বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নতুন সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কি কোন সুযোগ তৈরি করছে?

fec-image

বার্মিজ জান্তা প্রধান জেনারেল (অব.) মিন অং হ্লাইং আজ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। যার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে আর্জেন্টিনার একটি আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। আজ শুক্রবার তার সামরিক জান্তা-সমর্থিত ইউনিয়ন পার্লামেন্টের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।

এই দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। ২০২১ সালে এই জেনারেলের নেতৃত্বে মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার অং সান সূচিকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। এর পূর্বে ২০১৭ সালে এই জেনারেলের সহায়তায় দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে দেন সুচি। এরপর থেকেই মিয়ানমারে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

মিয়ানমারে সম্প্রতি তিন ধাপে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে শেষ হওয়া এই নির্বাচনে প্রত্যাশিতভাবেই সামরিক জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি (Union Solidarity and Development Party) নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। নবগঠিত আইনসভার ভোটে মিন অং হ্লাইং দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। ৩ এপ্রিল ২০২৬-এ ইউনিয়ন পার্লামেন্টের ৫8৪ জন প্রতিনিধির মধ্যে তিনি ৪২৯টি ভোট পেয়ে জয়ী হন।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ জালিয়াতি বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সামরিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারের পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন জেনারেলদের দখলে। ফলে বলা যেতে পারে, নতুন সরকার ও পার্লামেন্ট পুরোটাই জেনারেল ও সাবেক জেনারেলদের তারা ও নিয়ন্ত্রণে গঠিত হবে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি শুক্রবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মিন অং হ্লাইংকে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে অভিনন্দন জানিয়েছে। চীন-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি আরও পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, চীন সীমান্তে অবস্থিত তাদের ওয়া স্টেট ছিটমহলটি মিয়ানমারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অন্যদিকে আরাকান আর্মির সাথে যুক্ত থ্রি ব্রাদার্স আলায়েন্সভূক্ত অন্য দুইটি সশস্ত্র গোষ্ঠী টিএনএলএ ও এমএনডিএ পূর্বেই আরাকান আর্মির সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আরাকান আর্মির অপর মিত্র সিএনএফ এর সাথে ও তাদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। অং সান সুচির সমর্থক ইউএনজি সরকার ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়েছে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পিডিএফ এর উপর। বিভিন্ন স্থানে পিডিএফ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এ সকল কারণে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পূর্বের থেকে অনেক বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন সরকার গঠন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করবে। যদিও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চলমান গৃহযুদ্ধ এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে আয়োজিত এই নির্বাচনকে অনেকেই জান্তা সরকারের ক্ষমতা বৈধ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবুও আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের পথ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

রাখাইনের ১৭টি জেলার মধ্যে মাত্র চারটি জেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে। বাকি ১৪ টিতে জান্তা সরকার নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়নি মূলত আরাকান আর্মির বাধার কারণে বা সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। মিয়ানমারের আর কোন প্রদেশেই এত খারাপ অবস্থায় পড়েনি কেন্দ্রীয় সরকার। এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাখাইনের তিনটি শহর বাদে বাকি সবগুলো শহর আরাকান আর্মি দখল করে নেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা শহরগুলো হচ্ছে সিটুএ, কিয়াকভিউ ও মানাওয়ে। এরমধ্যে সিটুএ রাখাইনের রাজধানী এবং সেখানে রয়েছে ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট। যার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া বন্দর থেকে সিটুুয়ে বন্দর এর মাধ্যমে মিজোরামের আইজল পর্যন্ত মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। প্রায় সমাপ্তির পথে এই প্রজেক্টটি বাংলাদেশের উত্তরে অবস্থিত ভারতের চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডরের বিকল্প নিরাপত্তা যোগাযোগ হিসাবে দেখা হচ্ছে। ফলে এটি ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কিয়াকফিউতে চাইনিজ সহযোগিতায় গভীর সমুদ্র বন্দর ও এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাকিস্তান চায়না ইকোনোমিক করিডরের (সিপেক) আদলে চায়না মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোরের (সিমেক) আওতায় কিয়াকফিউ থেকে মান্দালয় হয়ে চাইনিজ ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং পর্যন্ত মাল্টি মডেল প্রজেক্ট চালু রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা চাইনিজ ক্রুড ওয়েল এখানে খালাস হয়ে ইউনানে পৌঁছায়। চায়নার কাছে এক মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত সীমাবদ্ধতার উত্তম বিকল্প। ফলে এই দুটি শহর চায়না, ভারত ও মায়ানমারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কখনোই চাইবে না গৃহযুদ্ধের কারণে এখানে তাদের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। ইতিমধ্যেই তারা শহর দুটি আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করেছে।

এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আরাকান আর্মির রাখাইনে আর কোন অর্জন নেই। বরং মিয়ানমার আর্মির আক্রমণের মুখে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মির অনেক সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে বোঝা গেছে, আরাকান আর্মি তাদের অর্জনের সর্বশেষ সীমারেখা ছুঁয়ে ফেলেছে। একের পর এক মিত্র হারানো, চায়নার সমর্থন হারানো, ভারত ও বাংলাদেশের সাথে দোটানা সম্পর্কে আরাকান আর্মি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় তাদের শক্তি পূর্বের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে তাদের আক্রমণে অনেক স্থানেই আরাকান আর্মিকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। নবনির্বাচিত সরকার রাখাইনে তার হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় আরাকান আর্মি সর্বোচ্চ রাখাইনের দক্ষিণাঞ্চল কেন্দ্রীয় সরকারকে ছেড়ে দিয়ে উত্তরাঞ্চলে নতুন প্রদেশ গঠন করে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সমঝোতায় যাওয়া ছাড়া অধিক অর্জন বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না। কেননা দক্ষিণের বন্দর শহরগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারত ও চায়নার কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কোনভাবেই আরাকান আর্মির মত বিদ্রোহীদের কাছে এই শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না। বিশেষ করে আরাকান আর্মির সাথে পশ্চিমা যোগাযোগ তাদেরকে সন্ধিহান করে তুলেছে। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক যোগাযোগ থাকলেও বঙ্গোপসাগর কিংবা রাখাইনে যুক্তরাষ্ট্র কোন ঘাঁটি তৈরি করে বসুক এটা তাদের পছন্দনীয় বলে গত এক দশকের কার্যক্রমে মনে হয়নি।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইজরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে সারা বিশ্বের মত মায়ানমার তথা রাখাইনেও তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিচালিত বিমান আক্রমণ পূর্বের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। একই জ্বালানি সংকটের কারণে আরাকান আর্মি তৎপরতাও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। মিয়ানমারের অধিকাংশ ধান রাখাইনে উৎপাদিত হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এখন ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে জ্বালানি পাচার হওয়া পূর্বের

তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। ফলে রাখাইনে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে এবং এর শিকার হচ্ছে স্থানীয় রাখাইন ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের হার পূর্বের তুলনায় গত কয়েক মাসে বেড়েছে বলে সীমান্তের খবর। মুখে যাইই বলা হোক, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ম্যানেজ করে রোহিঙ্গারা নিয়মিত এপার ওপার করে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের বাংলাদেশে আগমন পূর্বের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এটা পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন, প্যালেস্টাইনের বিরুদ্ধে ইজরাইলের যুদ্ধ ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ, আগ্রহ ও সহায়তা হ্রাস পেয়েছে। ট্রাম্প সরকার বিভিন্ন সেক্টরে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমিয়ে দেয়ার প্রভাব

পড়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এখানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পূর্বে যেখানে রোহিঙ্গাদের মাসিক ১২ ডলার করে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হতো, বর্তমানে সেই সহায়তার সংখ্যা যেমন কমানো হয়েছে, তেমনি সহায়তা তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরিতে ১২ ডলার, দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে ১০ ডলার এবং তৃতীয় ক্যাটাগরিতে ৭ ডলার করে দেয়া হচ্ছে। এই তৃতীয় ক্যাটাগরিতে ৭ ডলার করে দেয়া হচ্ছে মূলত কর্মক্ষম নারী ও পুরুষদেরকে। এর মাধ্যমে মূলত তাদেরকে কর্ম করে জীবন নির্বাহ করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে কর্ম করার সুযোগ খুবই সীমিত। কার্যত রোহিঙ্গাদেরকে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করার পরোক্ষ কৌশল হিসাবে এই পন্থা গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো। এটাও সত্য যে, কর্মক্ষম রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে টেকনাফ, কক্সবাজার এমনকি চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা সন্ধ্যায় ক্যাম্পে ফিরে গেলেও চট্টগ্রামের রোহিঙ্গারা সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে ক্যাম্পে ফিরে যায় মূলত রেশন নেয়ার দিনগুলোতে। এভাবে ধীরে ধীরে রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

এই সহায়তা হ্রাস পাওয়ার কারণে ক্যাম্পের মধ্যে থাকা আন্তর্জাতিক সহায়তায় পরিচালিত রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে যারা এ সকল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তারাও বেকার হয়ে পড়েছেন। তারাও কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন ক্যাম্পের বাইরে। মিয়ানমারের মুদ্রার সাথে বাংলাদেশের মুদ্রার মানের বিপুল ব্যবধান এবং ক্যাম্পে বসবাস ও রেশনিং সুবিধা থাকার কারণে রোহিঙ্গারা অনেক কম পারিশ্রমিকে টেকনাফ কক্সবাজার চট্টগ্রামের শ্রমভিত্তিক কাজগুলো গ্রহণ করছে। এতে স্থানীয় মজুরদের উপর চাপ পড়ছে। কেননা ওই পারিশ্রমিকের তারা নিজেরা পরিবার নিয়ে জীবন নির্বাহ করতে পারে না। এতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ বাড়ছে।

চাকুরী ও আর্থিক সহায়তা হ্রাস পাওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিদেশ যাবার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই বাংলাদেশী পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং সেখানে নানা অপরাধপ্রবণতার সাথে জড়িত হওয়ার কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশী শ্রমজীবীদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। একই কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে মাদকের সহজলভ্যতা থাকায় অনেক রোহিঙ্গায় মাদক পাচার কার্যক্রম এর সাথে ক্রমাগত জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও ক্যাম্পে চরমপন্থী সংগঠন গুলোর উপস্থিতি থাকায় বেকার বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা এদিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে ধারণা করছে বিশেষজ্ঞগণ। এতে স্থানীয় তথা বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরমভাবে হুমকির মধ্যে পড়তে পারে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, একটি দুর্যোগ মাথায় নিয়ে এসেছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেই উপকূলীয় এলাকার প্রলয়ঙ্কাকারী ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হয়েছে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা হয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করে এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ করে। এবারে বিএনপি ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরান আক্রমণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী আটকে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। কিন্তু সে দামেও তেল ও গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে সারা বিশ্বে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধের বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিশ্ব মহল চিন্তিত। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে প্রবল জ্বালানি সংকট।

টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন এবং দেড় বছরের অস্থিরতা পূর্ণ অন্তবর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে একটি পঙ্গু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের নামে মন্ত্রী পদমর্যাদায় একজন বিশেষ দূতকে দায়িত্ব দিলেও কার্যত কোনো অর্জন হয়নি। কিছু আন্তর্জাতিক সেমিনার, চটকদার কথাবার্তা ও দেশবাসীকে ধাপ্পাবাজি দেয়া ছাড়া ইউনুস সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কিছুই করেনি। বরং এই সমস্যাকে পুঁজি করে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের অনুবর্তী হয়ে মানবিক করিডরের মত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিধ্বংসী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল তারা। দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিবাদ ও সেনাবাহিনীর আপত্তির মুখে ইউনুস সরকারের সেই বিধ্বংসী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের কোন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা চায় না রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যাক। এটা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মহলও জানে, তবুও তারা মরুভূমির কাছে পানি প্রত্যাশার মত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে নিজস্ব পরিকল্পনা ও পদ্ধতি প্রণয়ন না করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা প্রত্যাশা করছে। অথচ এরা সবার সামনে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মূল জনস্রোতের সাথে এসিমিলেশন এর জন্য ক্যাম্পের ভিতরে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাই এই পথ পরিহার করে নতুন সরকারকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের নিজস্ব পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে যদি পাওয়া যায় সেই পদ্ধতি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে, না হলে বাংলাদেশকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

নতুন সরকার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পূর্বেই যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট সরকারকে রোহিঙ্গা সমস্যার মতো ইস্যুর দিকে মনোযোগ দেয়ার ফুসরত দিচ্ছেনা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সফলতার কারণে তাদের উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সমগ্র দেশবাসী আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি সব পাল্টে দিয়েছে। এ সময়ে সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হবে এমন প্রত্যাশা করা বাতুলতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা প্রণীত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে যে বিশ্ব পরিচালিত হয়ে এসেছে, বর্তমান যুদ্ধের পর তার অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। ইরান এশিয়া ও ইউরোপকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে ডলারের পরিবর্তে চাইনিজ ইউয়ান ও ইউরোপীয় ইউরো মুদ্রা ব্যবহারের জন্য বিশেষ ছাড় অফার করেছে। এটি গৃহীত হলে বিশ্বে ডিডলারাইজেশন ঘটবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার পতন ঘটবে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কূটনীতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও সমর বিশেষজ্ঞগণ জোরেসোরে বলতে শুরু করেছে, নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবতা ও উপস্থিতি তারা অনুধাবন করতে শুরু করেছেন। এখানে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে ঘিরে

নতুন পোলারাইজেশনের জন্ম হবে। সেই পোলারাইজেশনে এশিয়া হয়তো চায়নার নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি দক্ষতার সাথে প্রয়োজনীয় কৌশলী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের নতুন দ্বার নতুন সরকারের সামনে উন্মোচিত হতে পারে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: মিয়ানমার, মেহেদী হাসান পলাশ, রোহিঙা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন