সুর্মী চাকমার বক্তব্যে একাত্তরের রাজাকার চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রসঙ্গ


ডাকসু নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের কমনরুম, পাঠকক্ষ ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক প্রার্থী সুর্মী চাকমার বক্তব্যে ফের উঠে এলো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে বিশস্ত ও যোগ্য পাহারাদার চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রসঙ্গ।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক প্রার্থী ফাতেমা তাসনিম মহান মুক্তিযুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের অবদান অস্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ তুলে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল গতকাল ৩০ আগস্ট ঢাবি ক্যাম্পাসের যে সংবাদ সম্মেলন করে সেখানে সুর্মী চাকমাও বক্তব্য রাখেন।
তিনি ফাতেমা তাসনিমের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানিয়ে বলেন, ত্রিদিব রায়কে আপনারা পাকিস্তানপন্থী হিসেবে চেনেন। কিন্তু ত্রিদিব রায় ভিন্ন অন্য যারা ছিলেন, তার চাচা কে কে রায়, পাশাপাশি হেমারঞ্জন চাকমা, অমৃত রায় চাকমা, সঞ্জয় কেতন চাকমা, স্নেহকুমার চাকমা, মতিলাল চাকমা, রমণী রঞ্জন চাকমা প্রমূখ ছাড়াও গৌতম দেওয়ান যিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছিলেন, তাদের অবদানকে অস্বীকার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমার নিজের পরিবারে আমার দাদুর ভাই সৌলম্বর চাকমা তিনি নিজে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কখনো সার্টিফিকেট গ্রহণ করেননি বা মুক্তিযুদ্ধের নাম বিকিয়ে কোনো সুবিধা গ্রহণ করার চেষ্টা করেননি। আজ সৌলম্বর চাকমা নেই। কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে অস্বীকার করতে পারি না।
তিনি বলেন, ফাতেমা তাসনিম মুক্তিযুদ্ধে চাকমা জাতিগোষ্ঠীর অংশীদারত্ব অস্বীকার করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি এই বক্তব্যের ধিক্কার জানাই।’
কে এই চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়-
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে জয়লাভকারী ২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১ জন হলেন রাজা ত্রিদিব রায়। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত রাজা ত্রিদিব রায় ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে বিশস্ত ও যোগ্য পাহারাদার। এরই ধারাবাহিকতায় রাজা ত্রিদিব রায় ১৯৭১ সালে রাঙ্গামাটিতে রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালে রাজা ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি জনসভা করেন। যেগুলোর মধ্যে মে মাসে রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ির জনসভা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেগুলোতে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে বলে বক্তব্য শেষ করেন।
১৯৭১ সালে রাজা ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সহায়তা করেছেন। ৯ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে রাজা ত্রিদিব রায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধধর্মাবলম্বী দেশসমূহে পাক হানাদার বাহিনীর অবস্থান পোক্ত রাখার মিশনে গমন করেন। কিন্তু ব্যাংককে পৌঁছে জরুরি বার্তা পেয়ে তিনি চট্টগ্রামে ফেরত আসেন এবং জানতে পারেন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হতে পারে, তাই তাঁর জন্য আপাততঃ দেশ ত্যাগই সর্বোত্তম।
১১ নভেম্বর ১৯৭১ রাজা ত্রিদিব রায় ঢাকা থেকে করাচি গমন করেন। ১২ নভেম্বর ১৯৭১ সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান তাকে রাষ্ট্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি এবং দূত হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর আনুগত্য ফল দেওয়া শুরু করেছে, এটাকে এখন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রমাণ করতে হবে। যদিও এটা তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক মিশন নয়, এর আগেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে গমন করেছিলেন। এবার তাঁর প্রথম মিশন হলো কলম্বো’তে পশ্চিম পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর রিফুয়েলিং বজায় রাখা এবং শ্রীলঙ্কার আকাশসীমা ব্যবহার চালু রাখা। যেহেতু ভারতীয় আকাশসীমা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
যুক্তফ্রন্ট ও পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিমলীগ/আওয়ামীলীগ এর একচেটিয়া জনপ্রিয়তা এবং পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর অবর্ণনীয় অন্যায় ও অত্যাচারের পরও তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন আসলেই ব্যাপক গবেষণার বিষয়।
১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রাজা ত্রিদিব রায় স্বীয় মাতা এবং জন্মভূমির ডাক আবারও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চীনের ভেটো প্রদানের ফলে রেজুলেশন ২৯৩৭ (XXVII) বিফল হয় এবং বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির প্রথম চেষ্টায় ১০০টিরও বেশি দেশের সমর্থন থাকার পরও ব্যর্থ হয়। এতে পুরো পশ্চিম পাকিস্তান খুবই খুশি হয়।
১৯৭২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের যোগদানের আবেদনের বিরোধিতা করার জন্য পাকিস্তান প্রেরিত প্রতিনিধি দলে ত্রিদিব রায় প্রধান ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন ত্রিদিব রায়ের মা বিনিতা রায়। অধিবেশনের পূর্বে নিউইয়র্কে তাদের দুইজনের সাক্ষাত হয়। মা তাকে দেশে ফেরার অনুরোধ জানালেও তিনি তা গ্রহণ করেননি বলে জানা যায়। অধিবেশন শেষে তিনি পাকিস্তান ফিরে যান। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭২ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসার সময় সকল প্রটোকল ভেঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো বিমানবন্দরে রাজা ত্রিদিব রায়কে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির হন!
চূড়ান্তভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বাংলাদেশ সরকার রাজা ত্রিদিব রায়কে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায়।
মোটাদাগে রাজা ত্রিদিব রায় এর সামনে বারংবার নিজের জন্মভূমি ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য অবদান রেখে ইতিহাসের অংশ হওয়ার সুযোগ আসলেও তিনি প্রতিবারই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বা পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য অবদান রেখেছেন। রাজা ত্রিদিব রায় প্রমাণ করেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত জেদ ও মতামতের কাছে জন্মভূমি, মাতা, পরিবার ও জাতিগোষ্ঠী তুচ্ছ। নিজের জেদ এবং মতামত যথার্থ প্রমাণ করার জন্য তিনি নরপিশাচদের আনুগত্য করতেও দ্বিধাগ্রস্থ নন। এ ধরনের দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসে হয়তো খুব বেশি নেই, হয়তোবা এটাই একমাত্র দৃষ্টান্ত!
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাজা ত্রিদিব রায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে রাজা ত্রিদিব রায় যুক্তফ্রন্টের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক আরো জোড়দার করেন।
১৪ মে ১৯৩৩ সালে রাঙ্গামাটিস্থ চাকমা রাজ প্রাসাদে জন্ম গ্রহণ করেন ৪৯তম চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায় ও রাণী বিনিতা রায় এর সন্তান ৫০তম চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়।
২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে ত্রিদিব রায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছা ছিল যাতে তার শেষকৃত্য বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের অসন্তোষের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর দশদিন পর ইসলামাবাদে তাকে দাহ করা হয়।
উৎস : ইন্টারনেট ও পার্বত্যনিউজ আর্কাইভ

















