সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ


রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত পাহারা বা যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাসের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। বর্তমান বিশ্বে যে রাষ্ট্র তার সশস্ত্র বাহিনীকে দক্ষ, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং সর্বদা প্রস্তুত রাখতে সক্ষম হয়, সেই রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অধিক কার্যকর সক্ষমতা অর্জন করে। এ বাস্তবতায় কোনো সরকারপ্রধানের সামরিক প্রশিক্ষণ বা মহড়া সরাসরি পরিদর্শন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করার সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনকে অনেকেই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। মাঠপর্যায়ে সেনাসদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ, বাঙ্কারে নেমে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা, ছদ্মবেশে অবস্থানরত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের সঙ্গে খাবার ও চা ভাগ করে নেওয়া—এসব কর্মকাণ্ড একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীর পেশাদার প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য দেশের জন্য গৌরবের বিষয়। সেই অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীকে শুধু একটি যুদ্ধক্ষম বাহিনী নয়, বরং বহুমাত্রিক জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা আরও জটিল।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক—প্রতিটি অঞ্চলেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা এবং হাইব্রিড যুদ্ধের ধারণা আজ প্রতিটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ আর শুধু অস্ত্র পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তথ্যযুদ্ধ, সমন্বিত অভিযান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি দক্ষ ও পেশাদার সেনাবাহিনী অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—”জনগণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে।” বাস্তবে এই আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার, শৃঙ্খলা এবং জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একদিনে গড়ে ওঠে না; দীর্ঘদিনের কর্মদক্ষতা, আত্মত্যাগ এবং সুশৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়।
গ্রীষ্মকালীন মহড়ার মতো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাস্তবধর্মী মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সদস্যরা প্রতিকূল আবহাওয়া, সীমিত সম্পদ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক মানের সামরিক বাহিনীগুলো নিয়মিত এ ধরনের অনুশীলনের মাধ্যমেই নিজেদের সক্ষমতা উন্নত করে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই সমর্থনের সঙ্গে একটি মৌলিক নীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সেনাবাহিনীর পেশাদার ও অরাজনৈতিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বেসামরিক নেতৃত্বের অধীনে একটি দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সামরিক বাহিনীই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক কার্যকর।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং যৌথ বাহিনীগত সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। কেবল নতুন অস্ত্র সংগ্রহ নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং নেতৃত্ব বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শক্তিশালী সেনাবাহিনী মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; বরং যুদ্ধ প্রতিরোধের সক্ষমতা। একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক বাহিনী সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে শক্তিশালী প্রতিরোধের বার্তা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতেও ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামো নির্মাণ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি কেবল প্রতিরক্ষা খাতের বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি অঙ্গীকারও সমানভাবে অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে যেমন আধুনিক সেনাবাহিনী দরকার, তেমনি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও দরকার। এই দুইয়ের ভারসাম্যই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করে।
পরিশেষে বলা যায়, গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা যদি ধারাবাহিকভাবে পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগকে এমনভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকা, পেশাদারিত্ব এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অর্থনীতি বা কূটনীতিতে নয়; তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতেও নিহিত। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি আধুনিক, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনগণের আস্থাভাজন সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নিয়মিতভাবে সেই সক্ষমতা উন্নয়নে আন্তরিক মনোযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে বাহিনীর পেশাদার স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক দায়িত্বকে সম্মান করে, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।















