পাহাড়ে লটকন চাষের সম্ভাবনা, বেড়েছে চাহিদা


একসময় পাহাড়ের ঢালু জমিতে স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া লটকন ফল অবহেলায় নষ্ট হয়ে গাছের নিচে পড়ে থাকত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে টক-মিষ্টি স্বাদের এই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফলটির চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও মাটিরাঙ্গার লটকন যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে মাটিরাঙ্গা উপজেলার একটি পাহাড়ি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে মাঝারি আকৃতির গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালি রঙের লটকন। ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে অনেক ডাল। এমনই একটি সফল বাগানের মালিক কৃষক নুর আলম।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ৯ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছিল। সে সময় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩১ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লটকনের আবাদ বেড়ে ১২ হেক্টরে পৌঁছেছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ মেট্রিক টন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাটিরাঙ্গার ব্যঙ্গমারা, সাপমারা, মোহাম্মদপুর, রসুলপুর ও আটবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় লটকনের গাছ রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের কাছে পরিচিত এই ফলটি চাকমা ভাষায় ‘পচিমগুল’, মারমা ভাষায় ‘ক্যানাইজুসি’ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ‘খুচমাই’ নামে পরিচিত। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে লটকন পাকতে শুরু করে। এ সময় বাজারে ফলটির সরবরাহ বাড়ে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি লটকন ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
২০১৯ সালের গোড়ার দিকে, মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা মেঠো পথ বেয়ে, রসুলপুর নামক এলাকায় গভীর অরণ্য ভেদ করে ১৩ একর জায়গা জুড়ে তিনি বিভিন্ন ফলের গাছ রোপণ করেন।
এই বাগানে তিনি ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহপূর্বক ১০০টি টিস্যু কালচার খেজুরের চারা, চাইনিজ কমলা গাছ, রামভুটান, লংগান, মিয়াজাকি আম, গুরুমতি, ভিয়েতনামি মাল্টা, কাটিমন আম, মিশরীয় মাল্টা, রিং মাল্টা, আলুবোখারা, আপেল, নাসপাতি, এ্যাভোকেটর, লটকন সহ বিভিন্নজাতের ফলের গাছ রয়েছে এই বাগান টিতে।
নুর আলম জানান, ২০২২ সালের শুরুর দিকে তিনি উক্ত জমিতে ৬০টি উন্নত জাতের লটকন গাছ রোপণ করেন। নরসিংদী থেকে প্রতিটি কলম ৩০০ টাকা করে কিনে আনেন তিনি। গত বছর প্রথমবারের মতো তার বাগানে ফল আসে। সে সময় প্রায় ২০০ কেজি লটকন সংগ্রহ করা হয়। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কেজি ফলন পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, “বড় একটি গাছ থেকে ২২ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। গত বছর প্রতি কেজি লটকন ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ফল চাষে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি।”
স্থানীয় চাষী মোস্তফা কামাল মো. বলেন, “দিন দিন স্থানীয় বাজারে লটকনের চাহিদা বাড়ছে। এর ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অন্যান্য ফলের পাশাপাশি লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা আর্থিকভাবে আরও লাভবান হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।”
অপর এক চাষী এনামুল হক বলেন, “ ৫বছর আগে সখের বসে ৪টি লটকন গাছ রোপন করেন। গাছের পরিচর্যা তুলনামূলক মেন করা লাগেনা। গত ২বছর যাবৎ ভালে ফল দিচ্ছে। পাহাড়ি পরিবেশে গাছ ভালো হয় এবং রোগবালাইও কম। তাই অনেক তরুণ কৃষক এখন লটকন চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “লটকন একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক ফল। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

















