পার্বত্য বাঙ্গালী বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা ভুলে গেলেন চার এমপিই


গত ২১ জুন অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি যৌথ পত্র দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত তিন ও সংরক্ষিত এক এমপি। এই যৌথ আবেদনপত্রে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে করারোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তার বিলুপ্তি চাওয়া হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই দাবি তারা করতেই পারেন। It’s fare enough. কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এই এমপিরা কি কেবলই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি? একই পরিবেশে জীবন ধারণ করা এবং পাহাড়ের অন্যতম পিছিয়ে থাকা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য একই সুবিধা তারা চাননি কেন এ প্রশ্ন তোলা আশা করি অসংগত হবে না।
১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯৮৯ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সহ বিভিন্ন সেক্টরে বিশেষ কোটা, মুক্তি বা ছাড় পেয়ে আসছেন। এটা নিয়ে পাল্টা আলোচনাও রয়েছে। কারো মতে, কত বছর তারা এই সুবিধা পাবেন? এটা কি অনন্তকালের জন্য?
এ নিয়ে বিভিন্ন সময় আরো যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সবাই কি প্রকৃত অনগ্রসর? দশকের বড় দশক ধরে চলমান এই রেয়াত ও প্রণোদনা প্রকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, নাকি সেখানকার অগ্রসর গুটিকয়েক জনগোষ্ঠী সকল সুবিধা নিজেরা করায়ত্ত করছে এবং প্রকৃত অনগ্রসরদের বঞ্চিত করছে? প্রশ্ন রয়েছে, এক রাষ্ট্রে ভিন্ন আইন কেন চলবে, তারা যেহেতু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার রেয়াত, ছাড় ও প্রণোদনা পাচ্ছেন তাহলে ইনকাম ট্যাক্স কেন দেবেন না সে প্রশ্নও তুলেছিল কেও কেও। সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তাদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়। বাজেটের উপর আলোচনায় রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ও সদ্য সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এ বিষয়ে পুনঃ বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। এরপর এই যৌথ পত্রের অবতারণা।
পাহাড়ের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী করমুক্ত সুবিধা ভোগ করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তাই সেখানকার উন্নয়ন ও সরকার পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ করা হয় সমতলের মানুষের করের টাকায়। এ নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হিসেবে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর প্রতি এতোটুকু উদার আমরা হতেই পারি। তবে আমার প্রশ্ন, সেটা কেবল পাহাড়ি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? সমতলের যে সমস্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা রয়েছেন তাদের মধ্যেও কোন কোন সম্প্রদায় অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। তাহলে তাদের বাদ দিয়ে কেবল পাহাড়ের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিশেষ সুবিধা কেন? পাহাড়ের যে সমস্ত উপজাতীয় এমপি তাদের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এই সুবিধা চাইলেন, তারা কিন্তু কেউ সমতলের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর নাম একবারও নেননি। অথচ তাদের দাবি আদায়ের জন্য আবার এদেরকে ব্যবহার করেন, এদের নিয়ে কমিটি করেন, আন্দোলন করেন।
অন্যদিকে পাহাড়ের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পশ্চাদপদ কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, অধ্যায়নের সূত্রে আমি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, পাহাড়ের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অনগ্রসর বা পশ্চাদপদ নয়। বরং কোন কোন উপজাতীয় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল জনগোষ্ঠীর থেকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থান, জীবন যাত্রার মানসহ বিভিন্ন সূচকে বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে। তাহলে তারা কেন এই বিশেষ রেয়াত ও প্রণোদনা পাবে? কেন আমরা অগ্রসরদেরকে বাদ দিয়ে যে সকল উপজাতি প্রকৃতপক্ষেই অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ রয়েছে এই সুবিধাগুলো তাদের জন্য এক্সক্লুসিভলি নিশ্চিত করব না? কেননা তাদের জন্য যদি এক্সক্লুসিভ না করি তাহলে রাষ্ট্রের এই সকল সুবিধা ও প্রণোদনাগুলো অগ্রসর জনগোষ্ঠী করায়ত্ব করে নেবে এবং এটাই হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। আপনি একটা পুকুরের মধ্যে যদি খাবার ছুঁড়ে দেন তাহলে বড় মাছগুলো শক্তি ও সক্ষমতা দিয়ে সেই খাবারের সবটুকু না হলেও সিংহভাগ খেয়ে নেবে। দুর্বল মাছগুলো অভুক্তই থাকবে। এভাবেই দিনের পর দিন বড় মাছগুলো আরো বেশি খেয়ে বেশি বড় ও শক্তিশালী হবে এবং কম খাবার পেয়ে দুর্বল মাছগুলো আরো দুর্বল ও বামন হয়ে যাবে। এটাই বাস্তবতা।
পাহাড়ের স্থানীয় সরকারে নিয়োগ গুলোতে আমরা এই চিত্র হরহামেশা দেখতে পাই। প্রাসঙ্গিক আরেকটি উদাহরণ দিতে চাই, এই চিঠিতে বারবার ট্যাক্স দাতা হিসেবে গরিব জুম চাষি, সাধারণ ছোট ব্যবসায়ীদের কথা বলা হয়েছে। এখানেই শুভঙ্করের ফাঁকিটা। প্রকৃতপক্ষে গরিব জুন চাষি বা সাধারণ ছোট ব্যবসায়ী বা স্বল্প আয়ের মানুষ কোথাও কাউকে ট্যাক্স দিতে হয় না। নতুন বাজেটে সর্বনিম্ন করসীমা ঘোষণা করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর চেয়ে নিম্ন আয়ের লোকদের কর দিতে হবে না, হোক পাহাড়ে বা সমতলে। অর্থাৎ কর আরোপ করা হয়েছে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য। নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের জন্য নয়। কিন্তু নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে সুবিধা নিতে চাইছে বা নেবে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা। এমপিরা আবেদন করতে পারতেন যে এই নিম্ন আয়ের করমুক্তির সীমা অনগ্রসর বা পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর জন্য আরো বৃদ্ধি করা হোক। অর্থাৎ ৫ লাখ টাকা করা হোক। যাতে সেখানকার অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের লোকজন কর মুক্তির আওতা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু যারা বছরে কোটি-কোটি টাকা, বা শত কোটি টাকা আয় করছেন, কেবলমাত্র উপজাতি হওয়ার কারণে তারা কেন করমুক্তি পাবেন সেই প্রশ্ন অবশ্যই তোলা উচিত।
সে কারণে আমার প্রস্তাব, যদি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য করমুক্তিসহ বিশেষ প্রণোদনা ও সুবিধা দেয়া হয় তাহলে সেটা যেন প্রকৃত অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর জন্য এক্সক্লুসিভলি নিশ্চিত করা হয়।
এবারের প্রসঙ্গ বাঙ্গালীদের নিয়ে। উপরের আলোচ্যমতে, বছরের পর বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এক্সক্লুসিভ রাখায় বাঙালিরা সবসময় তা থেকে বঞ্চিত হয়ে এসেছে। এই বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে শক্তিশালী উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন আরো বেশি শক্তিশালী ও ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তেমনি বঞ্চিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরাও ক্রমান্বয়ে আরো দুর্বল ও শক্তিহীন, প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। ১৯০০ সালের শাসনবিধি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন ও শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে যে সকল সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্র দিয়েছে তাতে উপজাতিদের জন্য কোথাও এক্সক্লুসিভ করা হয়েছে, আবার কোথাও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই এক্সক্লুসিভ ও অগ্রাধিকার শব্দের অধিকারের জোরে বাঙালিরা টিকতে পারছে না এবং পিছিয়ে পড়েছে প্রতিযোগিতায়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, অধিকার, প্রায় সকল ক্ষেত্রে তারা আজ পিছিয়ে। অথচ তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক বা তারও কিছু বেশি।
ব্যাংক লোন ও আয়করে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কারণে পাহাড়ি ঠিকাদাররা বাঙালি ঠিকাদারের চেয়ে অনেক কম রেটে বিড করতে পারে। ফলে এই প্রতিযোগিতায় বাঙালি ঠিকাদাররা কোনদিনই টিকতে পারেনি। কোন কোন ক্ষেত্রে বাঙালি ঠিকাদাররা পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ পাহাড়ি ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে বিড করে থাকে। এই সুবিধার কারণে লাইসেন্সধারী পাহাড়িরা ঘরে বসে বিশেষ কমিশন যেমন পায়, তেমনি তাদের লাইসেন্সের মান বাড়ে। ফলে উচ্চতর কাজগুলোতে একটা পর্যায়ে বাঙালিরা আর বিড করতে পারে না। অবশ্য কারো কারো ক্ষেত্রে দেখেছি, এই ব্যবসায়িক ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য পাহাড়ি মেয়েকে বিয়ে করেছে এবং তার নামে লাইসেন্স ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের এ পর্যন্ত আমি পাহাড় থেকে নির্বাচিত ও মনোনীত যে সকল সংসদ সদস্যের ভাষণ শুনেছি, তাদের কারো বক্তব্যে বাঙ্গালীদের এই বঞ্চনার, এই কষ্টের কথা উচ্চারিত হতে শুনিনি। নাগরিক অধিকার, ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, আর্থিক ক্ষেত্রে বাঙালিরা যে বৈষম্যের শিকার তা নিয়ে কাউকে একটি শব্দ উচ্চারণ করতে শুনিনি। তাদের সকল আলোচনা কেবলমাত্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সুযোগ সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে। প্রত্যাবাসিত বাঙ্গালীদের গুচ্ছগ্রামের অমানবিক ও ক্যাম্প জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানাতে শুনিনি কাউকে। একই ধরনের আর্থসামাজিক পরিবেশে, অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা পশ্চাদপদ অবস্থায় বেড়ে উঠে, চলাফেরা করে কেবল বাঙালি হওয়ার কারণে তারা কেন বঞ্চিত হবে এই প্রশ্ন কাউকে করতে শুনিনি। কেন করমুক্ত সুবিধা পার্বত্য বাঙালিরাও পাবে না এই প্রশ্ন করতে শুনলাম না কাউকে। উপজাতিদের মতো পাহাড়ের বাঙালিরাও করমুক্ত সুবিধা পেলে তাদের তো কোন ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তাহলে কেন তারা এক্সক্লুসিভলি উপজাতিদের জন্য এই সুবিধা চাইছেন? তারা তো বলতে পারতেন, উপজাতিদের জন্য যেমন করমুক্ত সুবিধা বহাল রাখা হোক, ঠিক তেমনি পার্বত্য বাঙালীদের এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এই আবেদনে তো এরকম একটি লাইন থাকতে পারতো। তাদের বক্তৃতায় এরকম একটি বাক্য থাকতে পারতো। এতে দোষের কিছু তো হতো না। তবে কি তারা কেবল উপজাতিদের জনপ্রতিনিধি এবং তাদের বেলায় কনসার্ন? অথচ ভোটের মাঠে সবাই বাঙ্গালীদের ভোট পেতে মরিয়া হয়ে থাকে এবং পাহাড়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এককভাবে বাঙালি হওয়ার কারণে জয় পরাজয় নির্ধারণে বাঙ্গালীদের ভোট সবসময় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে।
ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জনসংখ্যার সুষম বন্টনের লক্ষ্যে, উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সমতল থেকে কয়েক লক্ষ বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ কারণে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার দল বিএনপি’র প্রতি পুনর্বাসিত বাঙ্গালীদের দুর্বলতা চিরন্তন। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের কোন কোন নেতা এ কারণে প্রত্যাবাসিত বাঙ্গালীদেরকে ‘জিয়াউর রহমানের সন্তান’ বলে শ্লেষোক্তি করে থাকে।
আজ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দল এবং তার পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। তারেক রহমান নিজেও বৈষম্য সৃষ্টিকারী শান্তি চুক্তি বিরোধী লংমার্চে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই পার্বত্য বাঙ্গালীদের প্রত্যাশা, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পার্বত্য বাঙালিদের এই বৈষম্যের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করবেন চিরতরে। পাহাড়ে উপজাতি-অউপজাতীয় বৈষম্যের নিরসন ঘটাবেন স্থায়ীভাবে।
লেখক : সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ
















