রোজায় খাবার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ঝাঁউবাগানের বস্তিবাসী


ইফতারের বাকী আর মাত্র আধঘণ্টা। মধ্যবয়সী এক নারী ঝুপড়ি ঘরের বাইরে বসানো মাটির চুলায় হলুদ-লবণ মেশানো ভুট্টা সিদ্ধ করছিলেন। কাছে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, তিনি এই সিদ্ধ ভুট্টা দিয়েই ইফতার করবেন। শুধু এই দিন বলে কথা নয় এবারের রমজানের বেশিরভাগ সময়’ই সিদ্ধ ভুট্টা আর শাকভাত দিয়ে ইফতার করেছেন। সেহরি কি দিয়ে করেছেন এমন প্রশ্নে বলেন, ‘আজ শুকনা মাছ দিয়ে, গতকাল লবণ মেশানো ভাত দিয়ে আর আগের দিন শাক দিয়ে। তবে গত শুক্রবারে পাঙাস মাছ খেয়ে রোজা রেখেছি’।
এমন অবস্থা কেন’র উত্তরে বলেন, তার স্বামী পঙ্গু। কোন ছেলে সন্তান নেই। পাঁচ সন্তানই মেয়ে। পরিবারে তিনি ছাড়া আয় করার কেউ নেই। সমুদ্র পাড়ের সবজি ক্ষেতে কাজ আর ভাঙারি কুড়িয়ে যা পায় তা দিয়ে’ই সংসার চলে। যেখানে দু’বেলা খাবার যোগাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ভাল খাবার দিয়ে সেহরি-ইফতার যেন তার কাছে বিলাসিতা।
এসব কথা বলছিলেন কক্সবাজার শহরের সমুদ্রের পাড়স্থ কবিতাচত্বর সংলগ্ন ঝাঁউবাগানের বস্তিবাসী ফরিদ আলমের স্ত্রী মঞ্জুরা বেগম (৪৭)। শুধু তিনি’ই নন ওই বস্তির অর্ধশত পরিবারের বেশিরভাগের’ই দারিদ্রতার মাঝে মানবেতর দিন কাটছে। তাদের একবেলা খেলে অন্যবেলার চিন্তা।
ওখানের আরেক নারী হালিমা খাতুন জানান, ‘ক্ষেতের শাক বিক্রি করে দিনে ১-২’শ টাকা পাওয়া যায়। ওই দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলে। ইফতার মানেই শাক দিয়ে একদম রাতের খাবার। সেই রোজার প্রথমদিনে ১ কেজি ছোলা-মুড়ি কিনেছিলেন। অল্প-অল্প দিয়েও ৪ সদস্যের পরিবারে অনেক আগেই তা শেষ হয়ে গেছে। খুব মন চায় একবেলা ঘি’ দিয়ে ভাত খেতে।’
একই বস্তির মোতালেব মিয়া জানান, ‘রিকশা চালিয়ে যে টাকা পায় সেই টাকা দিয়ে ৬ সদস্যের সংসার ঠিকমতো চলেনা। ছোট মেয়েটি অনেকবার মাংস দিয়ে ভাত আর বড়লোকদের মত ছোলা-মুড়ি-সরবত দিয়ে ইফতার করতে চেয়েছে। সার্মথ না থাকায় তার বায়না এখনো পূর্ণ করা হলোনা। নিজে না খেলেও সন্তানদের মাছ-মাংস খাওয়াতে মন চায়। যখন দেখি অন্যের বাচ্চারা ভালো-মন্দ খায় তখন খুব কষ্ট লাগে। কত মানুষ সাহায্য- সহযোগিতা করে কিন্তু আমাদের কেউ করেনা। অবশ্য লজ্জার কারণে আমরাও কারো কাছে হাত পাতিনি।’
কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সহকারী শিক্ষক (গণিত) মোহাম্মদ আশিক উল্লাহ বলেন, অনেকের কাছে রমজান মানেই হরেক রকম খাবার দিয়ে ইফতার-সেহরি। অন্যদিকে অনেকে এক বেলা খাবার যোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। পবিত্র রমজানের দিনেও ধনী-গরিবের বৈষম্য সত্যি’ই দুঃখজনক। বেশি না খেয়ে ভাগাভাগি করে খেলে এমন হত না।
সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা জানান, সমুদ্রের পাড়স্থ ঝাঁউবাগানের বস্তিবাসীর জীবন চিত্র দেখে খুবই খারাপ লাগছে। প্রতিবেশীকে উপোস রেখে পেট ভরে খেলে হবেনা। অপ্রিয় হলেও সত্য অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থার এই চর্চা’ই চলছে। সচ্ছলদের প্রয়োজন অসহায় মানুষদের সহযোগিতার এগিয়ে আসা। এতে উপকৃত মানুষটি যেমন খুশি হবে ঠিক তেমনটি যে সহযোগিতা করছেন তারও ভাল লাগবে।
এলাকার (১১ নং ওয়ার্ড) কাউন্সিলর নুর মোহাম্মদ জানান, ঝাউবাগানের বস্তিবাসীরা খুবই দরিদ্র। খেয়ে না খেয়ে তাদের জীবন চলে। এই সমাজে অনেকে চাহিদার চেয়ে বেশি খাচ্ছেন আবার অনেকে চাহিদাটাই পূরণ করতে পারছেনা। তারা না খেয়ে থাকার দায়ভার আমাদের সবার উপর পড়ে। কেউ ভাল খাবে আর কেউ একদমই খাবে না, এমনটা হতে পারেনা। তাদের সহযোগিতায় আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তখনই এই হতদরিদ্র মানুষগুলো উপকৃত হবে।

















