দুবাইয়ে পলাতক আওয়ামী দুর্নীতিবাজ এমপি মন্ত্রীদের আড্ডা

fec-image

আলজাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের দুবাইয়ে আল বুর্জ টাওয়ারের পাশে পলাতক আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী এমপিদের আড্ডার একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, দুর্নীতিবাজ নেতারা লুটপাট করে অর্থপাচার করে এখন বিদেশে আরাম-আয়েশে মচ্ছব জীবন যাপন করছেন। আর দেশে তাদের নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, জেল খাটছে। হয়তো মাঝেমধ্যে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল টাকার দু একটি ধূলিকণা এসব কর্মীদের মাঝে বিলিয়ে নিজেদের নেতৃত্ব বজায় রাখছেন। লোক ভাড়া করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি করিয়ে নেত্রীর কাছে পয়েন্ট তৈরি করছেন। আর সুদিনের অপেক্ষা করছেন। যদি সুদিন ফেরে এরাই ফিরে এসে আবার নেতৃত্ব দেবেন, আর এখন যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, জেল খাটছেন, তারা তখন রাস্তায় ঘুরবেন।

এই যে প্রবণতা, এর কারণে বাংলাদেশে উন্নতি সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। দুর্নীতি বিশ্বের সব দেশেই কম বেশি হয়। কিন্তু এই দুর্নীতির টাকা আবার দেশেই বিনিয়োগ হয় প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে। পুঁজিবাদের এটা খুব সাধারণ প্রপঞ্চ। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে এই প্রবণতা পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ওয়ান ইলেভেনের পরে দুর্নীতিবাজরা বুঝতে শুরু করেছে দেশের মধ্যে টাকা রাখলে ধরা খেতে হবে। ফলে শুরু হয় টাকা পাচার। এ কারণে ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর ওয়ান ইলেভেনের পরবর্তী আমলের মত রাস্তাঘাটে টাকার বস্তা পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। হয়তো এটাও যথেষ্ট অংক নয়। ৩৬ জুলাই এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি এই হিসেব। অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকার এই হিসেবটা ধরতে পারায় তাদের আমলের দুর্নীতিবাজরা আরও সতর্ক হয়েছে। সে আমলে হুন্ডির পরিবর্তে ক্রিপ্টো কারেন্সিতে বিনিয়োগের আলোচনা সামনে এসেছে। ফলে আলোচনা থাকলেও, অনুধাবন করা গেলেও এটা বের করা আরো কঠিন হয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা গুলোর মধ্যে এটি একটি। আমি বহুবার বিভিন্ন জায়গায় এটা বলেছি। আমাদের সকল শ্রেণীর এলিট ক্লাসের ভবিষ্যতের স্বপ্নের আবাসন ও বসবাস দেশের মাটিতে নেই। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা সহ সকল শ্রেণীর পেশাজীবী যাদেরই বিদেশে স্ট্যান্ডার্ড জীবন যাপনের মত অর্থ আছে তারা তাদের ভবিষ্যৎ ঠিকানা বিদেশে খুঁজে নিয়েছে অথবা নেয়ার চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনার আমলে মাদ্রাসা গুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু দায়িত্বশীলদের কাছে ৫-১০ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে বলা হয়েছিল, যদি হিসেব দিতে না পারেন তাহলে সরকার নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করুন। অনেকের প্রাইভেট লাইফের আমলনামাও এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আর এভাবেই মাদ্রাসাগুলো তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল এবং আলেম সমাজের একটি বড় অংশ ‘কাছে ডেকে নাও, ফিরাইওনা জননী’ গান গেয়ে দিন পার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকে, আফগানিস্তানে আক্রমণ করেছে তখনো এদেশের আলেম সমাজ ও বামপন্থীরা আধিপত্যবাদ বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রবল আন্দোলন করেছে। কিন্তু এবারে ইরানের উপর এই অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই দেশে তেমন কোন আন্দোলন হয়নি। উল্লিখিত শ্রেণীর পক্ষ থেকেও তেমন জোরালো আন্দোলন, মিছিল দেখিনি। যেটুকু হয়েছে নামকাওয়াস্তে। কেননা হাসিনার ১৫ বছরে বামপন্থীদেরও টাকা হয়েছে। তাদের সন্তানরাও এখন বিদেশে পড়ে। আলেমরা এখন পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। কেননা ভিসা বন্ধ হয়ে গেলে বিদেশে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ডলার অর্জনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের বা সন্তানদের ভবিষ্যতের আলাপ তো আছেই। অনেকে নানা কারণে নিজে যেতে না পারলেও সন্তান-সন্ততিদের পাঠিয়ে দিয়েছে। ফলে এই দেশ তাদের কাছে একটা টাকা কামানোর বাজার। এখানে যত পারে, যেভাবে পারে এবং যত দ্রুত পারে টাকা কামায়, এবং বিদেশে বিনিয়োগ করে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের আশায়।

যে লোকটি গ্রাম ছেড়ে শহরে বাড়ি করেছে, তার কাছে গ্রামের উন্নয়নের গুরুত্ব থাকে না। সর্বোচ্চ ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য নিজের গাড়িটাকে যেন কাদা না মাড়িয়ে যেতে হয় সেজন্য রাস্তাটা পাকা এবং দু একটি দিন থাকার জন্য নিজের বাড়িটা একটু উন্নত করে। এর চেয়ে বেশি নয়। আমাদের এই এলিট ক্লাসের ক্ষেত্রেও একথা সর্বাংশে সত্য। অনেকে আবার এখনই যেতে না পারায় সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য উন্নত দেশে যাচ্ছে। সেখান থেকে বার্থ সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে দেশে ফিরে আসছে। দেশের আলো হওয়ায় বেড়ে উঠছে তাদের বিদেশী সন্তান। ফলে গ্রাম ছাড়া ওই শহুরে মানুষের মতোই আমাদের এলিট ক্লাস দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিয়ে ভাবে না। তারা প্রজেক্ট করে, কারণ এর মধ্য দিয়ে টাকা কামাই করা যায়। এজন্য পার্লামেন্টে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনে আইনি সংস্কারের আলাপের চেয়ে এমপিদের কন্ঠে অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি বেশি। কেননা নিজের এলাকায় যত প্রজেক্ট, তত বেশি ইনকাম। আমলারাও যে মন্ত্রণালয় বা যেই পোস্টে যত বেশি প্রজেক্ট, যত বেশি আয় বহির্ভূত ইনকাম সেই মন্ত্রণালয় বা সেই পোস্টে যাওয়ার ডিমান্ড তাদের তত বেশি। এ কারণে এই পুরো একটা করাপ্ট সোসাইটি নিয়ে আমি খুব বেশি আশাবাদী নই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী এমপি ও সমর্থক ব্যবসায়ী ও আমলারা ফাইভ আইজ কান্ট্রিজে টাকা পাচারের পরিবর্তে আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলোকে বেছে নিয়েছিল। উন্নত ও নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য কেবল বাংলাদেশ নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ তাদের কালো টাকার একটি অংশ এই সব দেশে বিনিয়োগ করে বসবাস করে থাকে। কিন্তু অকস্মাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের মাথায় হাত! কেননা দুবাই গভীর সংকটে। পর্যটকদের আগমন ব্যাপকভাবে কমে গেছে, দুবাইয়ের অর্থনীতি পর্যটনের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যে হোটেল গুলো কয়েক মাস আগে বুকিং দিতে হতো এখন তা খালি থাকছে। সম্ভাব্য ইরানি বোমা হামলা এবং দুবাই পুলিশের নিপীড়নের ভয়ে পশ্চিমারা দুবাই ছেড়ে পালাচ্ছে।

উচ্চ ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তার কারণে পুঁজি অন্যান্য ট্যাক্স হেভেনে চলে যাচ্ছে। কেউই মনে করছে না, স্থায়ীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে। বুর্জ আল আরবের মতো বড় হোটেলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় রাজস্বে ব্যাপক ক্ষতি এবং কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। রাজস্ব ক্ষতির কারণে হোটেল কর্তৃপক্ষ কর্মী ছাঁটাই করছে বা তাদের বেতন কমিয়ে দিচ্ছে। দুবাইয়ের সম্পত্তির দাম ধসে পড়েছে। ফোনে বাংলাদেশ থেকে যারা বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করে দুবাইয়ে সম্পদ কিনেছে, তাদের সেই সম্পদের দাম এখন পড়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো গণমাধ্যমও এই তথ্য স্বীকার করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি জিসিসি কান্ট্রিজগুলোর কাছে দাবি করতে বারবার। অথচ দুবাই বড় আর্থিক সংকটে পড়ে উদ্ধারের জন্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাত পাতছে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আওয়ামী লীগ, পলাতক আওয়ামী নেতা, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন