সত্য দিয়ে মিথ্যা মোকাবিলা: মিয়ানমারের ব্যাপারে সত্য বলতে হবে, ১০ হাজার বার

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:
দশ বছর ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সরকার। বিষয়টা জটিল নয়। এটা হলো একটি ধর্ম তথা বৌদ্ধদের অপর একটি ধর্ম ইসলামের অনুসারীদের নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড চালানোর সোজাসাপ্টা নীতি।
এটা বড় ধরনের সাহসিকতার কাজ। পিউ সমীক্ষা অনুযায়ী, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা কমছে, আর ইসলাম ধর্মের লোক বাড়ছে। অন্য ধর্মের লোকজনের ইসলাম গ্রহণের হার অন্যগুলোর চেয়ে বেশি। মুসলিম বিশ্ব বৌদ্ধদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর।
মিয়ানমারের পদক্ষেপের ফলে যে দেশটিকে তাৎক্ষণিক মূল্য দিতে হয়েছে সে হলো বাংলাদেশ। আমি ‘দি গ্রেট লাই’ (মহা মিথ্যা কথন)-এ আমি হিসাব দিয়েছিলাম, ২০১৭ সালে আরো ছয় লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। ফলে বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ লাখের বেশি।
মহা মিথ্যা
এসব উদ্বাস্তুকে ন্যূনতম পর্যায়ে অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে গেলে বছরে খরচ হবে ২০০ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত মিয়ানমার। তাদের মারাত্মক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বোঝা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
আগের প্রতিবেদনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের উচিত গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমার নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। লক্ষ্য হওয়া উচিত, তাদেরকে সারা জীবনের জন্য কারারুদ্ধ করা।
এতে দীর্ঘ সময় লাগবে। কারণ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এখনো বেশ দুর্বল। এই আইনগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, তবে পর্যাপ্ত নয়। সত্য বলার মাধ্যমে চরম মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
চীন ও রাশিয়ার সম্পদ জড়ো হয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। থাইল্যান্ড ও ভারতের ব্যাপারে কিছু না হয় না-ই বলা হলো।
তাছাড়া বিপুলসংখ্যক বেপরোয়া উদ্বাস্তুর উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। উদ্বাস্তুরা ইসলাম সম্পর্কে চরম দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে বাংলাদেশের জন্য তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠবে।
পেছনে ফেরা নয়
এসব লোককে উদ্বাস্তু শিবিরে ঠাঁই দেওয়ার পর প্রথম কাজ হবে কোনো সেক্যুলার স্কুল ব্যবস্থায় তাদের পড়াশোনা নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা।
উদ্বাস্তুদের মধ্য থেকেই সেরা শিক্ষক বাছাই করা যায়। পড়ানোর বিনিময়ে তারা বেতন পাবেন।
রোহিঙ্গা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তাদের উচিত হবে ইতিহাস সংরক্ষণ করা। মিয়ানমার তাদেরকে কখনো ফিরিয়ে নেবে, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মিয়ানমারের নেতারা নির্দয়, বেপরোয়া ব্যক্তি। তারা তাদের জাতিকে ব্যর্থ করেছেন। উদ্বাস্তুদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বাস্তবভিত্তিকভাবে এটা ধরে নিয়ে যে, তারা আর কখনো ফিরতে পারবে না।
কী হতে পারে যৌক্তিক কর্মসূচি? প্রথমত, সব দেশের কাছে গিয়ে তাদেরকে এসব উদ্বাস্তেুর কিছু অংশ গ্রহণ করতে রাজি করানোর চেষ্টা করা। হয়তো পাঁচ বছরে তাদের অর্ধেককে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে সেটা করার জন্য আরো কিছু কাজ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সময়ে শিশুদের স্কুলে দিতে হবে, মুসলিম মৌলবাদীরা যাতে সহিংসতা প্রচার করার সুযোগ না পায়, সেটা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।
এসব কঠিন কাজ। তবে মুসলিম রাষ্ট্র এবং সম্ভবত পাশ্চাত্য জাতিগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া যাবে।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান দেশগুলোর যেসব দেশকে এসব উদ্বাস্তুর কিছু অংশকে গ্রহণ করতে বলা হবে, তারা কী চায়, সে অনুযায়ী তাদেরকে প্রস্তুত করাটাও হবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি কোনো কোনো দেশও উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করতে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারে চীন, ভারত, রাশিয়া। তবে পরিণামে তা তাদের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থেই জোরালোভাবে দাবি করা উচিত, এসব দেশ গণহত্যায় সমর্থন দিচ্ছে।
মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা যায় না
আরেকটি কৌশলী ক্ষেত্র হলো মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক। সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, মিয়ানমার সরকারের কার্যক্রম যুদ্ধের সাথে তুলনীয়। ১০ লাখ লোককে সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়া সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের ক্ষতি করা এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা। বাংলাদেশের উচিত হবে না সেটাকে জবাবহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া।
মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা যায় না। সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা উচিত, অতিরিক্ত জনশক্তি, সরঞ্জাম, যুদ্ধে ব্যবহার্য গোলাবারুদের মজুত দিয়ে ডিভিশনগুলো আপগ্রেড করে প্রস্তুত রাখা উচিত। সীমান্তে যেকোনো লঙ্ঘন মোকাবিলার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতি থাকা দরকার।
এসবের মধ্যে থাকা দরকার বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা মিয়ানমারের যেকোনো হেলিকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করা, বাংলাদেশে মিয়ানমার বাহিনীর যেকোনো ধরনের গুলিবর্ষণের পাল্টা জবাব দেওয়া, মিয়ানমার সীমান্তের এক মাইলের মধ্যে নির্যাতনের শিকার উদ্বাস্তুদের সহায়তা করা।
প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছেন। এখন এই বাহিনী এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে নিবৃত্ত রাখার মতো অস্ত্র বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিজিবি) নেই।
গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলোকে অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরতে হবে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশন সবে শেষ হলো। এখন সময় হলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করা।
বর্তমানের সময় হলো মহা মিথ্যার বেসাতির বিরুদ্ধে লড়াই করা। এখন সময় হলো এখানে যা ঘটেছে, তা বাকি বিশ্বকে জানানো এবং তারা যেন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়, সেজন্য তাদের বাধ্য করা।
আমরা ধরে নিতে পারি, রাশিয়া ও চীন জোরালোভাবে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়াবে এবং মহা মিথ্যা প্রচার করবে। তবে বেশির ভাগ দেশ তা দেখে বাংলাদেশকে সমর্থন করবে।
মহা মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সত্য অবশ্যই ১০ হাজার বার বলতে হবে। এটা অর্জনের জন্য সক্রিয় জনসংযোগ নীতি থাকতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের জন্য বিশেষ জরুরি দায়িত্ব হলো উদ্বাস্তুদের সমর্থন নিয়ন্ত্রণ করা এবং আরো ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করা।
সরকারের হাতে
বর্তমানে বেশির ভাগ কাজ করছে ইসলামি সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ হলো ইসলাম প্রাধান্য থাকা একটি সেক্যুলার দেশ। তা-ই রোহিঙ্গাদের দেখভাল, শিক্ষা ও অর্থায়নের ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সরকারের হাতে থাকতে হবে।
এনজিও এবং ধর্মীয় গ্রুপগুলোর সহায়তা সুনির্দিষ্ট নীতির আওতায় অনুমোদন করা উচিত।
উদ্বাস্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অপচয় করার মতো কোনো সময়ই নেই। সেটা না করতে পারলে উদ্বাস্তু সঙ্কট ক্রমে কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে ইসলামি সহিংস গ্রুপগুলোর রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে পরিণত হবে রোহিঙ্গারা।
তখন পাশ্চাত্য দেশগুলো কোনো উদ্বাস্তুকে গ্রহণ করতে রাজি হবে না, অপরাধমূলক তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
জাতিকে হয়তো অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত এসব উদ্বাস্তুকে নিয়ে থাকতে হবে।
আরসা তথা ‘আরাকান স্যালভেশন আর্মি’র প্রশ্নটি খুবই জটিল একটি বিষয়। নির্দেশনা ও আংশিক নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার জন্য এই গ্রুপের কাছ থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন নেওয়া উচিত হবে কি? এই প্রশ্নের জবাব আমি জানি না। তবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নেতাদের এটা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধর্মীয় সমীকরণ নির্ভর করছে সরকারের দৃঢ়হাতে পরিস্থিতি সামলানো, উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ লাভ, সীমান্ত রক্ষা এবং মানববতাবিরোধী ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বক্তব্য তুলে ধরার ওপর।
মিয়ানমারের প্রতি চীন ও রাশিয়ার সমর্থনে বিস্ময়ের কিছু নেই। রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে এই দুই দেশের কোনো কালেই নৈতিক ভিত্তি ছিল না। উভয় দেশই আরো শক্তি সংহত করার জন্য তাদের নিজ দেশের কোটি কোটি লোককে হত্যা করেছে।
তবে মিয়ানমারের পক্ষ নেওয়া এবং জঘন্য মিথ্যাচারের সাথে সম্পৃক্ত হওয়াটা ভারতের জন্য লজ্জাজনক। প্রধানমন্ত্রীকে তাদের পক্ষে ব্যবহারের চেষ্টা করবে ভারত। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারত কখনোই সফল হবে না।
তার সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রতি দৃঢ় মনোভাব এবং সেইসাথে ইসলামকে মৌলিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরাটা এসব জঘন্য মিথ্যাচার থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে।
লেখক: মার্কিন অর্থনীতিবিদ/সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

















