মর্যাদাপূর্ণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত শক্তিশালী সীমান্ত নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনী

fec-image

জাতিসংঘ কোনো জাতির স্বাধীনতার জন্য আলোচনা করেছে এবং তাতে সফল হয়েছে—এমন উদাহরণ মেলা ভার। তারা কেবল তথাকথিত তহবিল সংগ্রহ ও মানবিক সহায়তার কাজেই সফল। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে—তারা একটি সংগ্রামী জাতিকে মুক্তিকামী না বানিয়ে ত্রাণ-নির্ভর জাতিতে পরিণত করে।

রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় আট বছর পার হয়ে গেল, অথচ এই আলোচনা এখনো জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত। যেমন ত্রাণের জন্য তাদের আরও টাকা চাই; কিন্তু তারা সংগৃহীত তহবিলের হিসাব বা স্বচ্ছতার ব্যাপারে কখনোই কিছু জানায় না। তারা এনজিওর ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর কথা বলে, অথচ নিজেদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর জন্য তারা কী করছে, তা নিয়ে খুব কমই কথা বলে।

কক্সবাজারে স্থানীয়করণের (মানবিক সহায়তার স্থানীয়করণ ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর অফিসিয়াল পলিসি) বিষয়ে তাদের বোঝাতে আমরা ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘের পেছনে ঘুরছি। কোস্ট ও সিসিএনএফ প্রায় ৫০টি ইভেন্ট আয়োজন করেছে, কিন্তু তারা স্থানীয় এনজিওগুলোকে (যেসব এনজিও স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত ও যাদের নেতৃত্ব জন্মসূত্রে কক্সবাজারের) অর্থায়ন করেনি বললেই চলে। কিন্তু আজকাল জাতিসংঘের এই সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট দুটি এনজিওকে অর্থায়নের বিষয়ে মনোযোগী হয়েছে। একটি এনজিওতেই ৩৪টি অর্থায়ন প্রকল্প রয়েছে, যার নেতৃত্ব কক্সবাজারের বাইরের এবং যার শীর্ষ নীতি নির্ধারণী কমিটির গঠন সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ।

ঐতিহাসিকভাবে, বাঙালি মুসলমানদের মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার, বিশেষ করে কক্সবাজারে ক্যাপ্টেন কক্সকে নিযুক্ত করেছিল সেই বাঙালি মুসলমানদের পুনর্বাসন তদারকি করার জন্য। আর ২০১৭ সালের অনুপ্রবেশের কথাই ধরা যাক—প্রথম ৪০ দিন স্থানীয় এনজিও ও স্থানীয় মানুষই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও খাবার দিয়েছিল; জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক এনজিও ও বড় বড় জাতীয় এনজিওগুলো আরও পরে এসেছিল। এখন জাতিসংঘের সংস্থাগুলো আইএনজিওদের অংশীদারিত্ব দিচ্ছে, যাদের রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং তাদের ওপর ঘটে যাওয়া গণহত্যার জবাবদিহিতা নিয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৬০টি আইএনজিও কাজ করছে, যারা চাইলে তাদের নিজ নিজ দেশের রাজধানীতে এই বিষয়ে প্রচারণা চালাতে পারত। কিন্তু তারা তা খুব কমই করেছে; বরং তারা স্থানীয় এনজিওগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এবং স্থানীয় এনজিওর নেতৃত্বের জায়গা দখল করে নিচ্ছে।

দুটি বিষয় লক্ষণীয়—জাতিসংঘ সরকারের কাছে আরও জমি দাবি করছে। ঐতিহাসিকভাবে আমরা আমাদের সরকারকে জাতিসংঘের সঙ্গে দরকষাকষিতে তেমন একটা শক্তিশালী অবস্থানে দেখিনি। প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের তেমন কোনো আলোচনা বা তৎপরতা নেই বললেই চলে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি হলো, তারা মিয়ানমার সীমান্তে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ চায়। এই পরিস্থিতিতে হয়তো সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, সরকারের উচিত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আমাদের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা। আমি আমাদের সাবেক সেনাপ্রধানের একটি বক্তব্য স্মরণ করতে চাই, যেখানে তিনি বলেছিলেন—যদি আমাদের একটি শক্তিশালী বিমানবাহিনী থাকত, তবে হয়তো এই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটত না।

মিয়ানমারে প্রচুর জাতিগত সংঘাত রয়েছে, এমনকি কিছু জাতিগত গোষ্ঠীর নিজস্ব সেনাবাহিনীও রয়েছে, যেমন আরাকান আর্মি। তবে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছে, যা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। একটি তত্ত্ব রয়েছে যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য আমাদের সীমান্তে ইয়াবা কারখানা স্থাপনে সহায়তা করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অস্ত্র কেনার জন্য তাদের ডলার সরবরাহ করেছে। জাতিগত যুদ্ধের মধ্যেও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে ব্যয়বহুল তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের রিগ স্থাপন করেছে।

এখন, আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের বিষয়ে এটি একটি অপরিহার্য সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমাদের অবশ্যই শক্তিশালী সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী বিমান ও নৌবাহিনী থাকতে হবে। তবেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি বাংলাদেশকে তোয়াক্কা করবে এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন মেনে নেবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বা শরণার্থীদের নিজেদেরও আত্মোপলব্ধি করতে হবে এবং নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের নিজেদের সংগঠিত হতে হবে, কারো ওপর নির্ভর করা চলবে না; নিজেদের মুক্তির জন্য তাদের নিজস্ব নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।

যদি কেউ মনে করেন যে চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা মালয়েশিয়া এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে, তবে আমরা বোকার স্বর্গে বাস করছি। আমাদের অবশ্যই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: উখিয়া, কক্সবাজার, জাতিসংঘ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন