জানান, ‘শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানে উপযুক্ত করে তুলতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই। তবে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে কমিউনিটি ভিত্তিক ৮/৯টি নৃ-গোষ্ঠির ভাষায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এদের মধ্যে মারমা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, চাক, চাকমা ভাষার নিজস্ব লিপি আছে। খুমী, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, পাংখোয়ারা রোমান হরফে তাদের ভাষা লিখে থাকে। খেয়াংদের মধ্যে তাদের বর্ণমালা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। একটি অংশ চাইছে রোমান হরফে তাদের ভাষা লিখতে, অন্য অংশটি চাইছে নিজস্ব বর্ণমালা ব্যবহার করতে।’

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বসবাসরত বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির মাতৃভাষার সংরক্ষণ, পুনরজ্জীবন এবং বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আমাই)। ২০১০ সালে আইন প্রণীত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর রয়েছে গত এক যুগ ধরে। বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারসহ পৃথিবীর সব মাতৃভাষা সংরক্ষণ, গবেষণা ও বিকাশের লক্ষ্যে ১২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। নামে আন্তর্জাতিক হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো কাজে হাত দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। দেশের অভ্যন্তরে বসবাস করা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির ভাষা নিয়ে গবেষণা তাদের একমাত্র বড় কাজ। পাঁচ বছর আগে এটির মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষ হলেও সেটি এখনো অসম্পূর্ণ এবং অপ্রকাশিত।

বিশেষ করে, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করে থাকে। বছরের অন্যান্য সময়েও কিছু কিছু কার্যক্রম থাকে। ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে উপলক্ষ করে ভাষামেলা, সেমিনারসহ নানা আয়োজনে চারদিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে আমাই। তবে এসব নিয়ে প্রচারে খুব একটা সফলতা দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২৩ ফেব্রুয়ারি ভাষামেলায় গিয়ে মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজনের বাইরে দর্শনার্থী তেমন একটা চোখে পড়েনি। একই দিন সেমিনারে দর্শক-শ্রোতার সারিতে স্বল্প সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে ওই দিনের অন্যতম আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে। যদিও তাদের কর্মসূচি নিয়ে টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় যথেষ্ট প্রচার করা হয়েছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. হাকিম আরিফ পার্বত্যনিউজকে জানান, ‘আমাদের কাজের গতি এবং পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রথম খণ্ড ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বাকি নয় খণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পর এগুলো একসাথে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এর জন্য আরো এক বছর সময় লাগতে পারে।’ এটি প্রকাশিত হলে দেশের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের পথে বড় একটি কাজ হবে বলেও মনে করেন আমাই মহাপরিচালক। এমনকি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ১৪টি নৃগোষ্ঠির ভাষা সংরক্ষণও সম্ভব হবে।

২০২১ সালে মাতৃভাষা পদক পাওয়া খাগড়াছড়ির মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা সংরক্ষণে একটি বড় অগ্রগতি প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষায় পাঠদানের ব্যবস্থা। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির মানুষ নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারেন, কিন্তু তাদের নিজেদের ভাষায় লিখতে-পড়তে পারা মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। তাই বিদ্যালয়গুলোতে মাতৃভাষায় শিশুদের পড়ানোর জন্য যত বেশি দক্ষ শিক্ষক দেওয়া যাবে, তত বেশি সফল হবে এ কার্যক্রম। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট যে মাতৃভাষা জাদুঘর ও বিশ্বের লিখনবিধি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটাও বিভিন্ন ভাষা সংরক্ষণে কাজে দেবে বলে মনে করেন তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন ভাষা নিয়ে গবেষণা করা। কিন্তু এই কাজটাই করা হচ্ছে না। ব্যক্তি উদ্যোগে করতে গেলেও আর্থিক সাপোর্ট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন তিনি।

উৎস: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, ১ মার্চ ২০২৩।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন