পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনার সাথে কাল্পনিক গল্প জুড়ে দিয়ে লেখা হয়েছে বইটি


বইটির নাম, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন’। এর শিরোনাম এবং সূচিপত্র দেখে মনে হতে পারে বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাসের এক পূর্ণাঙ্গ করুণ বিবরণ। প্রকৃতপক্ষে বইটি আসলে তা নয়! বইটিতে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে কাল্পনিক কাহিনী ও মিথ্যা গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য কাল্পনিক কথাবার্তা জুড়ে দিয়ে অনেকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনায় অনুমানের সুবিধা (Benefits of Doubt) শুধুমাত্র শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা এবং তাঁর ভাই সাবেক সংসদ সদস্য, শান্তবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও শান্তিবাহিনীর আন্তঃকোন্দলে নিহত গেরিলা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙ্গালি সম্প্রদায় এর উপর চালনো গণহত্যা, জুলুম ও অমানবিক নির্যাতন এবং বৈষম্যমূলক নীতির কোন স্থান হয়নি ৪৬৪ পৃষ্ঠার বিশাল এই বইয়ে। এমনকি যুক্তিক কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত পিজেএসএস (মূল/সন্তু) ব্যতিত অপর ৫টি সশস্ত্র সংগঠন পিজেএসএস (সংস্কারপন্থী/ এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (মূলদল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), কেএনএফ এবং মগ পার্টি (এমএলএ/এএলপি) এর কোন বক্তব্যের স্থান হয়নি এই বইটিতে! গত ০৭ জুলাই ২০২০ তারিখে বিবিসি সাংবাদিক আকবর হোসেন এর প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র ৬টি সংগঠনের বিস্তারিত ওঠে আসলেও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমা প্রকাশনী হতে প্রকাশিত লেখক জনাব মহিউদ্দিন আহমদ এর এই বইয়ে সংগঠনের নাম আছে ৪টির! তন্মধ্যে তিনি পিজেএসএস (সন্তু/মূল) ব্যতিত বাকিদের চুক্তি বিরোধী ও সশস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তবে ২০১১ সালেই সন্তু লারমা ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে বলেছেন ইউপিডিএফ কে প্রতিহত করার জন্য ২০০০ সাল থেকেই তাদের সশস্ত্র বাহিনী আছে! লারমা ভাইগণ, পিজেএসএস মূলদলের অতিরঞ্জিত বন্দনার পাশাপাশি বিশাল এই বইয়ের অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী নবীন পাঠকদের মনে বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক “আদিবাসী” শব্দটি ঢুকিয়ে দেওয়া। সাংবাদিক সালিম সামাদ, মেজর (অবঃ) খন্দকার বদরুল হাসান, রাঙ্গামাটির প্রবীণ সাংবাদিক একেএম মকছুদ আহমদ, মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও গেরিলা নেতা (পিজেএসএস মূল এর) উষাতন তালুকদার ওরফে মেজর সমীরণ এর বক্তব্য হলো এই বইয়ের মূল ভিত্তি। এছাড়াও প্রয়াত রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আবুল মনজুর সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আরো অসংখ্য বিখ্যাত ও সুপরিচিত ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য এবং প্রসঙ্গ ওঠে এসেছে এই বইয়ে। সর্বমোট ৭৩৫/- টাকা খরচ করে আমার বর্তমান অবস্থান ঢাকায় বইটি সংগ্রহ করে পড়তে গিয়ে সব অসত্য, ভিত্তিহীন, সত্য-মিথ্যায় মিশ্রিত এবং অতিরঞ্জিত বর্ণনা দেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন বাসিন্দা হিসেবে হতবাক হয়ে যায়! হঠাৎ আমার মনে হলো সিনিয়র সাংবাদিক একেএম মকছুদ আহমদ আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড এবং আমরা একই জেলার বাসিন্দা। যেহেতু এই বইয়ের মূল তিনটি অধ্যায় ‘ডেটলাইন কাউখালি’ ‘হেডমাস্টার্স ওয়ার’ ও ‘খান বাড়ি’ এর অন্যতম একজন চরিত্র তিনি, তাই আমি ওনাকে উদ্দেশ্য করে বইটির ২টি ভূল তথ্য তুলে ধরে প্রথমে একটি ফেসবুক পোস্ট দিই। ঐ পোস্ট পড়ে ওনি আমাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল করে ঘটনার একটি অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন। পরবর্তীতে বিস্তারিত আলাপে লেখক মহিউদ্দন আহমদ এবং সাংবাদিক সালিম সামাদ সম্পর্কিত অনেক চমকপ্রদ কিছু তথ্য পায়। এরপর আমার মনে হলো পাহাড়ের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে এই বইটির একটি ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন। যাতে পাঠক সমাজ প্রকৃত সত্য জানতে পারেন। সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিটি লাইনের গোপনীয় সত্য নিয়ে লিখতে গেলে এই ৪৬৪ পৃষ্ঠার বইয়ের প্রত্যুত্তরে ৯৩৮ পৃষ্ঠার আরেকটি বই হয়তো হয়ে যাবে। তাই এখানে পাঠকদের জন্য বিশেষ বিশেষ কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যের মূল রহস্য তুলে ধরা হলো।
বইয়ের শুরুতে লেখকের নিজস্ব ভূমিকা/মুখবন্ধ পড়শি অধ্যায়ে ৯নং পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “আম্মা আগরতলার মহারানী তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছেন। শৈশবে আম্মার কাছে দুটি শব্দ শুনেছিলাম-টিপরা এবং কুকি। ওরা আদিবাসী। আম্মার সতীর্থ ছিলেন এদের কয়েকজন। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। আদিবাসী কি জিনিস শৈশবে বুঝিনি।” আবার ১৬ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন ১৯৯৩ সালে ‘এথনিক মাইনরটিজ ইন চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস’ শিরোনামে হলিডেতে আমার একটি লেখা ছাপা হয়। তাহলে যে ব্যক্তি ষাটের দশক থেকে আদিবাসী শব্দটি জানেন, পুরোপুরি উচ্চ শিক্ষিত হয়েও তিনি ‘Indigenous’ বা ‘Aboriginal’ শব্দটি ব্যবহার করে লেখার শিরোনাম করলেন না কেন? এর কারণ অনেক হতে পারে! বাস্তবতা হলো এমনকি ২০২৪ সালে, ভারত সরকার তথা হালের Ministry of Tribal Affairs, GoI এর কাছে Tripura, Tripuri, Tippera এবং কুকি সহ পুরো ভারতে বসবাসকারী সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী Scheduled Tribe (ST) হিসেবে স্বীকৃত। শুধুমাত্র মূল ভূখন্ড থেকে বহু দূরে আন্দামানের একটি দ্বীপের শখানেক বাসিন্দাকে ভারত সরকার আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লাক্ষাদ্বীপের সকল আদিবাসীরাও ST, ওরা মুসলিম হওয়ায় ওখানে বিমানবন্দর, নৌঘাঁটি ও ভাস্কর্য স্থাপনের কাজ চলছে সরকারের অগ্রগণ্য দায়িত্ব হিসেবে। এই গত ০৪ মার্চ ২০২৪ তারিখে ত্রিপুরা রাজবংশের প্রদ্যুত কিশোর মাণিক্য দেববার্মার নেতৃত্বে Tiprasa Accord স্বাক্ষর করেছে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী। যা তাদের ভূমি ও ভাষার সুরক্ষা দিবে। জনাব প্রদ্যুত বলছেন, “এই চুক্তি বাস্তবায়নে হয়তো নাগা চুক্তির মতো ২০ বছরও লাগতে পারে, তবে আমরা আইনের পথে থাকবো। অন্যের অসুবিধার বদলে আমাদের কোন অধিকারের দরকার নেই (সূত্রঃ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)।“
বইয়ের ১৭ নং পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন, “অনুষ্ঠান শেষে সেলিনা হোসেন আমাকে বললেন-সন্তু লারমা একজন বীর, তাঁকে নিয়ে লিখুন কথাটা আমার মনে ধরল।” অথচ এই বইয়ের শেষ দিকে বর্ণিত আছে শান্তিবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার চাবাই মগ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসায় তাকে শান্তিবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। এজন্য পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর চাবাই মগের স্ত্রী রেডমা চৌধুরীর সাথে জনাব লারমা দেখা করতে আসলেও তিনি দেখা করেননি। পাকুয়াখালী, রাজনগর, ভূষণছড়া সহ অসংখ্য গণহত্যা এবং নিরস্ত্র বাঙ্গালি বসতিতে হামলা ও আগুন লাগানোর নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ আছে জনাব লারমার বিরুদ্ধে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক এ্যাম্বুশ তথা অভিযানের নামে সেনাবাহিনীর উপর পিছন থেকে গুলি এবং ঘুমন্ত ও ছুটিতে গমনকালীন নিরস্ত্র সেনা-পুলিশ- আনসার হত্যার একেকটি ঘটনা একেকটি ইতিহাস। এটা সুস্পষ্ট জনাব লারমাকে লেখকের ‘বীর’ হিসেবে মনে ধরলে এই বইয়ের বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বলতে কিছুই থাকতে পারে না।
উপনিবেশ অধ্যায়ের ২৫ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “১৮৬১ সালে লুইন রামপুর বান্ডেলা জেলার পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পান। ১৯৬৪ সালে পুলিশ সুপারের দায়িত্ব নিয়ে চলে আসেন নোয়াখালী।“ বুঝা যাচ্ছে ‘১৯৬৪’ একটি টাইপিং মিসটেক। অন্যদিকে আমার সংগ্রহের বইটি অস্টম মুদ্রনের, এখনো এই ভূল সংশোধন হয়নি! আমি যদি দেশ/বিদেশ মিলিয়ে মহাব্যস্ত লেখক একটি বিশেষ এজেন্ডা হিসেবে বইটি সম্পন্ন করার পর আর কখনো খুলে দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেননি ধারণা করি, তাহলে কি বেশি বড় ভূল হবে? এই বইয়ের অন্যতম আরেকটি অধ্যায় হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন তথা ‘লুইনের চোখে পার্বত্য চট্টগ্রাম’। ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) টি এইচ লুইন বেশ কটি বই লিখেছিলেন উপমহাদেশে তাঁর অভিজ্ঞতার বিচার বিশ্লেষণ হিসেবে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ঐতিহাসিক দলিল হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক এবং নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীদের বর্ণনায় তাঁর লেখা বই ‘THE HILL TRACTS OF CHITTAGONG AND THE DWELLERS THEREIN’। যেখানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতির বর্ণনা এবং বসবাসকারী নৃগোষ্ঠী সমূহের বৈশিষ্ট্য ও জীবনধারার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বইটি ১৮৬৯ সালে ক্যালকাটা বেঙ্গল প্রিন্টিং কোম্পানি থেকে প্রকাশিত। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লুইনের এই বই থেকে তেমন কিছুই লিখেননি তাঁর রচিত বইয়ে! জনাব মহিউদ্দিন আহমদ পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিক ইস্যুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি হতে নৃতাত্ত্বিক কোন আলোচনা না করলেও ঠিকই ঐ বইয়ে বর্ণিত বাঙ্গালি মহাজনের ঠকবাজির গল্পটি হুবহু তুলে দিয়েছেন! প্রশ্ন হলো মহাজনরা কখনো কি জাত ধর্ম বাছাই করে ঠকবাজি ও শোষণ করতো, না আজকের দিনেও করছে? এর অন্তর্নিহিত কারণ স্পষ্ট, ক্যাপ্টেন লুইন এর ঐ বই বা প্রয়াত চাকমা পন্ডিত ব্যক্তিত্ব বিরাজ মোহন দেওয়ান রচিত “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত” নামক বই হতে বা বস্তুনিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করলে লেখকের কথিত আদিবাসী দাবী ভিত্তিহীন হয়ে যায়। লেখক তাঁর “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন” নামক বইয়ে সংসদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বক্তব্য, কামিনী মোহন রায়, স্নেহ কুমার চাকমা, শরদিন্দু শেখর চাকমা, দীপংকর তালুকদার, রাণী বিনিতা রায় সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য সুপরিচিত ব্যক্তির বক্তব্য/লেখার উল্লেখ করেছেন। এবং জনসংহতি সমিতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল সহ সরকারি অনেক ঐতিহাসিক দলিলের ছবি দিয়েছেন, যেগুলোর সবখানেই মূলত “উপজাতি” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে লেখক যখনই নিজের বক্তব্য আকারে কোন বাক্য লিখেছেন তখনই আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করেছেন। হাস্যকরভাবে আদিবাসী ও উপজাতি শব্দের ব্যবহারের ধারাবাহিকতা নেই কোথাও! এটা বলা চলে ‘উপজাতি’ ও ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে দূষণ। সবচেয়ে বড় উদাহরণ শরদিন্দু শেখর চাকমার আদিবাসী ইস্যুতে দেওয়া বক্তব্যের হুবহু হিসেবে প্রদত্ত বক্তব্য। যেটার মধ্যে ঠিকই উপজাতি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (পৃষ্ঠা ৪৪৭, দ্বিতীয় লাইন)। কাপ্তাই বাঁধ এর মতো করুণ ঐতিহাসিক ঘটনা এবং দেওয়ান নানুদের সবকিছুর মালিকানা ও বিশাল প্রভাবের সুন্দর বর্ণনা দিলেও লেখকের অজ্ঞাত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা না করাটা হলো অতীব দুঃখজনক! কাপ্তাই বাঁধ সমস্যার পূর্বে কি পাহাড়ে ভূমিহীন ছিলো না? ছিলো। কেন ছিলো? দেওয়ান নানু, কার্বারি, রোয়াজাগণই পুরো দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মালিক হয়ে থাকতেন। পাহাড়ের দূর্গমতার সুযোগ নিয়ে তাঁরা ব্রিটিশদেরও বাধ্য করেছেন হিল রেগুলেশনের মাধ্যমে তাদের এই সামন্ত কর্তৃত্ব বজায় রাখার সুযোগ দিতে। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর বিশাল বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা, ভূমি সমস্যার ধারে কাছে যেতে না পারলেও প্রয়াত প্রথা বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ এর মাত্র ৪৬ পৃষ্ঠার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনা ধারা’ বইয়ের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান সমস্যা গুলো ওঠে এসেছিলো পার্বত্য চুক্তিরও আগে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা কেন সমাধান হচ্ছে না এবং হবেও না? কারণ দেওয়ান নানুরা তথা পাহাড়ের এলিট সমাজ প্রথমে রাষ্ট্রের স্বার্থ, এরপরে পাহাড়ি ভূমিহীনদের স্বার্থ, এরপরে অন্যান্য ভূমিহীনদের স্বার্থ এবং সবার পরে তাদের স্বার্থ, এই অগ্রগণ্যতায় দেশের প্রচলিত ভূমি আইন সমূহ প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধানে কখনো রাজি হবেন না। তাঁরা কাল্পনিক প্রথা ও রীতির কথা বলে নিজেরা শত শত একর মালিক থাকার ব্যবস্থা চান। ১১/১৩ নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কোনটির প্রথা ও রীতি গ্রহণযোগ্য হবে, কাদের রীতি আছে বা কাদের নেই, এটা ঠিক করতেই হয়তো আরো শত বছর লাগবে। ওনারা হিল রেগুলেশনের কথা বলেন! বাস্তবতা হলো দেওয়ান নানুরা আসলে হুবহু ওটাও চান না! হিল রেগুলেশনের ঐ “Excluded Area” বাক্যাংশটি ওনাদের খুবই প্রিয়, দশ একরের বেশি নয়, রাজা মহাশয় ডিসি বাহাদুরের অধীন ও সার্কেল চীফ নামে অবহিত হইবেন, ডিসি বাহাদুর যে কাউকে পাহাড়ে থাকার অনুমতি দিতে পারবেন ঐসব ধারা কিন্তু দেওয়ান নানুরা চান না।
দেশভাগ অধ্যায়ে লেখক পুরো ঘটনার অর্ধেক ইতিহাস ব্যক্ত করেছেন। বাস্তবতা হলো রাজাগণ জানতেন ভারতে যোগ দিলে তাঁরা আর রাজা থাকবেন না বা ভূমি রাজস্বে তাঁদের কোন অংশ থাকবে না, তাই তাঁরা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছেন। ভারত ঠিকই অমুসলিম এলাকার যুক্তি দিয়েছিলো, পাকিস্তান চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে পাঞ্জাব অংশে ভারতকে ছাড় দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েছিলো। তবুও প্যাটেলের বিষয়ে পাকিস্তান ওয়াকেবহাল ছিলো, তাই বালুচ রেজিমেন্ট প্রস্তুত ছিলো, ওরা আসলো এবং নিয়ন্ত্রণ নিলো। স্নেহ কুমাররা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে নিতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ভারতে চলে গেলেন। এটাই হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরো দেশভাগ ইতিহাসের সারমর্ম। এবনে গোলাম সামাদ তাঁর ‘বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি’ গ্রন্থে লিখেছেন পাঞ্জাবের মুসলিম অধ্যুষিত গরুদাসপুর ছেড়ে দিয়ে সমঝোতা করে জিন্নাহ চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে রেখেছেন। প্রিয়জিত দেবসরকার তাঁর “The Last Raja of West Pakistan” গ্রন্থে জিন্নাহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বদলে জিরা এবং ফিরোজপুর ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে দাবী করেছেন।
ডেটলাইন কাউখালী অধ্যায়ের একটি লাইনে উল্লেখ আছে, “রানিরহাটে সদর হাসপাতালে গেলেন সালিম আর মকছুদ” (পৃষ্ঠা ২০০)। কাউখালী উপজেলা বা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার মধ্যে ‘রানিরহাট সদর হাসপাতাল’ নামে কোন কিছু তখনো ছিলো না, এখনো নেই। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের লেখার মধ্যে এই ধারাবাহিকতা যে লেখক রক্ষা করতে পারেননি, তিনি পুরো বইয়ে শান্তিবাহিনীর সব নেতাদের ছদ্মনাম নাম সহ কয়েক দশকের গেরিলা যুদ্ধের স্থান, কাল ও পরিস্থিতি সহ বর্ণনা গবেষণা করে নিজে লিখেছেন, এটা আমার বিশ্বাস করতে আপত্তি আছে! যেহেতু তিনি কোন মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকও নন, আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাও নন, তিনি শুধুমাত্র একজন ‘Onlooker’। আমার বদ্ধমূল ধারণা এই বইয়ের সিংহভাগ অংশ পিজেএসএস (সন্তু/মূল) এর প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ কর্তৃক প্রণীত এবং মেজর সমীরণ কর্তৃক অনুমোদিত! কারণ জনাব লারমা বার্ধক্যজনিত কারণে বহু আগে থেকেই শুধুমাত্র অপরিহার্য দাপ্তরিক কাজকর্ম করেন ও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা দেন বলেই পুরো পাহাড় জুড়ে জনশ্রুতি।
বইটি নিয়ে আরো গভীর আলোচনার পূর্বে শান্তিবাহিনী ক্যাম্পের ছবি সহ প্রথম ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিক জনাব সালিম সামাদ এর ভূমিকার একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অপরিহার্য! পাঠকগণের বুঝার সুবিধার্থে এখানে আলোচ্য বইয়ের কিছু বাক্যাবলি প্রথমে জড়ো করছি। বিবেচ্য-১: “সুনীলদা, এখানকার ছাত্ররাজনীতির হালচাল কেমন? পার্বত্য চট্টগ্রামে যত কলেজ আছে, যত ছাত্রসংসদ আছে, বেশির ভাগই জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের দখলে। অন্যদের তেমন নড়াচড়া নেই। রাঙ্গামাটি কলেজ ছাত্রসংসদ কাদের দখলে? জাসদ-ছাত্রলীগ (পৃষ্ঠা ২১৯)।” বিবেচ্য-২: “ঢাকায় অফিসে আমার খোঁজ নিয়েছিলেন? কাকে পাঠালেন? কবে? একজনকে পাঠানো হয়েছিল হেডকোয়ার্টার থেকে। তারপর একজন গেল আপনার অফিসে। সে বাঙ্গালি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র (পৃষ্ঠা ২২৮)।” বিবেচ্য-৩: “খাবারের আয়োজন ভালোই-ভাত, শূকরের মাংস, সবজি ও ডিম (পৃষ্ঠা ২৩১)।” বিবেচ্য-৪: “সালিম কিছুক্ষণ সুহাসিনীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উঠতেই হলো (পৃষ্ঠা ২৪০)।” বিবেচ্য-৫ “(বন্দি স্নেহলতা চাকমাকে) আমি যদি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, তুমি কি রাজি হবে (পৃষ্ঠা ২৪৪)।” বিবেচ্য বাক্যাবলি থেকে এটা পরিস্কার বাংলাদেশের বাম ঘরানার কিছু কিছু রাজনৈতিক দল জন্মলগ্ন থেকেই শান্তিবাহিনী কে প্রত্যক্ষ সাহায্য করতো। ছাত্রজীবনে বাম আদর্শে দিক্ষিত সালিম সামাদ চালচুলো হীন জীবনে তাই শান্তিবাহিনী নিয়ে কাজ করার জন্য রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন, এবং একই সংযোগের মাধ্যমে সালিম সামাদ শান্তিবাহিনীর কাছে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ বিবেচিত হয়েছেন। সম্ভবত ‘পর্ক ইটার’ হওয়ার কারণে সালিম সামাদ পাহাড়িদের সাথে মিশতে ও আস্থা অর্জনে আরো বেশি সুবিধা পেয়েছেন। রাঙ্গামাটি শহরে জনাব একেএম মকছুদ আহমদ এর আশ্রয়, প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও সার্বক্ষণিক দিক নির্দেশনা হলো জনাব সালিম সামাদের প্রতিবেদন তৈরীতে সাফল্য লাভের মূলভিত্তি (যেটা বইয়ে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি)। অনেকটা দ্বৈত চর হিসেবে কাজ করতে থাকা সালিম সামাদ নিজের মতাদর্শ/হানি ট্র্যাপ/পাহাড়ি নারীদের প্রতি আকর্ষণের কারণে ক্রমেই শান্তিবাহিনীর প্রতি বেশি ঝুঁকে পরেন। মেজর খন্দকার বদরুল হাসান এর বদলির আগ মুহূর্ত/পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে জনাব সালিম সামাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। মোটাদাগে শান্তিবাহিনী ক্যাম্পের ছবি সহ প্রথম প্রতিবেদন তৈরীতে জনাব সালিম সামাদের নিজস্ব কৃতিত্বের চেয়েও পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সাহায্যকারী উপাদান সমূহের ভূমিকা অনেক বেশি।

আলোচ্য বইয়ের ‘ডেটলাইন কাউখালী’ ‘হেডমাস্টার্স ওয়ার’ ‘খানবাড়ি’ অধ্যায় গুলোর বহু বক্তব্য মারাত্মক অসংগতি পূর্ণ, এবং এই অধ্যায়গুলোর অন্যতম একটি চরিত্র হলেন রাঙ্গামাটির প্রবীণ সাংবাদিক জনাব আলহাজ্ব একেএম মকছুদ আহমদ এবিষয়ে ওনার বক্তব্য জানতে চাইলে, তিনি আমাকে মোটামুটি বিস্তারিতভাবে সব বুঝিয়ে বলেছেন। সিনিয়র সাংবাদিক আলহাজ্ব একেএম মকছুদ আহমদ এর আমাকে দেওয়া বর্ণনার সারমর্ম হলো, “কাউখালির ঘটনায় তিনি প্রথমে ইত্তেফাকে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেন টেলিগ্রামে, কিন্তু ওখানে ভূলে Army এর স্থলে Police হয়ে যায়। তিনি সেটার কারেকশনের ব্যবস্থা করলেও পুলিশ তাঁর সাথে অন্য রকম আচরণ করতে থাকে এবং পাশাপাশি রাঙ্গামাটির পরিস্থিতি উতপ্ত হতে থাকে। তাই তিনি ইত্তেফাক এর তত্কালীন চীফ রিপোর্টার শফিউল কবীরকে রাঙ্গামাটি এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অনুরোধ জানান। হঠাৎ শফিউল কবীর এর লন্ডনের একটি এসাইনমেন্ট চলে আসলে, তিনি বলেন আমাদের New Nation এর Freelancer (বিনা বেতনে) সাংবাদিক সালিম সামাদ কে পাঠাচ্ছি, তুমি সব রকম সহযোগিতা করিও। তখন জনাব মকছুদ নবীন সালিম এর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে জনাব শফিউল অভয় দিয়ে বলেন সে পারবে। এরপর জনাব সালিম সামাদ রাঙ্গামাটি এসে তত্কালীন ডিএফও, ওনার দূর সম্পর্কের ভগ্নিপতি এর বাসায় প্রথম রাত থাকেন। তারপর জনাব মকছুদ সালিম সামাদকে ওনার রিজার্ভ বাজারের বাসায় নিয়ে আসেন এবং সালিম সামাদ প্রায় এক বছর জনাব মকছুদ এর সাথেই ওনার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও নিরাপত্তায় থাকেন। রাশেদ খান মেনন ও উপেন্দ্র লাল চাকমা তদন্তে আসলে জনাব মকছুদ সালিম সামাদ কে কাউখালী নিয়ে যান, এর আগে পরেও নিয়ে গিয়েছিলেন। জনাব সালিম সামাদ এর রাঙ্গামাটির তত্কালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর খন্দকার বদরুল হাসান এর সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সুবাদে (সে সম্পর্ক এখনও আছে) তিনি মূলত দ্বৈত চরের ভূমিকায় কাজ করতেন। মেজর বদরুল এর বদলির পর সালিম সামাদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পর্কের অবনতি হয়। এরও বহু পরে, লেখক মহিউদ্দিন আহমদও এক সময় রাঙ্গামাটিতে এনজিও চাকুরি করেছেন। জনাব মকছুদ এর শ্যালক জনাব মনোজ বাহাদুর এর সাথে লেখকের মূলত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো, সেই সুবাদে জনাব মকছুদ এর সাথে লেখকের বছরখানেক যাতায়াত ছিলো এবং বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বহু আলাপ হয়েছে। তবে লেখক কখনো বলেননি বই প্রকাশের জন্য তিনি জনাব মকছুদ এর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বা ওনাকে উদ্ধৃত করে বইয়ে লিখবেন। পরবর্তীতে বছর দুয়েক আগে (আনুমানিক ২০২২ সালে) লেখক এবং প্রথম আলো এর সম্পাদক, কোন এক কাজে রাঙ্গামাটি এলে রাতে জনাব মকছুদ কে কল করে ফায়ার ব্রিগেড এর পাশে অবস্থিত আবাসিক হোটেলে আসতে বলেন। জনাব মকছুদ বলেন আমি এখন না সকালে আসতে পারবো, তখন লেখক বলেন আমরা সকাল ৮টায় চলে যাবো। এরপর পরদিন ভোরেই জনাব মকছুদ ঐ হোটেল এলাকায় গিয়ে লেখকের সাথে দেখা করেন। তখন লেখক জনাব মকছুদ কে বইয়ের একটি সৌজন্য কপি উপহার দেন এবং জনাব মকছুদও তাঁর কিছু বই লেখককে উপহার দেন। পরবর্তীতে জনাব মকছুদ সূচীপত্র দেখে দেখে তাঁর সংশ্লিষ্ট হতে পারে অধ্যায় গুলো পড়া শুরু করেন, পড়তে পড়তে ২১৮ নং পৃষ্ঠায় লেখা ‘মকছুদ তাঁকে এ ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারলেন না’ এই বাক্যটি পড়ে এতো রেগে গিয়েছিলেন যে, তিনি বইটি ছুড়ে ফেলে দেন আলমারিতে। জনাব মকছুদ বলেছেন তিনি নিজে শান্তিবাহিনী ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য চাকমাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছিলেন সালিম সামাদকে।” প্রসঙ্গক্রমে আমার সাথে দুবারে সিনিয়র সাংবাদিক ও বর্তমানে গিরিদর্পন পত্রিকার সম্পাদক জনাব আলহাজ্ব একেএম মকছুদ আহমদের এই বইয়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, যেটার হুবহু স্পর্শকাতরতার কারণে এখানে লেখা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ২৮০ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, “কর্নেল মতির সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় নিজেকে বেশ হালকা মনে হচ্ছে সালিমের। যা মনে আসছে, তাই উগরে দিচ্ছেন। একপর্যায়ে বললেন, প্রেসিডেন্ট যদি চলে যায়, আই থিংক পিপল উইল বি হ্যাপি। তুমি কি বলতে চাও? এই, আপনারা যদি ফালায়া দেন। এই ধরেন, ওনার যদি এক্সিট হতে হয়, নির্মমভাবে।” এই বাক্য গুলো যদি সত্যি হয়, সেটার মানে হলে রাঙ্গামাটিতে সেনাবলয় ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে ঘুরতে থাকা সাংবাদিক সালিম সামাদ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা চক্রান্তের কথা আগে থেকেই জানতেন বা অনুমান করতে পেরেছিলেন! যা আরো ব্যাপক ব্যাখ্যা বা অনুসন্ধানের দাবী রাখে। এছাড়াও মেজর জেনারেল আবুল মনজুর কে মারাত্মক বেশি মূল্যায়ন করা হয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আমি নিজে এ যাবত্ যতো পুনর্বাসিত বাঙ্গালি লিডারের সাথে কথা বলেছি, তাঁরা বলেছেন পুনর্বাসিত বাঙ্গালির জন্য জেনারেল মনজুরের অবদান অবিস্মরণীয় এবং শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে সাহায্যকারী হিসেবে উল্টো পুরো পাহাড়ি সমাজের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষপাতি ছিলেন তিনি। লেঃ কর্নেল(অবঃ) এম এ হামিদ, পিএসসি এর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইটি দিয়ে বিচার করলে মেজর জেনারেল মনজুর এর লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাবে। মোটাদাগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন’ বইয়ের ‘ডেটলাইন কাউখালী’ ‘হেডমাস্টার্স ওয়ার’ ‘খানবাড়ি’ ও ‘জিয়া-মনজুর খুন’ অধ্যায় গুলোর সাথে জনাব মকছুদ মোটেও একমত নন। তাঁর মতে এগুলোতে অনেক বানোয়াট, উদ্ভট ও মিথ্যা বয়ান আছে। আগেই বুঝানোর চেষ্টা করেছি, এই বিশাল বইয়ের প্রতিটি লাইনের যুক্তিখণ্ডন করতে গেলে আরো বড় একটি বই লিখতে হবে। তবু আরো কটি লাইনের জবাব দিতে চাই।
৪৪৩ নং পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন, “বাংলাদেশ রাস্ট্রটি প্রতিষ্ঠার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সংকট তৈরি হয়।” অথচ তাঁর এই বইতেই সামনের দিকের অধ্যায় গুলোতে দেশ ভাগে স্নেহ কুমার চাকমার বিদ্রোহ চেষ্টা, প্যাটেলের আশ্বাস, রাজাগণের পাকিস্তানের পক্ষে মত, পাকিস্তান আমলের কাপ্তাই বাঁধ প্রতারণা এবং ১৯৭১ সালে ৩ জন রাজার মধ্যে শক্তিশালী ২জনের স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থান মোটামুটি পরিস্কার বর্ণিত হয়েছে।তাই লেখকের উক্ত বাক্যের আরো বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান জরুরি। সর্বশেষ এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য নবীন পাঠক ও নবীন বামদের মাথায় “আদিবাসী” শব্দটি ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিপরীতে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করবো। তাতেই হয়তো বুঝা যাবে ২০১১ সালের ১১ই আগস্ট জনাব দীপংকর তালুকদার, একাধিকবার রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত এমপি “আদিবাসী বিষয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে একই সমস্যা বিরাজমান। অথচ সেসব দেশের আদিবাসী সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কোন উদ্যোগ না নিয়ে কেবল বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জাতিসংঘের একটি ফোরামের অতি আগ্রহ রহস্যজনক। জাতিসংঘের এমন রহস্যজনক ভূমিকার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির পাঁয়তারা চলছে, যা কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাম্য হতে পারে না” মন্তব্য করার পরও এনজিও এবং বিভিন্ন বিদেশি সাহায্যপুষ্ট সংস্থার সাথে সম্পৃক্ত লেখকগণের আদিবাসী ইস্যুতে অতি আগ্রহের কারণ সমূহ কি কি!
আদিবাসী কারা এবং কেন এতো বিতর্ক?
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মোতাবেক “আদিবাসী” শব্দের অর্থ “আদিম জাতি”, সঠিক ইংরেজি পরিভাষা “Aborigine”। যেটার ইংরেজি বিশদ সংগার বাংলা অর্থ হলো “একটি ব্যক্তি, প্রাণী বা উদ্ভিদ যা আদিকাল থেকে একটি দেশে বা অঞ্চলে ছিল।’ ইংরেজি “Indigenous” শব্দের বাংলা অর্থও বুঝায় “আদিবাসী’, তবে এই শব্দের ইংরেজি বিশদ সংগার বাংলা অর্থ হলো “একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভুত বা ঘটছে, স্থানীয়।” অর্থাৎ Indigenous শব্দটি নৃতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে ব্যবহার কম যুক্তিযুক্ত। কোন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রাকৃতিকভাবে ঘটছে বা স্থানীয় মনে হলেই ঐতিহাসিক এবং গঠনগত উপাদান বিশ্লেষণ ব্যতিত সেটা ঐ স্থানের “Aborigine” হতে পারে কিভাবে? হ্যাঁ, এই ধরনের অসংখ্য মৌলিক ও বৈধ যুক্তিগত বিরোধের কারণে জাতিসংঘ “Indigenous People” কারা আজ অবধি এর স্বীকৃত কোন সংগা প্রদান করতে পারেনি। ইউএন পারমানেন্ট ফোরাম ফর ইনডিজেনাস ইস্যু যে ব্যাখা দাঁড় করাতে চেয়েছে, তা “আদিবাসী” এর সংগাকে অত্যন্ত দূর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত করে ফেলে। নিজেকে আদিবাসী দাবী করা এবং সম্প্রদায় কর্তৃক সদস্য হিসেবে মেনে নেওয়া, বসতি স্থাপনের পূর্ব হতে কোন স্থানে অবস্থান, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা, নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি আছে এবং সমাজের দূর্বল দলে অবস্থান কে “আদিবাসী” বলতে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বের কোথাও উপজাতি/ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নেই বলে মেনে নিতে বলা হচ্ছে! অথচ অনেক বড় নৃ বিশেষজ্ঞ না হয়েও সাধারণ মানুষ এক জন আরেক জনের ভাষা, বর্ণমালা, শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণ, পোশাক এবং সংস্কৃতি দেখে ঠিকই বুঝতে পারে/অনুমান করতে পারে কে কোন অঞ্চলের/দেশের মানুষ, বা তাদের পূর্ব পুরুষরা কোন স্থান হতে আগত। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় সমূহের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এবং মানবাধিকার কর্মীদের প্রয়াসে আইএলও আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের অধিকার সুরক্ষায় Indigenous and Tribal Peoples Convention নামে ১৯৫৭ এবং ১৯৮৯ সালে দুটি কনভেনশন (নং ১০৭ ও ১৬৯) পাশ করে। যেগুলো প্রনয়নে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ এবং দল নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চাওয়ার ফলে সুনির্দিষ্টভাবে কারা “আদিবাসী” এবং কারা “উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” তার কোন সঠিক সংগা প্রদান করতে সমর্থ হয়নি জাতিসংঘ। সংগত কারণে উভয় কনভেনশনে খুবই নগন্য দেশ সমর্থন দিয়েছে। কালক্রমে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় সমূহের উপর বিশ্বব্যাপী আধুনিক পদ্ধতিতে শোষণ এবং নির্যাতন আরম্ভ হওয়ায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে কনভেনশন ১৬৯ এর চেয়েও আরো শক্তিশালী লিগালি নন বাইন্ডিং UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) প্রস্তাবনা গ্রহণ করে। কিন্তু প্রস্তাবনা আরো শক্তিশালী করা হলেও পুরো বিষয়টি আগের চেয়ে আরো বেশি জটিল করে ফেলা হয়েছে, এবার উল্টো বিশ্বের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কে আদিবাসী হিসেবে প্রছন্নভাবে বুঝানো হয়েছে। কারা “আদিবাসী” কোন সুনির্দিষ্ট সংগা প্রদান না করে বিপরীতে ঘোষণায় Tribal শব্দের অস্তিত্ব বিলীন করা হয়েছে। ১৪৩ টি দেশ প্রস্তাবনার পক্ষে ভোট দেয়, বাংলাদেশ সহ ১১ টি দেশ ভোট দান হতে বিরত থাকে ও ৩৪ টি দেশ ভোট দানে অনুপস্থিত ছিলো এবং ৪টি দেশ সরাসরি না ভোট দেয়, না ভোট প্রদানকারী দেশগুলো হলো যথাক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। কারণ ঐ ৪টি দেশ হলো নিখাঁদ আদিবাসী নিধনে গড়ে ওঠা।
কি আছে UNDRIP-এ?
UNDRIP এ আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, জীবনধারা ও সংস্কৃতি রক্ষায় আত্মনিয়ন্ত্রণের উপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণায় সর্বমোট ৪৬ টি অনুচ্ছেদ আছে। অতিব গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ গুলোর সারমর্ম এখানে আলোচনা করা হলো। অনুচ্ছেদ ৪ এর সারমর্মঃ আদিবাসীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য স্বায়ত্তশাসন বা নিজস্ব প্রশাসনের অধিকারী হবেন, অনুচ্ছেদ ১৮ এর সারমর্মঃ আদিবাসীরা নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করবেন এবং পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত নিজস্ব প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে পারবেন, অনুচ্ছেদ ১৯ এর সারমর্মঃ আদিবাসী এলাকা/তাদেরকে প্রভাবিত করে এধরণের কোন আইনগত এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আদিবাসীদের সম্মতি নিতে হবে, অনুচ্ছেদ ২৬ এর সারমর্মঃ আদিবাসীরা ব্যবহার করেছে স্বীকৃত এমন ভূমির উপরও তাদের প্রথা/রীতি অনুযায়ী অধিকার সংরক্ষিত হবে, অনুচ্ছেদ ২৮ এর সারমর্মঃ আদিবাসীরা স্বাধীনভাবে ও স্বইচ্ছায় সম্মত না হলে রাস্ট্র আদিবাসী এলাকার কোন ভূমি ব্যবহার/অধিগ্রহণ করতে পারবে না, অনুচ্ছেদ ৩০ এর সারমর্মঃ আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় যে কোন সামরিক কার্যক্রমে তাদের পূর্বানুমতি নিতে হবে ও রাজি না হলে করা যাবে না (রাস্ট্র পর্যায়ে ঘোষিত যুদ্ধ ব্যতিত), অনুচ্ছেদ ৩২ এর সারমর্মঃ আদিবাসী এলাকায় যে কোন প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রম তাদের পূর্বানুমতি নিয়ে করতে হবে, অনুচ্ছেদ ৩৬ এর সারমর্মঃ একই জাতির আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন আন্তর্জাতিক সীমান্ত দ্বারা বিভক্ত হলে রাস্ট্র সমূহ তাদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ দিতে হবে।
আমাদের দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় সমূহ
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এস আর ও নং-৭৮ -আইন/২০১৯, তারিখঃ ১৯ মার্চ ২০১৯ মোতাবেক বাংলাদেশে ৫০ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় আছে। প্রয়াত বিরাজ মোহন দেওয়ান রচিত “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে চাকমা জাতির দেশে দেশে রাজ্য স্থাপনের ইতিহাস বর্ণনা করে ৬৭ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “চাকমাদের পূর্বপুরুষেরা যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিজ সন্তান নহে তাহা এই আলোচনা হইতে স্পষ্ট।’ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein গ্রন্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী সকল উপজাতির নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য বিশদ বর্ণনা করেছেন। তিনি ২৮ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “A greater portion of the hill tribes, at present living in Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arracan. This is asserted both by their traditions and by records in the Chittagong Collectorate.” বিরাজ মোহন দেওয়ান সহ প্রবীণ চাকমা লেকখগণ শুধুমাত্র উপজাতি শব্দটি ব্যবহার করেছেন। বোমাং রাজপরিবার ও মং রাজপরিবারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করলে পরিস্কারভাবে তাদের পাশ্ববর্তী দেশ মায়ানমার হতে স্থানান্তরিত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭’তে জনাব জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা “উপজাতি” শব্দটি বহাল রেখেই চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে “উপজাতি/ক্ষুদ্র জাতিসত্তা/নৃগোষ্ঠী” করা হয়েছে। এখানে তুলনামূলক উল্লেখ করা যায় ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে চাকমারা বসবাস করলেও, ভারতের মেঘালয়, আসাম ও মিজোরামে Scheduled Tribe হিসেবে নথিভূক্ত আছেন। ভারতের ত্রিপুরায় ত্রিপুরাগণ Scheduled Tribe, এভাবে নাগাল্যান্ড সহ সেভেন সিস্টার্সে বসবাসকারী সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী Scheduled Tribe।
আদিবাসী ইস্যুর কূটনৈতিক বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে UNDRIP এখনো ঠিক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা বৈধ, কিন্তু প্রকৃত গণহত্যাকারী ইজরাইল এর প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু’র বিরুদ্ধে অবৈধ এর ন্যায়। যেমন ছোট্ট এই বাংলাদেশের ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কে তাঁরা আদিবাসী স্বীকৃতি দিচ্ছে এক বাক্যে!, কিন্তু নিজেরা এখনো UNDRIP লিগ্যালি নন বাইন্ডিং হিসেবেও সমর্থন করেনি! এটাই তাদের Rules Based World Orders, Democratic Values এবং unconditional support for Human Rights এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাদের ৫০ টি অঙ্গরাজ্যের ইতিহাস ২০ মিনিট পড়লেই সুস্থ মস্তিষ্কের একজন মানুষ নির্বাক থাকবে অনেকক্ষণ! ফিলিস্তিনি আদিবাসীদের স্বীকৃতির বিষয়ে তাদের অবস্থান কি জিজ্ঞেস করারও কোন ব্যবস্থা আমাদের আছে কি? বিশ্ব মানবতার প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ড UNDRIP লিগ্যালি নন বাইন্ডিং হিসেবে সমর্থন করেও সরে আসার পথে আছে। তাঁরা এটা Treaty of Waitangi এর ২০০তম বার্ষিকী ২০৪০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নন বাইন্ডিং হিসেবে সমর্থন করেছিলো। Treaty of Waitangi এর মাধ্যমে মাওরিদের “অটিওরোয়া’ এর মধ্যে গড়ে ওঠেছে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাস্ট্র “নিউজিল্যান্ড”, যে চুক্তির “মাওরি” রিড আউট এবং “ইংরেজি” রিড আউটে ভিন্নতা রেখে ঠকানো হয় ভূমিজ সন্তানদের। এখন কেন আবার সরে যেতে চাচ্ছে বর্তমান নিউজিল্যান্ড সরকার? কারণ বর্তমান সরকার দেখছে আস্তে আস্তে স্বাধীন মাওরি রাস্ট্র গঠনের গণভোটের দিকে যাবে UNDRIP এর প্রতি এই সমর্থন। অর্থাৎ প্রায় ২০০ আগে করা শাসকদের ভূলের মাশুল হিসেবে বর্তমান প্রজন্ম রাস্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতা হুমকির মুখে ফেলতে নারাজ। এটা পরিস্কারভাবে প্রতীয়মান সমর্থন প্রত্যাহার না করলেও নিউজিল্যান্ডে UNDRIP আলোর মুখ দেখতে বহু দেরি আছে। অস্ট্রোলিয়া UNDRIP লিগ্যালি নন বাইন্ডিং হিসেবে সমর্থন করলেও বাস্তবায়ন বা আইনে পরিণত করার ধারে কাছেও নেই। কানাডা বহু আগে পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ রাস্ট্র হয়েছে ভূমিজ সন্তানদের ওপর সুপরিকল্পিত এবং নথিভুক্ত সব গণহত্যা চালিয়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তাঁরা গত কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্ব হতে সাদরে অভিবাসী গ্রহণ করেছে, এখন পর্যন্ত অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ রাস্ট্র হলো কানাডা। ব্রিটিশ কলম্বিয়া সহ কানাডার কোথাও এখন আর ভূমিজ সন্তানদের সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়া বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। তাই এখন তাঁরা নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই টিকে থাকা ভূমিজ সন্তানদের সংরক্ষণের দিকে এগোচ্ছে, UNDRIP কে আইনে পরিণত করেছে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। অতি ছোট্ট দেশ ভূটানও UNDRIP কে তাঁর সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতার জন্য হুমকি মনে করে ও সমর্থন করে না। UNDRIP স্বাক্ষরকারী চীনে শুধুমাত্র “উইঘুর মুসলিম” এর প্রকৃত অবস্থার বিষয়ে জানার চেষ্টা করলেই বাস্তবতা জানা যাবে! International Work Group for Indigenous Affairs এর তথ্য মতে, ” ভারত এই শর্তে UNDRIP স্বাক্ষর করেছে যে স্বাধীনতার পর সকল ভারতীয় আদিবাসী। সে জন্য ‘আদিবাসী ধারণা’ ভারতের উপর প্রযোজ্য হবে না। ভারতের নিজস্ব আইন ও নীতিমালার কোন পরিবর্তন হবে না।” ভারতের বর্তমান Scheduled Tribe তালিকাটির পিডিএফ কপির আকার ১৩ পাতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নাম Ministry of Tribal Affairs।
প্রয়াত বিরাজ মোহন দেওয়ান তাঁর “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত” বইয়ে স্পষ্ট লিখেছেন যে তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিজ সন্তান নয়। বিরাজ মোহন দেওয়ান মূলতঃ ক্যাপ্টেন টি.এইচ লুইন এর The Hill Tracts of Chittagong and The Dwellers Therein, প্রকাশকাল ১৮৬৯, বইয়ের দাবীর বিপরীতে চাকমারা একটি সভ্য জাতি, সুদীর্ঘ ঐতিহ্য এবং পথ পরিক্রমার অভিযাত্রী প্রমাণে ব্রতী হয়েছিলেন। অন্য দিকে আজ থেকে ১৫৫ বছর পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন লুইন মূলত সেখানকার অসভ্য জীবন যাপনে অভ্যস্ত উপজাতিদের উন্নয়নে নিজের ও ব্রিটিশদের অবদান রেকর্ডভূক্ত করার মানসে তাঁর অমূল্য বইটি লিখেছেন। তাই তাদের কারোর মধ্যে “আদিবাসী” ইস্যুতে পক্ষপাতিত্ব বা অসত্য তথ্য প্রদানের কোন প্রশ্ন আসে না। বিপরীতে নিজেদের কে সভ্য এবং অভিজাত প্রমাণ করতে গিয়ে প্রয়াত বিরাজ মোহন দেওয়ান এতোটাই গভীর ও তথ্যবহুলভাবে লিখেছেন যে, কেউ চাইলেও সেখানে “উপজাতি” শব্দটি “আদিবাসী” দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা প্রায় অসম্ভব। সেটা করা হলে শুরু থেকে বইয়ের অংশ সমূহের ধারাবাহিকতা ও যথার্থতা নষ্ট হবে সম্পূর্ণভাবে। এখন অনেকে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং কল্পিত আদিবাসী স্বীকৃতি একই সাথে দাবী করেন তখন অবাক হই! মানুষ এতো পল্টিবাজ, নীতিহীন হয় কিভাবে? মানব জীবন কি এমএস ওয়ার্ড ফাইল, টাইপের মাঝখানে মন চাইলেই কন্ট্রোল Z বাটন প্রেস করবেন ইচ্ছে মতো? “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মূলতঃ পাহাড়িদের রাস্ট্রের অংশগ্রহণ সহ স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে এবং পাহাড়িদের বাড়তি সুবিধা দিতে গিয়ে সুস্পষ্টভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালিদের কিছু কিছু সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।” তাহলে এখন স্বার্থান্বেষী মহল কেন আদিবাসী হতে চান? সেটার মূল কারণ হলো UNDRIP! যা “কোন প্রকার রাস্ট্রের অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যতিত পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এনে দিবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী মুক্ত করবে।” অর্থাৎ এটা মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নস্যাৎ করা বা ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা! মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশদের স্কটল্যান্ডেও কিন্তু গণভোট হয়েছে, যেহেতু তারা “ইংলিশ” এর পরিবর্তে “স্কটিশ” হিসেবে স্বীকৃত।
আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন সময় হতে মানব বসতির গোড়াপত্তন এবং আদৌও কোন ভূমিজ সন্তান আছে কিনা বা এই অল্প জায়গার মধ্যে ১১ থেকে ১৬ টি জনজাতির উত্পত্তি কিভাবে হতে পারে তা ব্যাপক গবেষণার বিষয় দেশের সব স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু কিছু বিদেশি দূতাবাস একজোট হয়ে যে ভয়াবহ আয়োজন শুরু হয়েছে, তা দেখে কৌতূহলী মন জানতে চায় আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন এলাকা কোন সম্প্রদায়কে নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য দেওয়া হবে? পার্বত্য বাঙ্গালির ভবিষ্যৎ কি হবে? সেনাবাহিনীর অবস্থান তথা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতা সুরক্ষার নিশ্চয়তা কি? পুরো দেশ মিলিয়ে ৫০ টি স্বায়ত্তশাসিত/ বিশেষ অঞ্চল এর রুপরেখা কি হবে?
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পিজেএসএস (সন্তু লারমাপন্থী), পিজেএসএস (এমএনপন্থী/ সংস্কার), ইউপিডিএফ (মূল দল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), কুকি চিন ন্যাশনাল পার্টি (কেএনএফ), মগ লিবারেশন আর্মি (এমএলএ/এএলপি) নামক ৬ টি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভয়াবহ আন্তঃকোন্দলে লিপ্ত সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে। এছাড়াও মুরং পার্টি সহ আরো বেশ কিছু পাড়া ভিত্তিক ছোট ছোট সশস্ত্র সংগঠন আছে, যাদের কথা সচরাচর মিডিয়ায় আসে না। এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন গুলো মুখে যতই জাতিগত অধিকার আদায়ের কথা বলুক না কেন, এদের আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। মূল উদ্দেশ্য হলো এলাকা ভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার এবং আধিপত্য ধরে রেখে চাঁদাবাজি। যার ফলশ্রুতিতে চলছে ব্রাশফায়ার, গুম, খুন, আফিম/গাঁজার চাষ ও মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, এবং এখন নতুন করে যোগ হয়েছে ঘৃণ্য নারী পাচার। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো নিজেদের জাতি গোষ্ঠীর সাধারণ লোকজনেরা এখন পাহাড়ের এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ! কয় দলকে চাঁদা দিবে? কোন দলের মিছিলে যাবে? আবার এক দলকে চাঁদা দিলে অন্য দল এসে মারে! মিছিলে না গেলেও মারে, একদলের মিছিল গেলে অন্য দল এসে মারে। মাঝে মধ্যে রাতে এসে রান্না করা সব খাবার খেয়ে যায়, হাঁস-মুরগি, শাক সবজি নিয়ে যায়! সাধারণ পাহাড়িরা এসব কথা কাউকে কোনভাবে বলতেও পারে না, মুখ খুললেই আবার রাতে এসে মেরে রেখে যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান ৬টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে পিজেএসএস (সন্তু লারমাপন্থী) ব্যতিত সবাই চুক্তি বিরোধী এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন ও প্রশাসনে স্থায়ী অবস্থান চায়। ১১ জুন ১৯৮৯ তারিখে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সঞ্জয় হাজারিকার প্রতিবেদনে পিজেএসএস মুখপাত্র বিমল চাকমা পরিস্কার বলেছেন ভারত তাদের অস্ত্র ও সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে, যা লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এর বইয়ে মোটামুটি বিস্তারিত ভাবে ওঠে এসেছে। লেখকের এই বইয়ে যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা (শান্তিবাহিনীর সাবেক গেরিলা নেতা এবং ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগের টিকেটে খাগড়াছড়ি আসন হতে নির্বাচিত এমপি) এর জিজ্ঞাসাবাদ অংশ হতে জানা যাচ্ছে যে ভারতের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো, “সম্ভব হইলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া প্রথমে বাংলাদেশের ‘প্রটেক্টরেট স্টেট’ তৈরি করা এবং পরে সিকিম রাজ্যের ন্যায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত করিয়া সম্প্রসারণবাদী নীতিকে কার্যকরী করা (পৃষ্ঠা ৩৫৯)।” UNDRIP মোতাবেক সাংবিধানিকভাবে আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান ভারতের সেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের প্রথম ধাপকে স্বপ্রণোদিতভাবে পূরণ নয় কি? বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান ৬টি সংগঠনকে কেউ না কেউ সব কিছু দিচ্ছে, আমাদের জোর দিতে হবে অস্ত্র হাতে নেওয়ার/দেওয়ার লোকের অভাব নেই বিষয়টির উপর। ২১ জুন ২০২৪ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত আলতাফ পারভেজ ও আশফাক রণির নেওয়া সাবেক মিজো গেরিলা নেতা এবং মিজোরাম এর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গার সাক্ষাৎকার থেকে কেএনএফ ও সেভেন সিস্টার্সে নতুন করে শুরু হওয়া ‘কুকি জো’ সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয়ে পরিস্কার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটা পরিস্কার বুঝা গেছে কেএনএফ এখন ওপারের কুকি জো সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলোর সাথে সমন্বয় করে চলছে, জোরামথাঙ্গাদের বহুবিধ মতলব আছে। ২৫ নভেম্বর ২০১১ তারিখে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন এর শামীমা বিনতে রহমান কে দেওয়া জনাব সন্তু লারমার সাক্ষাৎকারে পরিস্কার ওঠে এসেছে ওনাদের কয়েক শত অস্ত্রধারী থাকার বিষয়টি। আগেই বলেছি পিজেএসএস (সন্তু/মূল) এর নিয়ন্ত্রক এখন কে! এসব অস্ত্রধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন গুলোকে নিরস্ত্রকরণের কথা না বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য তাড়াহুড়ো এবং UNDRIP এর পালে হাওয়া দেওয়া একজন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশির পক্ষে কিভাবে সম্ভব হতে পারে? দুটি রক্তক্ষয়ী দেশ বিভাজনের ফলে সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশ রাস্ট্র সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, আর্থসামাজিক, শিক্ষা, নাগরিক সচেতনতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সহ যাবতীয় মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত এর ধারে কাছেও নেই।
আমাদের সমতলবাসীদের বুঝতে হবে, এটা সম্বোধনে সম্মান বা সরল উদ্দেশ্য চাওয়া কোন স্বীকৃতির দাবী নয়। আদিবাসী স্বীকৃতির দাবীর পিছনে আন্তর্জাতিক গ্রেট গেম জড়িত, যেটা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতা হুমকির মুখে পড়বে। নিঃসন্দেহে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের সাথে অনেক অন্যায় হচ্ছে এবং হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক সরকার চাইলে জাতিসংঘের ঘোষণার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দিতে পারে তাদের উন্নয়নের জন্য। তবে কোনভাবেই জাতিসংঘের ঘোষণার ফাঁদে পা দিয়ে ঐতিহাসিক এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের বিপরীতে যাওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষক।

















