যে হাটে ‘মানুষ বেচাকেনা’ হয়

fec-image

আধুনিক এই যুগেও প্রতিদিন বসছে মানুষ বেচাকেনার হাট। বয়স, গায়ের শক্তি সমর্থ অনুযায়ী দরদামে নিজেকে বিক্রি করেন তারা। দু-বেলা রুটি-রুজির জন্য প্রতিদিন ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ হাজির হন। ভোরে যখন ঘুমের আলস্য চেপে বসে চোখের পাতায়, কাঁচি কোদাল হাতে তখনই ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে হাটের উদ্দেশ্যে। কেউ পায়ে হেটে, কেউ বা সাইকেলে, আবার কেউ দল বেঁধে অটোভ্যানে।

এটা কোনো পণ্য বেচাকেনার হাট নয়, রীতিমত মানুষ বেচাকেনার হাট। শ্রমজীবি মানুষদের এক দিনের জন্য একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকায় কিনে নেন গৃহস্থ বা বাড়িওয়ালা।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের পাড়াগ্রামের বাগের মোড়ের হাটই সেই ‘মানুষ বেচাকেনার’ হাট। স্থানীয় ভাষায় ‘কিষেন হাটা’ বলেও ডাকেন অনেকে।

প্রতিদিন ভোরে আলফাডাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী মুহাম্মাদপুর, লোহাগড়া উপজেলার অনেক শ্রমজীবী মানুষ এখানে আসেন বিক্রি হওয়ার আশায়। বিক্রি হয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করেন তারা। এ হাটের কৃষানেরা প্রায় সব কাজেই পারদর্শী। কৃষি, ঘর-গৃহস্থালীসহ নানা কাজের জন্য গৃহস্থরা কিনে নেন তাদের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে আবার বাড়ি ফিরে যান কৃষানেরা।

সরেজমিন গিয়ে রবিবার ভোরে পাড়াগ্রাম বাগের মোড়ের কৃষান হাটে অনেক খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তাদের সবাই পেটের দায়ে কাজ করার কথা জানান। পরিবার-পরিজনের ভাত কাপড় ও ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ যোগাতে বিক্রি হন তারা।

মানুষ বিক্রির হাটে আসা পঞ্চশোর্ধ আতর আলী বলেন, ‘গৃহস্থের বাড়িতে সারাদিন কামলা দিয়ে বাজার সদাই কিনে বাড়ি আসি। বউ বাচ্চা নিয়ে চারডে ডালভাত খাইয়ে ঘুমাই পড়ি। কোনো রকমে চলছে সংসার।’

ফরিদপুরে এখন চলছে পাট পঁচানো শেষে আঁশ ছাড়ানো ধোয়া ও শুকানোর কাজ। অন্য সময়ের তুলনায় এখন বিক্রির চাহিদা কম। মানুষ বিক্রির এই হাটের থেকে বিক্রি না হয়েই অনেককে ফিরে যেতে হয় বাড়ি। হাট থেকে ফিরে যাওয়া সেই সকল শ্রমজীবি মানুষের অনেকের চুলাই সেদিন ভাত চড়ে না।

হাটে আসা শক্তিশালী, কর্মক্ষম ও অভিজ্ঞ কৃষানদের কিনে নেন গৃহস্থরা। বয়স্কদের খুব একটা কিনতে চান না কেউ। তবে নারী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কেউ আসে না এই হাটে। দরদামের ভিত্তিতে কৃষান বেচাকেনা করতে দেখা গেছে ক্রেতাদের মধ্যে৷ পণ্য দরদামের মত পছন্দের দামে বিক্রি হন শ্রমজীবি মানুষ। দরদামে না পটলে অবিক্রিত থেকে যান অনেকেই।

প্রতিদিন গড়ে ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হন শ্রমজীবি প্রায় ১৫০-২০০ জন কৃষান। দুই-এক দিন দরদামের উঠানামা হয়। বৈরী আবহাওয়ায় বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির দিনে বিক্রি হতে পারেন না হাটে আসা দিনমজুররা।

ফরিদপুর জেলার সর্ব দক্ষিণের এ অঞ্চলটিতে প্রচুর পরিমানে পাট, ধান রবিশস্য উৎপন্ন করেন চাষিরা। দেশের অন্যান্য মানুষ বিক্রির হাটে নির্মাণশ্রমিক বিক্রি হলেও এই হাটে শুধু কৃষি চাষাবাদ ও কৃষি সম্পর্কিত শ্রমজীবী বেচাকেনা হয়ে থাকে।

ধান রোপন, নিড়ানি, কাটা, রবিশস্য, পাটসহ অন্যান্য ঘর গৃহস্থালীর নানা কাজের জন্য এই হাট থেকেই মানুষ কেনেন স্থানীয়রা৷ প্রায় দুই বছর ধরে চলছে আলফাডাঙ্গার এই শ্রমিক বেচাকেনার হাট। তবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরেও যে টাকা পান, তাতে চলে না শ্রম বিক্রি করা কৃষানদের সংসার।

এদিকে গৃহস্থরাও ফসল উৎপাদন ও বিক্রি শেষে আশানরূপ লাভের মুখ দেখতে পারেন না। পাড়াগ্রাম হাটে কৃষান কিনতে আসা সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘সার বীজ কৃষান খরচ বাদ দিলে আর তেমন কিছুই অবশিষ্ঠ থাকে না।’

আধুনিক যুগে কৃষির আধুনিকায়ন হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো কৃষান বা জন বিক্রি করেই অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। গায়ে খেটে শ্রম বিক্রি করে প্রতিদিনের খাদ্য জোগাতে হয় তাদের। এ যেন আধুনিক যুগের নব্য দাসত্বের এক দিনের সংস্করণ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন