নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা

বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিক স্টিভ রসের অস্বাভাবিক তৎপরতা ও গোপন মিশন

fec-image

মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত এবং রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতি যখন এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিক স্টিভেন ব্রাডলি রস ওরফে স্টিভ রসের অস্বাভাবিক তৎপরতা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্টিমসন সেন্টার’-এর সিনিয়র ফেলো পরিচয়ে তিনি বাংলাদেশে যাতায়াত করলেও, তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি নিছক একাডেমিক গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে ‘ইন্টেলিজেন্স অপারেটর’ বা প্রভাবশালী লবিস্টের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বা সরকারি পদ-পদবি না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সচিবালয় থেকে জাতীয় সংসদ ভবন পর্যন্ত তার অবাধ বিচরণ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলো এখন বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নের সম্মুখীন।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত স্টিভ রস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিরতিতে অন্তত পাঁচবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে তিনি এক মাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেন। সবশেষ ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তার সফরটি ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ এবং রহস্যময়। গত ২৫ মার্চ কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মী ও সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। বিশেষ করে ২৬ মার্চ কক্সবাজারে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (NRC) উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন গবেষকের কেন সরাসরি মাঠ পর্যায়ের অপারেশনাল ও কৌশলগত ইস্যুতে এত গভীর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে।

সফরের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি ছিল ২৯ ও ৩০ মার্চের কার্যক্রম। ২৯ মার্চ তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরদিন ৩০ মার্চ সরাসরি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। একই দিনে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনে একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। প্রশাসনের অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে একজন বিদেশি নাগরিকের এমন প্রটোকলহীন প্রবেশাধিকারকে নজিরবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র বলছে, সচিবালয় ও সংসদে তার এই মুভমেন্টগুলো মূলত বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে একটি বিশেষ সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুকূলে প্রবাহিত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্টিভ রস শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (RRRC) তোয়াক্কা না করেই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একাধিকবার যাতায়াত করেছেন। গত ২৮ জুন কুতুপালংয়ের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বাসভবনে ১০ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে গোপনে তিনি বৈঠক করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন আর্থিক প্রলোভন ও বিশেষ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।

এই প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গে ফরটিফাই রাইটসের জন কুইনলি, ব্রিটিশ একটিভিস্ট শাফিউর রহমান, থমাস কীন, ইভা বুজো এবং এমা লেসলির মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকজন গবেষক ও কর্মীর সমন্বয়ে একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলে অনুসন্ধানে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

থমাস কীন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (ICG)-এ মিয়ানমার ও বাংলাদেশের জন্য সিনিয়র কনসালট্যান্ট। তিনি ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমারের পরিচালক ও এডিটর-অ্যাট-লার্জ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পূর্বে প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ড. এমা লেসলি কম্বোডিয়াভিত্তিক সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। ইভা বুজো অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ভিকটিম অ্যাডভোকেটস ইন্টারন্যাশনাল-এর নির্বাহী পরিচালক। তিনি নিউ সাউথ ওয়েলস বার অ্যাসোসিয়েশনের মানবাধিকার কমিটির সদস্য এবং পূর্বে ওয়ার্ল্ড ভিশন ও সেভ দ্য চিলড্রেনের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।

এই নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অনিরাপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়- যা পরোক্ষভাবে রাখাইনে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে আরাকান আর্মি স্টিভ রসকে তাদের আন্তর্জাতিক লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ করেছে। ২০২৪ সাল থেকে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ওপর পদ্ধতিগত গণহত্যা, উচ্ছেদ এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছে। স্টিভ রস এবং তার সিন্ডিকেট আন্তর্জাতিক মহলে আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ‘একমাত্র নির্ধারক’ হিসেবে উপস্থাপন করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে তাদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনে প্ররোচিত করা। তারা নীতিনির্ধারকদের এই যুক্তিতে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন যে, ‘মানবিক করিডোর’ খোলার মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে তুষ্ট করলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজতর হবে। প্রকৃতপক্ষে, এমন পদক্ষেপ বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উৎস : পার্বত্য সময় অনলাইন

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন