ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধী গিলবোয়াকে হিমাচল থেকে দ্রুত গ্রেপ্তারে ভারতকে চিঠি


ইসরায়েলের এক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ইতান গিলবোয়াকে ভারতের হিমাচল প্রদেশ থেকে দ্রুত গ্রেপ্তারে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বেলজিয়াম-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন। তবে এই আবেদন আমলে নিয়ে ইতান গিলবোয়াকে এখনো গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি ভারত সরকার। তবে জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এই যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য ভারত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ভারতের হিমাচলে ভ্রমণে এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই রিজার্ভ সেনা।
হিন্দ রজব ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতে অবস্থান করা ইতান গিলবোয়া গাজায় থাকাকালীন অসংখ্য বেসামরিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংসযজ্ঞে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের সেই ধ্বংসলীলার ভিডিও রেকর্ড করে তিনি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। ১৯৬০ সালের জেনেভা কনভেনশনের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস করা স্পষ্টত একটি ‘যুদ্ধাপরাধ’।
যেহেতু ভারত জেনেভা কনভেনশনের অন্যতম একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র, তাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে এই ইসরায়েলি সেনাকে আটক করতে তারা আইনিভাবে বাধ্য বলে মনে করে হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন।
এক অফিসিয়াল বিবৃতিতে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, “জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করার কারণে ভারতের ওপর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই কনভেনশনের ১৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো দেশের নাগরিকই হোক না কেন—গুরুতর বা আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আইনি দায়িত্ব ভারতের ওপর বর্তায়।”
বিবৃতিতে হিন্দ রজব আরও যোগ করে, “ইতান গিলবোয়া কোনো সাধারণ পর্যটক বা ট্রাভেলার নন, তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী। গাজায় ভয়াবহ অপরাধের সাথে জড়িত থেকেও কোনো ধরনের বিচার বা শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে উল্টো এই মুহূর্তে তিনি ভারতের মাটিতে আতিথেয়তা উপভোগ করছেন।”
সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতে অবস্থান করা ইতান গিলবোয়া গাজায় অনেক বাড়িঘর ধ্বংস করেছেন। যেগুলো আবার রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ১৯৬০ সালে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিকদের সম্পদ ধ্বংস করা যুদ্ধাপরাধ।
আর ভারত যেহেতু জেনেভা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। তাই তারা আইনত এই ইসরায়েলি সেনাকে আটকের জন্য বাধ্য বলে উল্লেখ করেছে হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “জেনেভা কনভেনশনের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারত একটি আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে। কনভেনশনের ১৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো দেশের নাগরিকই হোক না কেন—গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাদের বিচার করার আইনি দায়িত্ব ভারতের রয়েছে।”
হিন্দ রজব আরও বলেছে, “ইতান গিলবোয়া কোনো পর্যটক নন। তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী। যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত করেও কোনো বিচারের মুখোমুখি না হয়ে এ মুহূর্তে তিনি ভারতের আথিতেয়তা গ্রহণ করছেন।”
হিন্দ রাজাব ফাউন্ডেশন বলেছে যে, তারা একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে যা প্রমাণ করে যে, গিলবোয়া অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে “ব্যক্তিগতভাবে পুরো আবাসিক ব্লকগুলোর পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন এবং তা উদযাপন করেছেন”, যা ১৯৬০ সালের জেনেভা কনভেনশন আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধমূলক প্রতিশোধমূলক কাজ।
উল্লেখ্য, জেনেভা কনভেনশন হলো কতগুলো আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা যুদ্ধকালীন সময়ে বেসামরিক নাগরিক ও বন্দীদের প্রতি আচরণের জন্য আইনি ও নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করে বৈশ্বিক মানবিক আইনের ভিত্তি তৈরি করে। ভারত এই কনভেনশনগুলোর একটি স্বাক্ষরকারী দেশ।
ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী হামাস দক্ষিণ ইসরায়েলে অনুপ্রবেশের সময় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা এবং জিম্মি করার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। তখন থেকে ইসরায়েল গাজায় নজিরবিহীন বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে আসছে, যাতে ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে, জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত একটি তদন্ত কমিশন জানায় যে, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটিকে “বিকৃত ও মিথ্যা” আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল ।
মঙ্গলবার হিন্দ রাজাব ফাউন্ডেশন জানিয়েছে যে, গিলবোয়া গাজায় জন্মগ্রহণ করলেও ইসরায়েল সেখান থেকে তাদের বসতি প্রত্যাহার করে নিলে তিনি সপরিবারে সেই অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। এটি ছিল ২০০৫ সালে ইসরায়েলের গাজা থেকে সমস্ত বসতি ভেঙে ফেলার ঘটনার প্রতি একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ফাউন্ডেশনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর গিলবোয়া ও তার বেশ কয়েকজন ভাইবোন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেই অঞ্চলে ফিরে আসেন।
ফাউন্ডেশনটি অভিযোগ করেছে, “গিলবোয়া খান ইউনিস ও রাফাহতে বেসামরিক বাড়িঘর ভাঙার নির্দেশ দেওয়া, তা কার্যকর করা এবং সেই ধ্বংসযজ্ঞ উদযাপনের দৃশ্য ধারণ করে তার চালানো বেসামরিক ভবনগুলো নথিভুক্ত করেছিল। এই ভিডিওগুলো পরে তার মা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে প্রকাশ করেন।”
ফাউন্ডেশনটির অভিযোগ, পোস্টগুলো থেকে বোঝা যায় যে, এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো “প্রতিশোধমূলক কাজ” হিসেবে চালানো হয়েছিল এবং নিহত ইসরায়েলি সৈন্যদের প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছিল।
সংস্থাটি বলেছে যে, তাদের অভিযোগে তারা বেশ কয়েকটি “সুনির্দিষ্ট ঘটনার” উল্লেখ করেছে, যেখানে গিলবোয়া বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের কাজে কথিতভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, এই কাজগুলো চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন।
ফাউন্ডেশনটি বলেছে যে, জেনেভা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারত এই চুক্তি অনুসারে, নাগরিকত্ব নির্বিশেষে, গুরুতর লঙ্ঘনকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের বিচার করতে বাধ্য।
ফাউন্ডেশনটি বলেছে, ভারতে গিলবোয়ার উপস্থিতি ভারতীয় সংবিধানের ৫১(গ) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলার নির্দেশ দেয়। এতে আরও বলা হয়েছে, “এখন সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি ভারতের ওপর এবং ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও তার ওপর বর্তায়।”
অনূদিত। মূল- নচিকেত দেউস্কর, scroll.in
















